প্রশাসন I একাউন্টস I অডিট আপত্তি

PPR Correction (New) 2026 । সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন, নতুন অধ্যাদেশে দেশীয় শিল্প সুরক্ষা ও প্রতিযোগিতায় জোর

সরকারি ক্রয় ব্যবস্থাকে আরও প্রতিযোগিতামূলক, আধুনিক ও টেকসই করার লক্ষ্যে ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করা হয়েছে। বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় প্রকাশিত অধ্যাদেশটির তারিখ ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬। আইন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট তালিকাতেও এটি ২০২৬ সনের ৩৭ নম্বর অধ্যাদেশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
নতুন এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে সরকারি অর্থে পণ্য, কার্য ও ভৌতসেবা কেনাকাটার ক্ষেত্রে বিদ্যমান পাবলিক প্রকিউরমেন্ট কাঠামোতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর মূল লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে দেশীয় শিল্পের স্বার্থ সুরক্ষা, ক্রয়কার্যে অধিক প্রতিযোগিতা সৃষ্টি, ক্রয়চুক্তি পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার বিধান সম্প্রসারণ এবং উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিকে আধুনিক করা। মন্ত্রিসভা ২০ সেপ্টেম্বর অধ্যাদেশটির খসড়ায় নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়; পরবর্তী প্রক্রিয়ায় এটি গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়।

নতুন অধ্যাদেশে যে বিষয়গুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ

১. দেশীয় শিল্পের স্বার্থ সুরক্ষায় নতুন গুরুত্ব

সরকারি ক্রয়ের বড় একটি অংশে দেশীয় প্রতিষ্ঠান ও শিল্পকে কীভাবে কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করা যায়, সেই বিষয়টি নতুন সংশোধনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। সংশোধিত কাঠামোতে সরকারি ক্রয়কে শুধু সর্বনিম্ন মূল্য নির্ধারণের বিষয় হিসেবে না দেখে বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও গুণগত বিবেচনার আওতায় আনার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

এর ফলে ভবিষ্যতে সরকারি ক্রয়ে দেশীয় শিল্পের সক্ষমতা, প্রতিযোগিতা এবং বাজারে অংশগ্রহণের সুযোগ নিয়ে আরও সুস্পষ্ট কাঠামো তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

২. শুধু দাম নয়, একাধিক নির্ণায়ক বিবেচনায় মূল্যায়ন

নতুন অধ্যাদেশের সবচেয়ে আলোচিত পরিবর্তনগুলোর একটি হলো ‘Rated Criteria’ বা নির্ণায়কভিত্তিক মূল্যায়নের ব্যবস্থা।

অর্থাৎ, কোনো দরপত্রের মূল্যায়নে শুধু দরদাতার প্রস্তাবিত দাম নয়; প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন নির্ণায়ক বা মানদণ্ডের অনুপাতভিত্তিক মূল্যায়ন করা যাবে। পণ্য, কার্য ও ভৌতসেবা ক্রয়ের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি ব্যবহারের বিধান রাখা হয়েছে।

এর ফলে গুণগতমান, কার্যসম্পাদনের সক্ষমতা, টেকসইতা এবং অন্যান্য নির্ধারিত মানদণ্ডকে মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার অংশ করা সম্ভব হবে। আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবহৃত rated criteria ধারণার সঙ্গে এই ব্যবস্থা সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের সময় জানানো হয়েছিল।

৩. উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে আধুনিকায়ন

সরকারি ক্রয়ের ক্ষেত্রে Open Tendering Method বা উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন অধ্যাদেশে এই পদ্ধতির কার্যপ্রণালিকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করার জন্য সংশোধন আনা হয়েছে।

এর উদ্দেশ্য হলো দরপত্র প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো, প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করা এবং সরকারি ক্রয়কে সময়োপযোগী করা। একই সঙ্গে ক্রয়কারী সংস্থা ও দরদাতাদের জন্য প্রক্রিয়াগত বিষয়গুলো আরও স্পষ্ট করার লক্ষ্যও এতে রয়েছে।

৪. ক্রয়চুক্তি ব্যবস্থাপনায় বিস্তৃত বিধান

নতুন অধ্যাদেশে Procurement Contract Administration and Management-সংক্রান্ত বিধান সম্প্রসারণ করা হয়েছে।

অর্থাৎ, দরপত্র আহ্বান থেকে ঠিকাদার নির্বাচনেই ক্রয় প্রক্রিয়া শেষ হবে না; চুক্তি বাস্তবায়ন, ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক বিষয়গুলোও আরও সুসংগঠিত কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা করা হয়েছে।

এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সরকারি প্রকল্পে কার্যাদেশ পাওয়ার পর চুক্তি বাস্তবায়নের পর্যায়েও সময়, গুণগতমান, দায়িত্ব ও শর্তপালনের মতো বিষয়গুলো সরাসরি সরকারি অর্থের কার্যকর ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত।

৫. সীমিত দরপত্র পদ্ধতির ব্যবহারে নতুন কাঠামো

সম্পদের সুষম বিস্তারের লক্ষ্যে Limited Tendering Method প্রয়োগের বিধানও নতুন সংশোধনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এখানে উদ্দেশ্য হলো প্রয়োজনীয় পরিস্থিতিতে সীমিত দরপত্র পদ্ধতির ব্যবহারকে আরও সুস্পষ্ট আইনি কাঠামোর মধ্যে আনা। ফলে কোন পরিস্থিতিতে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা যাবে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিধান অনুসরণ করতে হবে।

৬. রাষ্ট্রীয় জরুরি প্রয়োজনে বিকল্প ক্রয় ব্যবস্থা

নতুন অধ্যাদেশে রাষ্ট্রীয় জরুরি প্রয়োজনে Alternative Procurement Arrangement-এর ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

অর্থাৎ, বিশেষ জরুরি পরিস্থিতিতে প্রচলিত ক্রয় পদ্ধতির বাইরে প্রয়োজনীয় বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আইনি ভিত্তি তৈরি করা হয়েছে। তবে এ ধরনের ব্যবস্থা প্রচলিত প্রতিযোগিতামূলক ক্রয় পদ্ধতির বিকল্প হিসেবে সাধারণভাবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করছে—এমনটি অধ্যাদেশের উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়নি; বরং রাষ্ট্রীয় জরুরি প্রয়োজনকে কেন্দ্র করেই এই বিধান রাখা হয়েছে।

৭. পেশাগত অসদাচরণের বিধান স্পষ্ট

সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় দরদাতা, ঠিকাদার, পরামর্শক বা সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের আচরণও গুরুত্বপূর্ণ। নতুন অধ্যাদেশে Professional Misconduct-সংক্রান্ত বিধান স্পষ্ট করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এর ফলে ক্রয় প্রক্রিয়ায় পেশাগত অসদাচরণ কীভাবে বিবেচিত হবে এবং সংশ্লিষ্ট বিধান কীভাবে প্রয়োগ করা হবে—তা আরও সুস্পষ্ট করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

৮. টেকসই সরকারি ক্রয়ের দিকে জোর

সরকারি ক্রয় ব্যবস্থাকে শুধু তাৎক্ষণিকভাবে কম দামে পণ্য বা সেবা সংগ্রহের প্রক্রিয়া হিসেবে না দেখে Sustainable Procurement-এর দিকে নেওয়ার একটি প্রবণতা নতুন সংশোধনে স্পষ্ট।

নির্ণায়কভিত্তিক মূল্যায়নের সঙ্গে টেকসই ক্রয়ের বিষয়টি যুক্ত হওয়ায় ভবিষ্যতে সরকারি ক্রয়ে পণ্যের মান, দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারযোগ্যতা, পরিবেশগত ও অন্যান্য নির্ধারিত মানদণ্ড বিবেচনার সুযোগ আরও বাড়তে পারে।

এর ফলে সরকারি ক্রয়ে কী পরিবর্তন আসতে পারে?

নতুন অধ্যাদেশের সামগ্রিক কাঠামো বিশ্লেষণ করলে সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় তিনটি বড় পরিবর্তনের দিক স্পষ্ট হয়।

প্রথমত, সর্বনিম্ন মূল্যকে কেন্দ্র করে মূল্যায়নের পাশাপাশি নির্ধারিত একাধিক মানদণ্ড বিবেচনার সুযোগ বাড়ছে।

দ্বিতীয়ত, ক্রয়চুক্তি সম্পাদনের পরবর্তী ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়নকে আইনি কাঠামোর মধ্যে আরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তৃতীয়ত, জরুরি পরিস্থিতি, সীমিত দরপত্র এবং আধুনিক উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতির জন্য আলাদা বিধান তৈরি করে ক্রয় ব্যবস্থাকে আরও নমনীয় করার চেষ্টা করা হয়েছে।

এর সঙ্গে দেশীয় শিল্প সুরক্ষার বিষয়টি যুক্ত হওয়ায় সরকারি ক্রয়কে দেশের অভ্যন্তরীণ শিল্প ও ব্যবসা ব্যবস্থার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার একটি কাঠামো তৈরি হচ্ছে।

