প্রতিবন্ধী ভাতায় বড় পরিবর্তন: উপকারভোগী ৩৮ লাখ, শিক্ষার্থীদের জন্য স্তরভেদে ১,৪০০ টাকা পর্যন্ত
দেশের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করতে ২০২৬–২৭ অর্থবছরে প্রতিবন্ধী ভাতা ও প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপবৃত্তির হার বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে সরকার। নতুন অর্থবছরে সাধারণ প্রতিবন্ধী ভাতার মাসিক পরিমাণ ৯০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,০০০ টাকা করা হয়েছে। একই সঙ্গে এ কর্মসূচির আওতায় উপকারভোগীর সংখ্যা ৩৪ লাখ ৫০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৩৮ লাখে উন্নীত করার কথা জানিয়েছেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন। ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ জাতীয় সংসদে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব তথ্য জানান।
এদিকে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্যও রয়েছে নতুন হারের উপবৃত্তি। প্রাথমিক থেকে উচ্চতর শিক্ষাস্তর পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের মাসিক উপবৃত্তি নির্ধারণ করা হয়েছে ১,০০০ থেকে ১,৪০০ টাকা। ফলে নতুন অর্থবছরে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের জন্য সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে আর্থিক সহায়তার পরিধি বাড়ছে।
সাধারণ প্রতিবন্ধী ভাতা এখন মাসে ১,০০০ টাকা
২০২৬–২৭ অর্থবছরে সাধারণ প্রতিবন্ধী ভাতার মাসিক হার ১০০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। আগে একজন অনুমোদিত সুবিধাভোগী মাসে ৯০০ টাকা পেতেন; নতুন নির্ধারিত হার অনুযায়ী তা হয়েছে ১,০০০ টাকা।
এ হিসাবে পুরো ১২ মাসের ভাতা পাওয়া গেলে একজন সুবিধাভোগীর বার্ষিক ভাতার পরিমাণ দাঁড়ায় ১২,০০০ টাকা। আগের মাসিক হারে বার্ষিক অর্থের পরিমাণ ছিল ১০,৮০০ টাকা। অর্থাৎ বছরে একজন সুবিধাভোগীর প্রাপ্য অর্থ বাড়ছে ১,২০০ টাকা।
তবে মাসিক হার বাড়ানোর ঘোষণা এবং কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির হিসাবে টাকা জমা হওয়ার বিষয় দুটি আলাদা। অনুমোদিত ভাতাভোগীর হিসাবে নতুন হারে অর্থ জমা হয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কিস্তি ও লেনদেনের তথ্য যাচাই করে নিশ্চিত হতে হবে।
৩৮ লাখ মানুষ পাবেন প্রতিবন্ধী ভাতা
সরকারের ঘোষণায় সাধারণ প্রতিবন্ধী ভাতার উপকারভোগীর সংখ্যা ৩৪ লাখ ৫০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৩৮ লাখ করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ কর্মসূচির আওতায় অতিরিক্ত ৩ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই সম্প্রসারণের লক্ষ্য হলো আরও বেশি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আনা। বিশেষ করে আর্থিকভাবে অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহে এই সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে ৩৮ লাখ উপকারভোগীর ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রা মানেই নতুন করে নির্বাচিত প্রত্যেক ব্যক্তির ভাতা ইতিমধ্যে চালু হয়েছে—এমন নয়। চূড়ান্ত অনুমোদন, উপকারভোগীর তালিকা এবং অর্থ বিতরণের অগ্রগতি সংশ্লিষ্ট সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে যাচাই করতে হবে।
প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য কত টাকা?
