iBAS++ পে ফিক্সেশন ২০২৬: সেন্ড ব্যাক, পিআরএল ও প্রেষণে কর্মরতদের বেতন নির্ধারণে যেসব নিয়ম জানা জরুরি
জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬ অনুযায়ী সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন নির্ধারণ বা পে ফিক্সেশন করতে গিয়ে iBAS++ পোর্টালে বিভিন্ন ধরনের জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বিশেষ করে পে ফিক্সেশন সাবমিট করার পর আবেদন ফেরত পাঠানো বা ‘সেন্ড ব্যাক’, ডিডিওর করণীয়, অবসর-পূর্ব ছুটি (পিআরএল), নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের তথ্য এন্ট্রি এবং প্রেষণে কর্মরতদের বেতন নির্ধারণ নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
এসব বিষয়ে সঠিক নিয়ম জানা না থাকলে পে ফিক্সেশনের কার্যক্রমে বিলম্ব হতে পারে। একই সঙ্গে ভুল তথ্যের ভিত্তিতে বেতন নির্ধারণ করলে পরবর্তী সময়ে সংশোধন বা হিসাব সমন্বয়ের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের চাকরির ধরন, যোগদানের তারিখ, পিআরএলের অবস্থা এবং মূল কর্মস্থলের তথ্য যাচাই করে বেতন নির্ধারণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা জরুরি।
তবে আলোচ্য নিয়মগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ নির্দেশনা ও iBAS++-এর কার্যকর ব্যবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। নিচে উত্থাপিত চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিশ্লেষণ করা হলো।
১. iBAS++ পে ফিক্সেশনে সেন্ড ব্যাক: কার কী দায়িত্ব?
পে ফিক্সেশনের তথ্য এন্ট্রি ও যাচাইয়ের ক্ষেত্রে ড্রয়িং অ্যান্ড ডিসবার্সিং অফিসার (DDO) এবং সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তবে সব ধরনের কর্মচারীর ক্ষেত্রে আবেদন ফেরত পাঠানোর ক্ষমতা বা প্রক্রিয়া একই হবে—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
প্রচলিত প্রক্রিয়ায় কোনো কর্মচারীর তথ্য, পদবি, যোগদানের তারিখ, বেতন বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্যের মধ্যে অসংগতি থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তা সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে।
প্রদত্ত নির্দেশনামূলক তথ্য অনুযায়ী, জিওবি (GOB) স্টাফদের ক্ষেত্রে ডিডিও নিজেই পে ফিক্সেশনের তথ্য সেন্ড ব্যাক করতে পারবেন। অন্যদিকে, এসডিও (SDO) শ্রেণির কর্মচারীদের ক্ষেত্রে ডিডিওর ভূমিকা সীমিত থাকতে পারে; তিনি আবেদনটি সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ে ফরোয়ার্ড করবেন এবং প্রয়োজন হলে সেখান থেকে সংশোধনের জন্য ফেরত আসতে পারে।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—GOB ও SDO শ্রেণির কর্মচারীদের প্রশাসনিক শ্রেণিবিন্যাস এবং পোর্টালে নির্ধারিত ওয়ার্কফ্লো যাচাই না করে সবার জন্য একই নিয়ম প্রয়োগ করা উচিত নয়।
করণীয়: আবেদন সেন্ড ব্যাক হলে প্রথমে পোর্টালে প্রদর্শিত মন্তব্য বা আপত্তি পড়তে হবে। এরপর মূল তথ্যের সঙ্গে পে ফিক্সেশন ফরমের তথ্য মিলিয়ে সংশোধন করতে হবে। কোন পর্যায় থেকে আবেদন ফেরত এসেছে, সেটিও খেয়াল রাখতে হবে। একই ভুল সংশোধন না করে বারবার সাবমিট করলে সমস্যার সমাধান নাও হতে পারে।
২. পিআরএল শেষ হয়ে গেলে কি নতুন বেতনস্কেলে পে ফিক্সেশন করা যাবে?
