ঘরে বসেই সঞ্চয়পত্রের আয়কর প্রত্যয়ন! মোবাইলেই মিলবে কর কর্তন ও বিনিয়োগের সার্টিফিকেট
সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগকারীদের জন্য চালু হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ একটি ডিজিটাল সেবা। এখন সঞ্চয়পত্রের উৎসে আয়কর কর্তনের প্রত্যয়নপত্র, বিনিয়োগ প্রত্যয়নপত্রসহ বিভিন্ন বিনিয়োগসংক্রান্ত তথ্য জানতে অনেক ক্ষেত্রেই অফিস বা ব্যাংকে গিয়ে লাইনে দাঁড়ানোর প্রয়োজন হচ্ছে না। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের NSC Self Service System ব্যবহার করে বিনিয়োগকারীরা নিজেই অনলাইনে এসব তথ্য ও সনদ সংগ্রহ করতে পারছেন। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের অধীন অফিসগুলোর তথ্যেও Self Service System-এর মাধ্যমে বিনিয়োগ-সংক্রান্ত রিপোর্ট ও কর কর্তনের সার্টিফিকেট পাওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।
কী কী পাওয়া যাবে অনলাইনে
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের Self Service System-এ প্রবেশের পর বিনিয়োগকারী নিজের পরিচয় যাচাই করে সঞ্চয়পত্র-সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য দেখতে পারেন। এর মধ্যে রয়েছে—
- আয়কর/উৎসে কর কর্তনের প্রত্যয়নপত্র
- বিনিয়োগ প্রত্যয়নপত্র
- সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগসংক্রান্ত তথ্য
- রেজিস্ট্রেশনভিত্তিক তথ্য ও রিপোর্ট
- বিনিয়োগের বিভিন্ন বিবরণ
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের একটি অফিসিয়াল নোটিশে জানানো হয়েছে, nsd.finance.gov/selfreport লিংকে প্রবেশ করে বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ প্রত্যয়নপত্র, কর কর্তনের সার্টিফিকেট এবং বিনিয়োগসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য নিজেরাই জানতে পারবেন।
যেভাবে মোবাইল থেকেই আয়কর প্রত্যয়ন বের করবেন
প্রথমে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের Self Service System-এর নির্ধারিত পোর্টালে প্রবেশ করতে হবে। সরকারি সিস্টেমে বিনিয়োগকারীর জন্য আলাদা Holder/Investor Sign In ব্যবস্থা রয়েছে।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের Self Service System
এরপর ধাপে ধাপে—
১. NID নম্বর দিন
স্ক্রিনে থাকা Holder’s NID/Passport No./TIN ঘরে প্রয়োজনীয় পরিচয় নম্বর দিতে হবে।
২. জন্মতারিখ লিখুন
সঞ্চয়পত্রের ধারকের জন্মতারিখ নির্ধারিত ঘরে দিতে হবে।
৩. মোবাইল নম্বর দিন
সঞ্চয়পত্রের তথ্যের সঙ্গে সংযুক্ত/নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর ব্যবহার করতে হবে।
৪. ক্যাপচা পূরণ করুন
ছবিতে দেখানো ক্যাপচা কোড নির্ধারিত ঘরে লিখে Sign in-এ ক্লিক করতে হবে।
৫. OTP দিয়ে পরিচয় যাচাই করুন
সিস্টেমের পরবর্তী ধাপে মোবাইলে যাচাইকরণ কোড বা OTP পাঠানো হলে সেটি নির্ধারিত ঘরে দিতে হবে। এরপর পরিচয় যাচাই সম্পন্ন হলে ব্যবহারকারীর প্রোফাইলে প্রবেশের সুযোগ পাওয়া যায়। বর্তমান Self Service System-এর সাইন-ইন পেজেও NID/Passport/TIN, জন্মতারিখ, মোবাইল নম্বর ও CAPTCHA দেওয়ার ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে।
আয়কর প্রত্যয়নপত্র কোথায় পাবেন
লগইন সম্পন্ন হলে বিনিয়োগকারীর প্রোফাইল বা ড্যাশবোর্ডে সঞ্চয়পত্র-সংক্রান্ত বিভিন্ন অপশন দেখা যেতে পারে। এর মধ্যে আয়কর প্রত্যয়ন-সংক্রান্ত অপশন থেকে প্রয়োজনীয় করবর্ষ নির্বাচন করে সংশ্লিষ্ট প্রত্যয়নপত্র সংগ্রহ করা যায়।
অর্থাৎ কোনো নির্দিষ্ট করবর্ষে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে কত টাকা উৎসে আয়কর কর্তন করা হয়েছে—তার প্রত্যয়নপত্র প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট করবর্ষ নির্বাচন করে সেটি সংগ্রহ করা সম্ভব।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি—এটি সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে কর্তিত উৎসে করের প্রত্যয়নপত্র/ট্যাক্স সার্টিফিকেট-সংক্রান্ত সেবা। এটি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আয়কর রিটার্ন বা কর পরিশোধের সব ধরনের সনদের সঙ্গে এক বিষয় নয়। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের অফিসিয়াল তথ্যেও এটিকে কর কর্তনের সার্টিফিকেট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিনিয়োগ প্রত্যয়ন কী কাজে আসবে