সাধারণ প্রতিবন্ধী ভাতার পাশাপাশি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপবৃত্তির পরিমাণও বাড়ানো হয়েছে। ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য শিক্ষার স্তর অনুযায়ী মাসিক উপবৃত্তির হার নির্ধারণ করা হয়েছে।
| শিক্ষার স্তর | মাসিক উপবৃত্তি | ১২ মাসে মোট |
|---|---|---|
| প্রাথমিক | ১,০০০ টাকা | ১২,০০০ টাকা |
| মাধ্যমিক | ১,১০০ টাকা | ১৩,২০০ টাকা |
| উচ্চমাধ্যমিক | ১,২০০ টাকা | ১৪,৪০০ টাকা |
| উচ্চতর বা বিশ্ববিদ্যালয় | ১,৪০০ টাকা | ১৬,৮০০ টাকা |
এগুলো পূর্ণ ১২ মাসের উপবৃত্তি পাওয়ার ভিত্তিতে হিসাব করা হয়েছে। বাস্তবে কত টাকা পাওয়া যাবে, তা অনুমোদন, প্রাপ্য সময়কাল এবং অর্থ বিতরণের নিয়মের ওপর নির্ভর করবে।
শিক্ষা উপবৃত্তির আওতায় আসবেন এক লাখ শিক্ষার্থী
সরকার প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপবৃত্তির উপকারভোগীর সংখ্যা ৮১ হাজার থেকে বাড়িয়ে এক লাখ করার কথা জানিয়েছে। অর্থাৎ আরও ১৯ হাজার শিক্ষার্থীকে এ কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন অব্যাহত রাখা, শিক্ষা উপকরণ কেনা, যাতায়াত ব্যয় মেটানো এবং পরিবারের আর্থিক চাপ কমাতে এই সহায়তা ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নরত প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য মাসিক ১,৪০০ টাকার উপবৃত্তি সহায়ক হতে পারে।
তবে শিক্ষা উপবৃত্তি এবং সাধারণ প্রতিবন্ধী ভাতা পৃথক কর্মসূচি। কারও ক্ষেত্রে কোন কর্মসূচির সুবিধা প্রযোজ্য হবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট যোগ্যতা ও সরকারি নীতিমালার ওপর।
ভাতার টাকা না এলে করণীয়
যেসব সুবিধাভোগী এখনো ভাতার টাকা পাননি অথবা নতুন উপবৃত্তির জন্য আবেদন করতে চান, তাঁদের কয়েকটি বিষয় যাচাই করা প্রয়োজন।
১. ভাতার অবস্থা যাচাই: সংশ্লিষ্ট উপজেলা বা শহর সমাজসেবা কার্যালয়ে যোগাযোগ করে নিজের নাম অনুমোদিত তালিকায় আছে কি না এবং কোন সময়ের অর্থ ছাড় হয়েছে, তা জানতে হবে।
২. হিসাবের তথ্য পরীক্ষা: ভাতার সঙ্গে যুক্ত মোবাইল আর্থিক সেবা বা ব্যাংক হিসাবের লেনদেনের ইতিহাস যাচাই করতে হবে। নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর ও পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যে কোনো অসংগতি থাকলে তা সংশোধনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তা নিতে হবে।
৩. নতুন আবেদন: সমাজসেবা অধিদপ্তরের ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রতিবন্ধী ভাতা ও শিক্ষা উপবৃত্তির অনলাইন আবেদন পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত গ্রহণের কথা জানানো হয়েছিল। আবেদন ও যোগ্যতার সর্বশেষ অবস্থা জানতে সমাজসেবা অধিদপ্তরের আবেদন পোর্টাল দেখা যেতে পারে।
৪. প্রতিবন্ধিতা নিবন্ধন: নতুন উপকারভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধিতা নিবন্ধন নম্বর এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে প্রতিবন্ধিতা তথ্য ব্যবস্থা (DIS) থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য জানা যাবে।
৫. প্রতারণা থেকে সতর্কতা: ভাতা চালু করা বা টাকা ছাড় করানোর নামে কেউ ব্যক্তিগতভাবে অর্থ দাবি করলে যাচাই ছাড়া টাকা দেওয়া উচিত নয়।
ভাতা বাড়লেও বাস্তব চাহিদার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ
প্রতিবন্ধী ভাতার মাসিক হার ১০০ টাকা বাড়ানো এবং উপকারভোগীর সংখ্যা সম্প্রসারণ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। তবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অনেকের চিকিৎসা, ওষুধ, পুনর্বাসন, সহায়ক যন্ত্রপাতি, যাতায়াত ও পরিচর্যার জন্য নিয়মিত ব্যয় রয়েছে। তাই ভাতার কার্যকারিতা নির্ভর করবে সময়মতো অর্থ বিতরণ, প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য সহায়তা নিশ্চিত করার ওপরও।
একই সঙ্গে উপকারভোগীদের অভিযোগ নিষ্পত্তি, তথ্য সংশোধন এবং ভাতা পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করা প্রয়োজন, যাতে যোগ্য ব্যক্তিরা অযথা হয়রানির শিকার না হন।
উপসংহার
২০২৬–২৭ অর্থবছরে সাধারণ প্রতিবন্ধী ভাতার মাসিক হার ১,০০০ টাকা এবং উপকারভোগীর ঘোষিত সংখ্যা ৩৮ লাখ। অন্যদিকে, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের মাসিক শিক্ষা উপবৃত্তি শিক্ষার স্তর অনুযায়ী ১,০০০, ১,১০০, ১,২০০ ও ১,৪০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। শিক্ষা উপবৃত্তির আওতায় উপকারভোগীর সংখ্যা এক লাখে উন্নীত করার ঘোষণাও রয়েছে।
তবে কোনো ব্যক্তি ইতিমধ্যে কত টাকা পেয়েছেন, তাঁর নতুন ভাতা অনুমোদিত হয়েছে কি না কিংবা কোন কিস্তির অর্থ জমা হয়েছে—এসব জানতে ব্যক্তিগত লেনদেনের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট সমাজসেবা কার্যালয়ের তথ্য যাচাই করা জরুরি।
তথ্যসূত্র: সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রকাশিত তথ্য।