পিআরএল বা Post-Retirement Leave সরকারি চাকরিজীবীদের অবসর-সংশ্লিষ্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬ অনুযায়ী পে ফিক্সেশনের ক্ষেত্রে কার পিআরএল কখন শেষ হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মচারী ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে কোন অবস্থায় ছিলেন, তা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, যেসব কর্মচারীর পিআরএল ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে শেষ হয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে নতুন স্কেলে নিয়মিত বেতন নির্ধারণের সুযোগ নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, যাঁদের পিআরএল ১ জুলাই ২০২৬ তারিখেও চলমান ছিল, তাঁদের পেনশন নির্ধারণের স্বার্থে নতুন বেতনস্কেল অনুযায়ী ফিক্সেশন প্রয়োজন হতে পারে।
তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট বেতনস্কেলের গেজেট, অবসর ও পিআরএল-সংক্রান্ত বিধান এবং অর্থ বিভাগের নির্দেশনা যাচাই করা জরুরি। কারণ বেতন নির্ধারণ, অবসরকালীন শেষ বেতন এবং পেনশন নির্ধারণ একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও এগুলো একই প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়।
পিআরএলভোগীদের কোন বিষয়গুলো যাচাই করা প্রয়োজন?
- পিআরএল শুরুর তারিখ ও শেষ হওয়ার তারিখ।
- অবসরের কার্যকর তারিখ এবং অবসর-সংক্রান্ত আদেশ।
- ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে কর্মচারীর চাকরিগত অবস্থা।
- সংশ্লিষ্ট নতুন বেতনস্কেল পেনশন নির্ধারণে কীভাবে প্রযোজ্য হবে, সে বিষয়ে সরকারি নির্দেশনা।
- পে ফিক্সেশনের জন্য হিসাবরক্ষণ কার্যালয় বা পেনশন অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র।
পিআরএল শেষ হয়ে যাওয়া কোনো কর্মচারীর ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পে ফিক্সেশন করা যাবে বা যাবে না—এমন সিদ্ধান্ত কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট দেখে নেওয়া উচিত নয়। ব্যক্তির চাকরির রেকর্ড ও প্রযোজ্য বিধানই হবে মূল বিবেচ্য বিষয়।
৩. ১ জুলাই ২০২৬ বা তার পরে নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের পে ফিক্সেশন কীভাবে হবে?
নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে পুরোনো কর্মচারীদের মতো পূর্ববর্তী বেতন, ইনক্রিমেন্ট বা চাকরির ধারাবাহিকতার তথ্য সব সময় প্রযোজ্য হয় না। এ কারণে তাঁদের তথ্য এন্ট্রির প্রক্রিয়ায় নিয়োগের তারিখ ও চাকরির ধরন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে বা এর পরে যোগদানকারী নতুন কর্মচারীদের জন্য iBAS++ পোর্টালে ‘First Recruitment’ রুট ব্যবহার করার কথা বলা হয়েছে।
এই রুটের উদ্দেশ্য হলো নতুন নিয়োগের ভিত্তিতে কর্মচারীর প্রাথমিক বেতন নির্ধারণের তথ্য এন্ট্রি করা। তবে কোন তারিখ থেকে কোন নিয়োগপ্রাপ্তের ক্ষেত্রে নতুন স্কেল প্রযোজ্য হবে, তা নির্ভর করবে কার্যকর গেজেট, নিয়োগের শর্ত এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি নির্দেশনার ওপর।
নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ যাচাই
১. নিয়োগপত্রে উল্লেখিত পদবি ও গ্রেড সঠিক কি না।
২. যোগদানের তারিখ নিয়োগসংক্রান্ত নথির সঙ্গে মিলছে কি না।
৩. সংশ্লিষ্ট পদে অনুমোদিত প্রারম্ভিক মূল বেতন সঠিকভাবে নির্বাচন করা হয়েছে কি না।
৪. পূর্ববর্তী চাকরির অভিজ্ঞতা বা বেতনকে ভুল করে নতুন নিয়োগের তথ্যের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে কি না।
৫. পোর্টালে নির্ধারিত রুট নির্বাচন করে তথ্য সাবমিট করা হয়েছে কি না।
নতুন কর্মচারীর ক্ষেত্রে ভুল রুট ব্যবহার করলে তথ্য যাচাই বা অনুমোদনের পর্যায়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই এন্ট্রির আগে সংশ্লিষ্ট অফিসের প্রশাসনিক শাখা ও ডিডিওর সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে নেওয়া ভালো।
৪. প্রেষণে (Deputation) কর্মরতদের বেতন কোন অফিসের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে?
