সর্বশেষ প্রকাশিত পোস্টসমূহ

শিক্ষকদের পে-ফিক্সেশনে টাকা আদায়ের অভিযোগ, অনিয়ম বন্ধে কঠোর নির্দেশনার দাবি

বাংলাদেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নতুন বেতন নির্ধারণ বা পে-ফিক্সেশন কার্যক্রম ঘিরে ‘ডাটা এন্ট্রি’ ও ‘অফিস খরচ’-এর নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিক্ষকদের কাছ থেকে জনপ্রতি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে। এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং শিক্ষকদের কাছ থেকে অননুমোদিত অর্থ আদায় বন্ধে প্রতিটি জেলায় কঠোর অফিস আদেশ জারির দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

শিক্ষকদের বেতন নির্ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত অর্থের চাপ তৈরি হলে তা শিক্ষকদের মধ্যে উদ্বেগ ও অসন্তোষ বাড়াতে পারে। বিশেষ করে বেতন ফিক্সেশনের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ, সার্ভিস বুক যাচাই, অনলাইন ফরম পূরণ এবং দাপ্তরিক অনুমোদনের মতো কাজের ক্ষেত্রে দায়িত্ব ও অর্থ আদায়ের নিয়ম স্পষ্ট থাকা জরুরি।

এদিকে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের একটি নোটিশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুযায়ী বেতন নির্ধারণের জন্য iBAS++ ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নোটিশটি ২৮ অক্টোবর ২০২৬ তারিখের বলে উল্লেখ থাকলেও বর্তমান তারিখ ১৮ অক্টোবর ২০২৬; ফলে তারিখটি যাচাই করা প্রয়োজন। তবে নোটিশে বর্ণিত প্রশাসনিক নির্দেশনা এবং শিক্ষকদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ—দুটি বিষয় আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি।

মোহনগঞ্জ উপজেলা শিক্ষা অফিসের নোটিশে যা বলা হয়েছে

ছবিতে দেখা নোটিশটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের উপজেলা শিক্ষা অফিস, মোহনগঞ্জ, নেত্রকোনার নামে জারি করা হয়েছে। এতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুযায়ী বেতন নির্ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য ও ফরম প্রস্তুতের বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

নোটিশের দৃশ্যমান অংশ অনুযায়ী, শিক্ষকদের iBAS++ ব্যবস্থায় প্রবেশ করে ‘Pay Fixation-2026 GoB Staff-Running (Without User ID)’ অপশনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যালয়ের সব শিক্ষকের ফিক্সেশন ফরম একত্র করে একটি ফাইলে জমা দেওয়ার নির্দেশনাও রয়েছে।

নোটিশে আরও বলা হয়েছে, ফরম জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যালয়ের নাম, ফিক্সেশন ফরমের সংখ্যা এবং প্রধান শিক্ষকের নাম উল্লেখ করতে হবে। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ে কাজ সম্পন্ন করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তবে নোটিশটির তারিখ ও সময়সীমায় অসংগতি রয়েছে বলে মনে হচ্ছে। তাই সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে মূল নোটিশের তারিখ, স্মারক নম্বর এবং নির্দেশনার সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।

পে-ফিক্সেশনের নামে ৩০০–৫০০ টাকা আদায়ের অভিযোগ কতটা উদ্বেগজনক?

শিক্ষকদের বেতন ফিক্সেশনের মতো প্রশাসনিক কাজে ‘ডাটা এন্ট্রি’, ‘ফরম পূরণ’ কিংবা ‘অফিস খরচ’-এর নামে জনপ্রতি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠলে তা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

তবে এ ধরনের অর্থ আদায়ের অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ এখানে নেই। তাই অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন না করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি।

যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সরকারি দায়িত্ব পালনের বিনিময়ে অনুমোদনহীনভাবে অর্থ দাবি করে, তাহলে তা প্রশাসনিক জবাবদিহি ও দুর্নীতি প্রতিরোধের প্রশ্ন তৈরি করে। এ ক্ষেত্রে কারা অর্থ চাইছেন, কী উদ্দেশ্যে চাইছেন, কোনো লিখিত নির্দেশনা রয়েছে কি না এবং অর্থ নেওয়ার প্রমাণ আছে কি না—এসব বিষয় তদন্ত করা প্রয়োজন।

সার্ভিস বুক ও ডাটা এন্ট্রির দায়িত্ব কার?

সরকারি কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণে সার্ভিস বুক, চাকরির বিবরণ, পূর্ববর্তী বেতন, ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতি এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। এসব তথ্য যাচাই ও প্রক্রিয়াকরণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নির্ধারিত কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং অনুমোদিত কর্তৃপক্ষের ওপর বর্তায়।

তবে প্রতিটি কাজের জন্য কে দায়িত্বপ্রাপ্ত এবং কোন সেবা বিনা মূল্যে দেওয়া হবে, আর কোথায় কোনো বৈধ ফি প্রযোজ্য—তা সংশ্লিষ্ট বিধি ও সরকারি নির্দেশনার ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে।