Self Service System-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো বিনিয়োগ প্রত্যয়নপত্র।
এই প্রত্যয়নপত্রের মাধ্যমে একজন বিনিয়োগকারীর NID-সংশ্লিষ্ট সঞ্চয়পত্র বিনিয়োগের তথ্য যাচাই করা সহজ হবে। বিশেষ করে আয়কর রিটার্নে সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগের তথ্য দেখানোর ক্ষেত্রে এ ধরনের নথি প্রয়োজন হতে পারে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আয়কর রিটার্ন ব্যবস্থাতেও সঞ্চয়পত্রকে আর্থিক সম্পদ/বিনিয়োগের তথ্যের অংশ হিসেবে দেখানোর নির্দেশনা রয়েছে।
ব্যাংক বা সঞ্চয় অফিসে যাওয়ার প্রয়োজন কমবে
আগে সঞ্চয়পত্রের কর কর্তনের প্রত্যয়নপত্র বা বিনিয়োগ-সংক্রান্ত কোনো নথি সংগ্রহ করতে বিনিয়োগকারীকে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক, সঞ্চয় অফিস বা জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে হতো। ফলে অনেক সময় অপেক্ষা, সিরিয়াল এবং অফিসে যাতায়াতের ঝামেলা তৈরি হতো।
Self Service System চালুর ফলে সেই প্রক্রিয়ার একটি বড় অংশ অনলাইনে চলে এসেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নাগরিক ই-সেবা তালিকাতেও জাতীয় সঞ্চয় স্কিমসমূহের স্ব-সেবা সিস্টেম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ফলে স্মার্টফোন বা কম্পিউটার এবং ইন্টারনেট সংযোগ থাকলে বিনিয়োগকারী নিজেই প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই ও সনদ সংগ্রহের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারেন।
মোবাইল নম্বরের ক্ষেত্রে সতর্কতা
এই সেবাটি ব্যবহার করার সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো সঠিক মোবাইল নম্বর ব্যবহার করা। কারণ পরিচয় যাচাইয়ের জন্য OTP প্রয়োজন হতে পারে।
সঞ্চয়পত্র কেনার সময় যে মোবাইল নম্বর তথ্যের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল, সেটি ব্যবহার করে চেষ্টা করা নিরাপদ। মোবাইল নম্বর পরিবর্তন হয়ে গেলে বা OTP না এলে সংশ্লিষ্ট সঞ্চয় অফিস/ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তথ্য সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে।
এ ছাড়া NID, জন্মতারিখ, মোবাইল নম্বর বা OTP কারও সঙ্গে শেয়ার না করার বিষয়েও সতর্ক থাকা উচিত।
আয়কর রিটার্নের সময়ও হতে পারে উপকারী
সঞ্চয়পত্র থেকে মুনাফা পাওয়ার ক্ষেত্রে উৎসে কর কর্তনের তথ্য আয়কর হিসাবের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তাই রিটার্ন প্রস্তুতের সময় কর কর্তনের প্রমাণপত্র সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নির্দেশনায় অনলাইন রিটার্নে সঞ্চয়পত্রসহ বিভিন্ন আর্থিক সম্পদ ও বিনিয়োগের তথ্য প্রদানের বিষয় রয়েছে। একই সঙ্গে ইতোমধ্যে উৎসে কর্তিত করের তথ্যও রিটার্নের সংশ্লিষ্ট অংশে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তাই সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগকারীকে প্রতিবছর প্রয়োজনীয় প্রত্যয়নপত্র ডাউনলোড করে সংরক্ষণ করে রাখা সুবিধাজনক হতে পারে।
ডিজিটাল সেবায় আরও এক ধাপ এগোল সঞ্চয়পত্র ব্যবস্থাপনা
সঞ্চয়পত্রের অনলাইন ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশে নতুন নয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় সঞ্চয়পত্র অনলাইন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে সঞ্চয়পত্র ইস্যু এবং EFT-এর মাধ্যমে মুনাফা ও আসল পরিশোধের ব্যবস্থাও চালু রয়েছে।
এর সঙ্গে Self Service System যুক্ত হওয়ায় বিনিয়োগকারীর দিক থেকে তথ্য দেখার ও প্রয়োজনীয় প্রত্যয়ন সংগ্রহের প্রক্রিয়াটিও আরও ডিজিটাল হয়েছে।
শেষ কথা
সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করা ব্যক্তিদের জন্য NSC Self Service System নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ অনলাইন সুবিধা। NID/প্রযোজ্য পরিচয় তথ্য, জন্মতারিখ, সংশ্লিষ্ট মোবাইল নম্বর ও OTP ব্যবহার করে ঘরে বসেই সঞ্চয়পত্রের কর কর্তনের প্রত্যয়নপত্র এবং বিনিয়োগসংক্রান্ত তথ্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ফলে প্রয়োজনীয় নথির জন্য প্রতিবার ব্যাংক বা সঞ্চয় অফিসে গিয়ে লাইনে দাঁড়ানোর প্রয়োজন অনেকটাই কমতে পারে। তবে কোনো তথ্য না মিললে, OTP না এলে বা প্রত্যয়নপত্রে ভুল থাকলে সংশ্লিষ্ট সঞ্চয় অফিস/জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের মাধ্যমে যাচাই করা উচিত।
অনলাইন সেবা: NSC Self Service System