সরকারি চাকরিতে প্রেষণ বা ডেপুটেশন হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে কোনো কর্মচারী তাঁর মূল দপ্তর থেকে অন্য দপ্তর বা প্রতিষ্ঠানে নির্দিষ্ট শর্তে দায়িত্ব পালন করেন। এ ধরনের কর্মচারীর পে ফিক্সেশনে মূল দপ্তর এবং প্রেষণকারী প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে।
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রেষণে কর্মরত কর্মচারীদের ১ জুলাই ২০২৬ তারিখের বেতন নির্ধারণে তাঁদের মূল অফিসের প্রাপ্য মূল বেতনকে ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে।
এর অর্থ, প্রেষণে কর্মরত ব্যক্তির বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু বর্তমান কর্মস্থলের পদবি বা দায়িত্ব দেখলেই চলবে না। তাঁর মূল পদ, মূল দপ্তরের বেতন রেকর্ড, প্রেষণ-সংক্রান্ত আদেশ এবং প্রযোজ্য বেতনবিধি যাচাই করতে হবে।
প্রেষণে কর্মরতদের ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ
- মূল দপ্তরে সর্বশেষ অনুমোদিত মূল বেতন।
- মূল পদ ও গ্রেডের সঠিক তথ্য।
- প্রেষণ আদেশের কার্যকারিতা এবং বেতন-সংক্রান্ত শর্ত।
- ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে প্রযোজ্য বেতন নির্ধারণের বিধান।
- মূল দপ্তর ও প্রেষণকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বেতন-সংক্রান্ত দায়িত্ব বণ্টন।
প্রেষণে কর্মরত সব কর্মচারীর ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে, এমনটি ধরে নেওয়া উচিত নয়। প্রেষণের ধরন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের চাকরিবিধি এবং বেতন প্রদানের ব্যবস্থা অনুযায়ী প্রক্রিয়ায় পার্থক্য থাকতে পারে। তাই পে ফিক্সেশন সাবমিট করার আগে মূল দপ্তরের বেতন বিবরণী ও প্রেষণ আদেশের সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
পে ফিক্সেশন দ্রুত সম্পন্ন করতে করণীয়
iBAS++-এ বেতন নির্ধারণের সময় সমস্যা এড়াতে সংশ্লিষ্ট কর্মচারী, ডিডিও এবং হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের সমন্বয় জরুরি। বিশেষ করে যেসব ক্ষেত্রে চাকরির অবস্থা, বেতন রেকর্ড বা প্রশাসনিক শ্রেণি নিয়ে অসংগতি রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করে সাবমিট না করে আগে তথ্য যাচাই করা উচিত।
কর্মচারীদের জন্য কয়েকটি পরামর্শ হলো—
- পে ফিক্সেশন সাবমিট করার আগে নাম, পদবি, গ্রেড, যোগদানের তারিখ ও মূল বেতন যাচাই করুন।
- আবেদন ফেরত এলে পোর্টালে দেওয়া আপত্তির কারণ বুঝে সংশোধন করুন।
- পিআরএল বা অবসর-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে চাকরির রেকর্ড ও অবসর আদেশ মিলিয়ে নিন।
- নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত হলে সঠিক এন্ট্রি রুট নির্বাচন করুন।
- প্রেষণে কর্মরত হলে মূল দপ্তরের বেতন রেকর্ড ও প্রেষণ আদেশ যাচাই করুন।
- জটিলতা সমাধান না হলে সংশ্লিষ্ট ডিডিও, হিসাবরক্ষণ কার্যালয় বা প্রশাসনিক শাখার সহায়তা নিন।
শেষ কথা
জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬ অনুযায়ী iBAS++ পে ফিক্সেশনের ক্ষেত্রে সেন্ড ব্যাক, পিআরএল, নতুন নিয়োগ এবং প্রেষণে কর্মরতদের বেতন নির্ধারণ—এই চারটি বিষয় বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। প্রতিটি ক্ষেত্রে কর্মচারীর চাকরিগত অবস্থান ও প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করা প্রয়োজন।
তবে এখানে আলোচিত কিছু নিয়ম প্রদত্ত নির্দেশনামূলক তথ্যের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে; সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মূল পরিপত্র, গেজেট বা iBAS++-এর আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা সরাসরি যাচাই করা হয়নি। ফলে এগুলোকে চূড়ান্ত সরকারি নির্দেশনা হিসেবে ধরে নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
সরকারি কর্মচারীদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি হলো—নিজের চাকরির রেকর্ড যাচাই করা, পোর্টালে প্রদর্শিত আপত্তির কারণ অনুসরণ করা এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের লিখিত নির্দেশনা নেওয়া। এতে ভুল পে ফিক্সেশন, অপ্রয়োজনীয় আবেদন ফেরত আসা এবং পরবর্তী সময়ে বেতন বা পেনশন সমন্বয়ের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে।



