অনলাইনে হবে নতুন বেতন নির্ধারণ, ১১–২০ গ্রেডের কর্মচারীদের ফিক্সেশন পাঠাতে হবে ডিডিওর কাছে
জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ জারির পর সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। এবার কাগজপত্রনির্ভর পদ্ধতির পরিবর্তে অনলাইনে iBAS++ সিস্টেমের মাধ্যমে বেতন নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ১১ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে নিজে অনলাইনে Pay Fixation সম্পন্ন করে তা সংশ্লিষ্ট ডিডিওর (Drawing and Disbursing Officer) কাছে পাঠানোর প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
প্রদত্ত নির্দেশনার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, নতুন ব্যবস্থায় কর্মচারীকে প্রথমে iBAS++ সিস্টেমে প্রবেশ করে নির্ধারিত ছকে প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণ করতে হবে। এরপর কর্মচারীর দাখিল করা ফিক্সেশন যাচাই ও পরবর্তী অনুমোদনের জন্য ডিডিও এবং হিসাবরক্ষণ অফিসের ধাপে ধাপে প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
যেভাবে হবে নতুন বেতন নির্ধারণ
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ জারি হওয়ার পর সরকারি কর্মচারীরা অনলাইনে বেতন নির্ধারণের জন্য iBAS++ সিস্টেমে প্রবেশ করবেন। নির্ধারিত Pay Fixation অপশনে গিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য ও ছক পূরণ করতে হবে।
অর্থাৎ, নতুন বেতন নির্ধারণের প্রাথমিক কাজটি কর্মচারী নিজেই অনলাইনে সম্পন্ন করবেন। আগের মতো শুধু অফিসের মাধ্যমে কাগজে ফিক্সেশন প্রস্তুত করার পরিবর্তে ডিজিটাল পদ্ধতিতে তথ্য ইনপুট দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে।
নির্দেশনায় আরও উল্লেখ রয়েছে, কেউ পূর্বের payfixation.gov.bd ওয়েবসাইটের মাধ্যমে প্রবেশ করলেও তাকে iBAS++ সিস্টেমের Pay Fixation অপশনে নিয়ে যাওয়া হবে।
১১–২০ গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ধাপ
১১ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য প্রক্রিয়াটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে নিজের তথ্য ব্যবহার করে অনলাইনে বেতন নির্ধারণ সম্পন্ন করতে হবে। এরপর সেই ফিক্সেশন সংশ্লিষ্ট ডিডিওর কাছে সাবমিট করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে কর্মচারীর কাজ শুধু অনলাইনে তথ্য পূরণ করে শেষ হবে না। ফিক্সেশন যথাযথভাবে সম্পন্ন করে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় ডিডিও বরাবর পাঠাতে হবে।
ধাপগুলো সংক্ষেপে—
১. iBAS++-এ লগইন
কর্মচারী iBAS++ সিস্টেমে নিজের ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে প্রবেশ করবেন।
২. Pay Fixation অপশনে প্রবেশ
সিস্টেমে প্রবেশের পর বেতন নির্ধারণের জন্য নির্ধারিত Pay Fixation অপশন নির্বাচন করতে হবে।
৩. প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণ
চাকরির তথ্য, বর্তমান বেতন, প্রযোজ্য অন্যান্য তথ্যসহ নির্ধারিত ছকে প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে হবে।
৪. নতুন বেতন যাচাই
তথ্য সঠিকভাবে ইনপুট দেওয়ার পর নতুন বেতনস্কেল অনুযায়ী নির্ধারণযোগ্য মূল বেতন সিস্টেমে প্রদর্শিত হবে।
৫. ডিডিও বরাবর সাবমিট
তথ্য যাচাই করে কর্মচারী ফিক্সেশনটি সংশ্লিষ্ট ডিডিওর কাছে অনলাইনে পাঠাবেন।
৬. ডিডিওর পরবর্তী কার্যক্রম
ডিডিও ফিক্সেশন কপি প্রিন্ট করে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর সার্ভিসবুকে প্রয়োজনীয়ভাবে লিপিবদ্ধ করবেন।
৭. সার্ভিসবুকসহ হিসাবরক্ষণ অফিসে পাঠানো
সার্ভিসবুকে লিপিবদ্ধ করার পর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও সার্ভিসবুক হিসাবরক্ষণ অফিসে পাঠানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
৮. হিসাবরক্ষণ অফিসের যাচাই ও অনুমোদন
হিসাবরক্ষণ অফিস সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই করার পর ফিক্সেশন অনুমোদনের পরবর্তী কার্যক্রম সম্পন্ন করবে।
iBAS++ লগইনের ক্ষেত্রেও নতুন নির্দেশনা
নির্দেশনায় সরকারি কর্মচারীদের iBAS++ সিস্টেমে প্রবেশের পদ্ধতিও উল্লেখ করা হয়েছে। গেজেটেড সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে iBAS++ লগইন ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করতে হবে।
অন্যদিকে নন-গেজেটেড সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) নম্বর ও জন্মতারিখ ব্যবহার করার কথা বলা হয়েছে।
দেশের বাইরে অবস্থানরত কর্মচারীদের ক্ষেত্রে iBAS++-এ নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরে পাঠানো একবার ব্যবহারযোগ্য পাসওয়ার্ড বা OTP ব্যবহার করে সিস্টেমে প্রবেশের ব্যবস্থা থাকবে বলে নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
NID না থাকলে কী হবে?
নতুন বেতন নির্ধারণের আগে জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকা কর্মচারীদের প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়ায় NID-এর জন্য নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে।
এ ছাড়া কারও জাতীয় পরিচয়পত্রে থাকা জন্মতারিখ এবং চাকরির রেকর্ডে থাকা জন্মতারিখের মধ্যে পার্থক্য থাকলে বেতন নির্ধারণের আগে চাকরির রেকর্ডে উল্লেখিত জন্মতারিখের ভিত্তিতে জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে।
এ কারণে বেতন ফিক্সেশন শুরু করার আগে NID, জন্মতারিখ এবং চাকরির রেকর্ডের তথ্য মিলিয়ে দেখা গুরুত্বপূর্ণ।
ফিক্সেশন জমা দেওয়ার পর SMS আসবে
নির্দেশনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—কর্মচারী iBAS++-এ প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণ করে ডিডিও বরাবর সাবমিট করার পর কর্মচারীর নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরে বেতন নির্ধারণী বিবরণী সাবমিশন হওয়ার বিষয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে SMS পাঠানোর ব্যবস্থা থাকবে।
অর্থাৎ অনলাইনে ফিক্সেশন দাখিলের পর সেটি সফলভাবে সাবমিট হয়েছে কি না, তা মোবাইল বার্তার মাধ্যমেও জানার সুযোগ থাকবে।
নতুন বেতনস্কেলের মূল বেতন আগেই দেখা যাবে
নির্ধারিত ছকে প্রয়োজনীয় তথ্য সঠিকভাবে এন্ট্রি করার পর ডিডিও বরাবর সাবমিট করার আগেই নতুন বেতনস্কেল অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর নির্ধারণযোগ্য মূল বেতনের পরিমাণ সিস্টেমে প্রদর্শিত হবে।
এটি কর্মচারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সুবিধা। কারণ ফিক্সেশন চূড়ান্তভাবে জমা দেওয়ার আগে সিস্টেমে প্রদর্শিত নতুন মূল বেতন দেখে তথ্যের সঙ্গে তা মিলিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকবে।
তবে এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—প্রদর্শিত বেতন সঠিকভাবে যাচাই না করে চূড়ান্তভাবে সাবমিট না করাই নিরাপদ।
কর্মচারী, ডিডিও ও হিসাবরক্ষণ অফিস—তিন ধাপে সম্পন্ন হবে
নতুন পদ্ধতিতে বেতন নির্ধারণের দায়িত্ব এককভাবে কোনো একটি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না। পুরো প্রক্রিয়াটি কয়েকটি ধাপে ভাগ করা হচ্ছে।
প্রথম ধাপ: কর্মচারী নিজে অনলাইনে Pay Fixation-এর তথ্য পূরণ করবেন।
দ্বিতীয় ধাপ: কর্মচারী ফিক্সেশন ডিডিওর কাছে পাঠাবেন। ডিডিও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ফিক্সেশন কপি প্রিন্ট করবেন এবং সার্ভিসবুকে লিপিবদ্ধ করবেন।
তৃতীয় ধাপ: সার্ভিসবুকসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হিসাবরক্ষণ অফিসে পাঠানো হবে এবং সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা যাচাই শেষে অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবেন।
ফলে নতুন ব্যবস্থায় অনলাইন তথ্য এন্ট্রি → ডিডিও পর্যায়ের প্রক্রিয়া → হিসাবরক্ষণ অফিসের যাচাই ও অনুমোদন—এই ধারাবাহিকতায় বেতন নির্ধারণ সম্পন্ন হওয়ার কাঠামো তৈরি হচ্ছে।
ভুল তথ্য দিলে কী হতে পারে?