আগের সংশোধনের ধারাবাহিকতায় নতুন পরিবর্তন

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের এ অধ্যাদেশকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে পুরো পরিবর্তনের চিত্র পাওয়া যাবে না। এর আগে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর মাধ্যমে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬-এ গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছিল।

এপ্রিল ২০২৬-এর আইনে সরকারি ক্রয়ের উদ্দেশ্যের মধ্যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার পাশাপাশি অর্থের সর্বোত্তম মূল্য (Value for Money), দক্ষতা, নৈতিকতা, গুণগতমান ও টেকসই ক্রয় যুক্ত করা হয়। একই ধারাবাহিকতায় e-GP বাধ্যতামূলক করা, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রে স্থানীয় অংশীদারসহ যৌথ উদ্যোগ এবং অভ্যন্তরীণ কার্য ক্রয়ে আগের ১০ শতাংশ কম-বেশি মূল্যসীমা প্রত্যাহারের মতো পরিবর্তনও আনা হয়েছিল।

বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (BPPA)-ও জানিয়েছে, ২০২৫ সালের সংশোধন কাঠামোর মাধ্যমে সরকারি ক্রয়ে e-GP ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা কার্যকর করা হয়েছিল এবং ১ জুলাই ২০২৬ থেকে নতুন অফলাইন টেন্ডারের অনুমোদন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

অর্থাৎ, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের নতুন অধ্যাদেশটি সরকারি ক্রয় ব্যবস্থার চলমান সংস্কার প্রক্রিয়ারই পরবর্তী ধাপ হিসেবে দেখা যায়।

সরকারি প্রতিষ্ঠান ও ঠিকাদারদের জন্য গুরুত্ব কোথায়?

নতুন বিধান কার্যকর হওয়ার পর সরকারি ক্রয়কারী সংস্থা বা Procuring Entity (PE)-কে সংশোধিত বিধান অনুযায়ী ক্রয় পরিকল্পনা, দরপত্র মূল্যায়ন, চুক্তি ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে বিশেষ ক্রয় পদ্ধতি ব্যবহারের বিষয়গুলোতে আরও সতর্ক হতে হবে।

অন্যদিকে দরদাতা, সরবরাহকারী, ঠিকাদার ও পরামর্শকদের জন্যও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার পাশাপাশি গুণগতমান, চুক্তির শর্ত, পেশাগত আচরণ এবং নির্ধারিত মূল্যায়ন মানদণ্ড গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

বিশেষ করে Rated Criteria কার্যকরভাবে প্রয়োগ হলে কোনো দরপত্রে শুধু কম দর দেওয়া যথেষ্ট নাও হতে পারে—যদি সংশ্লিষ্ট ক্রয়ের জন্য অন্যান্য নির্ধারিত মূল্যায়ন মানদণ্ডও প্রযোজ্য থাকে। তবে কোন ক্রয়ে কোন নির্ণায়ক কী অনুপাতে প্রয়োগ হবে, তা সংশ্লিষ্ট বিধি, দরপত্র দলিল ও ক্রয়কারীর নির্ধারিত কাঠামোর ওপর নির্ভর করবে।

শেষ কথা

পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬ সরকারি ক্রয় ব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত পরিবর্তন। এতে একদিকে দেশীয় শিল্পের স্বার্থ সুরক্ষা ও প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্য রাখা হয়েছে, অন্যদিকে ক্রয়চুক্তি ব্যবস্থাপনা, উন্মুক্ত দরপত্রের আধুনিকায়ন, Rated Criteria-ভিত্তিক মূল্যায়ন, Limited Tendering, Professional Misconduct এবং জরুরি পরিস্থিতিতে Alternative Procurement Arrangement-এর মতো বিষয়কে আরও সুস্পষ্ট কাঠামোয় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তবে নতুন বিধানের বাস্তব প্রভাব নির্ভর করবে অধ্যাদেশের প্রয়োগবিধি, সংশ্লিষ্ট বিধিমালা, BPPA-এর নির্দেশনা এবং বাস্তব ক্রয় প্রক্রিয়ায় এসব বিধান কীভাবে প্রয়োগ করা হয় তার ওপর। তাই সরকারি ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান, ঠিকাদার, সরবরাহকারী ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের জন্য গেজেটের পাশাপাশি পরবর্তী বাস্তবায়ন নির্দেশনাগুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

NEW PPR 2026 Download Link

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *