সরকারি ক্রয়ে নতুন যুগের সূচনা : পাস হলো পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) বিল-২০২৬
বাংলাদেশ সরকারের কেনাকাটা বা পাবলিক প্রকিউরমেন্ট ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার এনে আজ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে বহুল আলোচিত ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) বিল-২০২৬’। এই বিলের মাধ্যমে ২০০৬ সালের পুরনো আইনটি সংশোধিত হয়ে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হলো।
১. ‘ভ্যালু ফর মানি’ ও দক্ষতার ওপর গুরুত্ব
নতুন এই আইনের মূল উদ্দেশ্য শুধু স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিলে এখন থেকে সরকারি অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার (Value for Money), দক্ষতা, পেশাদার নৈতিকতা এবং গুণগত মান নিশ্চিত করার বিষয়টিকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিলটি পাসের সময় জানান, এই সংস্কারের ফলে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় কমবে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আসবে।
২. টেকসই পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (SPP)
বিলটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো প্রথমবারের মতো ‘সাস্টেইনেবল পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (এসপিপি)’ ধারণা অন্তর্ভুক্ত করা। এখন থেকে সরকারি কেনাকাটার ক্ষেত্রে কেবল দাম কম হলেই চলবে না, বরং সেই পণ্য বা সেবা পরিবেশের ওপর কী প্রভাব ফেলছে, সামাজিক উন্নয়ন ও দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে তা কতটা সহায়ক—সেগুলোও বিবেচনা করতে হবে।
৩. শ্রমিক অধিকার ও পরিবেশ সুরক্ষা
বিলের নতুন ১৬ ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, কোনো টেন্ডার বা দরপত্র দলিলে এমন কোনো শর্ত রাখা যাবে না যা পরিবেশের ক্ষতি করে। এছাড়া শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা, সামাজিক সুবিধা প্রদান এবং শিশুশ্রম নিষিদ্ধকরণের মতো বিষয়গুলো টেন্ডার প্রক্রিয়ায় কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
৪. রিভার্স অকশন (Reverse Auction) প্রযুক্তি
আধুনিক প্রযুক্তির অংশ হিসেবে বিলে ‘রিভার্স অকশন’ পদ্ধতি চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি এমন এক ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা যেখানে সরবরাহকারীরা রিয়েল-টাইমে একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে দাম কমিয়ে দরপত্রে অংশ নিতে পারবেন। এতে সরকারের সাশ্রয় হওয়ার পাশাপাশি প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হবে।
৫. ই-জিপি (e-GP) ব্যবহার বাধ্যতামূলক
স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সব ধরনের সরকারি ক্রয় কার্যক্রমে ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট (e-GP) পোর্টাল ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বিশেষ কোনো কারণে এর ব্যতিক্রম করতে হলে এখন থেকে বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ)-এর পূর্বানুমোদন নিতে হবে।
৬. আন্তর্জাতিক কার্যক্রম ও অধ্যাদেশ থেকে আইন
উল্লেখ্য যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জারি করা ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’-কে এই বিলের মাধ্যমে স্থায়ী আইনে পরিণত করা হলো। এছাড়া বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাস বা মিশনগুলো যাতে স্থানীয় আইন বা আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করে কেনাকাটা করতে পারে, সেই পথও এই বিলে সুগম করা হয়েছে (অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন সাপেক্ষে)।
উপসংহার: সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ২০২৬ সালের এই সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় খাত ডিজিটাল থেকে স্মার্ট যুগে প্রবেশ করল। পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করে এই আইনটি আগামীর ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