অনলাইনে বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে তথ্য এন্ট্রির দায়িত্বের একটি বড় অংশ কর্মচারীর নিজের ওপর থাকবে। তাই নাম, NID, জন্মতারিখ, চাকরিতে যোগদানের তারিখ, বর্তমান মূল বেতন, পূর্ববর্তী বেতন নির্ধারণসহ সংশ্লিষ্ট তথ্য অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে দিতে হবে।
বিশেষ করে NID ও চাকরির রেকর্ডের তথ্যের মধ্যে অসামঞ্জস্য থাকলে পরবর্তী সময়ে ফিক্সেশন যাচাইয়ের সময় জটিলতা তৈরি হতে পারে।
তাই ফিক্সেশন সাবমিট করার আগে—
- NID নম্বর যাচাই করতে হবে;
- জন্মতারিখ মিলিয়ে দেখতে হবে;
- চাকরির রেকর্ডের তথ্য পরীক্ষা করতে হবে;
- বর্তমান মূল বেতন সঠিক কি না দেখতে হবে;
- পূর্ববর্তী বেতন নির্ধারণের তথ্য প্রয়োজন অনুযায়ী যাচাই করতে হবে;
- নতুন বেতনস্কেলে প্রদর্শিত মূল বেতন পরীক্ষা করতে হবে;
- এরপরই ডিডিও বরাবর সাবমিট করতে হবে।
১১–২০ গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ
নতুন ব্যবস্থায় ১১–২০ গ্রেডের কর্মচারীদের নিজেদের ফিক্সেশন অনলাইনে সম্পন্ন করার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে কর্মচারীদের শুধু নতুন বেতনস্কেলের হিসাব জানলেই হবে না; iBAS++-এ সঠিকভাবে তথ্য প্রদান এবং ফিক্সেশন সাবমিট করার প্রক্রিয়াও বুঝতে হবে।
একই সঙ্গে ফিক্সেশন সাবমিট করার পর ডিডিও পর্যায়ে কীভাবে তা যাচাই, প্রিন্ট, সার্ভিসবুকে লিপিবদ্ধ এবং হিসাবরক্ষণ অফিসে পাঠানো হবে—সেটিও প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
শেষ কথা
জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ বাস্তবায়নের সঙ্গে বেতন নির্ধারণ প্রক্রিয়াকে অনলাইনভিত্তিক করার ফলে পুরো কার্যক্রম আরও কাঠামোবদ্ধ ডিজিটাল ব্যবস্থায় যাচ্ছে। প্রদত্ত নির্দেশনা অনুযায়ী কর্মচারী অনলাইনে নিজের বেতন নির্ধারণের তথ্য পূরণ ও সাবমিট করবেন, এরপর ডিডিও পর্যায়ে প্রয়োজনীয় নথিগত কাজ সম্পন্ন হবে এবং শেষ পর্যায়ে হিসাবরক্ষণ অফিস যাচাই ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে।
তাই ১১–২০ গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—iBAS++ লগইন প্রস্তুত রাখা, NID ও চাকরির তথ্য যাচাই করা এবং Pay Fixation সাবমিট করার আগে সিস্টেমে প্রদর্শিত নতুন মূল বেতন ও অন্যান্য তথ্য ভালোভাবে মিলিয়ে দেখা