শিক্ষকদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হচ্ছে বলেই সেটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈধ অফিস খরচ বলা যায় না। একইভাবে, কোনো অর্থ দাবি করা হলেই প্রমাণ ছাড়া সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অপরাধী বলা যায় না। অর্থ আদায়ের আইনগত ভিত্তি ও ঘটনার বাস্তবতা যাচাই করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

iBAS++ পে-ফিক্সেশনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি

জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুযায়ী বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে iBAS++-এর মতো ডিজিটাল ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হচ্ছে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় তথ্য সংরক্ষণ, যাচাই এবং বেতন নির্ধারণের কাজ সম্পন্ন করা। এই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখতে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ:

  • শিক্ষকদের পে-ফিক্সেশনসংক্রান্ত নির্দেশনা লিখিতভাবে প্রকাশ করা।

  • প্রয়োজনীয় তথ্য ও কাগজপত্রের তালিকা স্পষ্টভাবে জানানো।

  • কোনো সরকারি ফি থাকলে তার বিধিগত ভিত্তি ও নির্ধারিত পরিমাণ উল্লেখ করা।

  • অননুমোদিত অর্থ দাবি বা আদায়ের অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা রাখা।

  • বেতন নির্ধারণে ভুল হলে সংশোধনের পদ্ধতি জানানো।

  • শিক্ষকদের হয়রানি বা অযৌক্তিক আর্থিক চাপের অভিযোগ তদন্ত করা।

এতে শিক্ষক, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং শিক্ষা প্রশাসনের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি কমবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল বেতন নির্ধারণ ব্যবস্থার প্রতি আস্থা বাড়বে।

অনিয়ম বন্ধে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের করণীয়

শিক্ষকদের কাছ থেকে পে-ফিক্সেশনের নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেলে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের (DPEO) বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট উপজেলা শিক্ষা অফিস, হিসাবরক্ষণ কার্যালয় এবং অন্যান্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে তদন্ত করা যেতে পারে।

অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে স্পষ্ট নির্দেশনা জারি করা জরুরি।

একই সঙ্গে শিক্ষকদের জানাতে হবে, বেতন নির্ধারণের জন্য কোনো অর্থ জমা দেওয়ার নির্দেশনা থাকলে তার লিখিত আদেশ, সরকারি প্রজ্ঞাপন বা বিধিগত ভিত্তি দেখতে চাইতে পারেন তাঁরা। মৌখিক নির্দেশের ভিত্তিতে অর্থ দেওয়ার আগে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে যাচাই করা উচিত।

কোথায় অভিযোগ জানাবেন?

কোনো শিক্ষক পে-ফিক্সেশন, ডাটা এন্ট্রি বা দাপ্তরিক কাজের নামে অননুমোদিত অর্থ দাবির শিকার হলে তিনি পরিস্থিতি অনুযায়ী নিচের কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানাতে পারেন:

1. উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (UNO): সংশ্লিষ্ট উপজেলায় প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ জানাতে।

2. জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (DPEO): জেলা পর্যায়ে শিক্ষা প্রশাসনের মাধ্যমে অভিযোগ তদন্তের আবেদন করতে।

3. প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (DPE): সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বিরুদ্ধে অভিযোগ বা প্রশাসনিক প্রতিকার চাইতে।

4. সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ কার্যালয়: বেতন নির্ধারণের প্রক্রিয়া, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ ও অর্থসংক্রান্ত বিধান যাচাই করতে।

অভিযোগের সঙ্গে সম্ভব হলে তারিখ, অর্থ দাবির পরিমাণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয়, বার্তা, রসিদ বা অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণ সংরক্ষণ করা উচিত। এতে অভিযোগ যাচাই করা সহজ হয়।

প্রতিটি জেলায় কঠোর অফিস আদেশের দাবি

শিক্ষকদের বেতন নির্ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে শুধু অভিযোগের অপেক্ষায় থাকলে চলবে না। প্রতিটি জেলার প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসনের উচিত দায়িত্ব বণ্টন, তথ্য জমা দেওয়ার নিয়ম, সংশোধন প্রক্রিয়া এবং অর্থসংক্রান্ত বিধান স্পষ্ট করা।

প্রয়োজনে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বিদ্যালয়ভিত্তিক নির্দেশনা দিতে পারেন, যাতে কোনো শিক্ষককে অননুমোদিত অর্থ দিতে বাধ্য করা না হয়। পাশাপাশি অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন।

এ ধরনের নির্দেশনা বাস্তবায়িত হলে শিক্ষকদের মধ্যে অযথা আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি কমবে। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তি দাপ্তরিক কাজের সুযোগ নিয়ে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করলে তা শনাক্ত ও প্রতিরোধ করা সহজ হবে।

উপসংহার

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা শিক্ষাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁদের বেতন নির্ধারণের প্রক্রিয়া সহজ, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত হওয়া প্রয়োজন। পে-ফিক্সেশনের নামে জনপ্রতি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা আদায়ের অভিযোগ সত্য হলে তা বন্ধে দ্রুত তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

প্রতিটি জেলার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে দাবি—শিক্ষকদের পে-ফিক্সেশন কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করুন, অননুমোদিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ তদন্ত করুন এবং প্রমাণিত অনিয়মের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিন।

শিক্ষকদের কাছ থেকে কোনো অর্থ নেওয়া হলে তার বৈধ ভিত্তি স্পষ্ট থাকতে হবে। সরকারি দাপ্তরিক কাজকে কেন্দ্র করে যেন কেউ অযৌক্তিক আর্থিক চাপের মুখে না পড়েন, সেটিই হওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য।

সোর্স ফাইল

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *