অষ্টম পে স্কেলের এক দশক: বেতন বাড়লেও রয়ে গেছে বৈষম্যের অভিযোগ
২০১৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর প্রকাশিত গেজেটের মাধ্যমে কার্যকর হওয়া অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য একটি বড় পরিবর্তন নিয়ে এলেও, এর বিভিন্ন অসঙ্গতি ও বৈষম্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাতিল, বিভিন্ন গ্রেডের মধ্যে অস্বাভাবিক বেতন ব্যবধান এবং নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের আর্থিক সুবিধা নিয়ে অসন্তোষ এখনও পুরোপুরি দূর হয়নি।
এদিকে, প্রায় এক দশক পর উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে সরকার নতুন পে কমিশন গঠন করেছে। কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে ২০২৬ সালে নবম জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে।
অষ্টম পে স্কেল কার্যকর হয় ২০১৫ সালে
অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেল ১ জুলাই ২০১৫ থেকে কার্যকর হয়। পরে ১৫ ডিসেম্বর ২০১৫ অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ এ-সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ গেজেট প্রকাশ করে।
এই বেতন কাঠামো অনুযায়ী—
- প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত মূল বেতন ছিল ৭৮ হাজার টাকা।
- সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের মূল বেতন নির্ধারণ করা হয় ৮ হাজার ২৫০ টাকা।
- সপ্তম পে স্কেলের তুলনায় প্রথম গ্রেডের মূল বেতন প্রায় ১৯৫ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন ২০১ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।
সে সময় এটি সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য উল্লেখযোগ্য বেতন বৃদ্ধি হিসেবে বিবেচিত হলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন অসঙ্গতি সামনে আসে।
যেসব কারণে সমালোচনায় আসে অষ্টম পে স্কেল
টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাতিল
অষ্টম পে স্কেলের সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্ত ছিল টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাতিল করা।
এর ফলে দীর্ঘদিন একই পদে কর্মরত অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। বিশেষ করে যেসব বিভাগে পদোন্নতির সুযোগ সীমিত, সেখানে কর্মরতদের মধ্যে অসন্তোষ বৃদ্ধি পায়।
গ্রেডভিত্তিক বৈষম্য
সরকারি চাকরিজীবীদের অভিযোগের অন্যতম কারণ ছিল বিভিন্ন গ্রেডের মধ্যে মূল বেতনের অস্বাভাবিক কম ব্যবধান।
উদাহরণ হিসেবে—
- ৮ম গ্রেড: ২৩,০০০ টাকা
- ৯ম গ্রেড: ২২,০০০ টাকা
দুই গ্রেডের মধ্যে মাত্র ১ হাজার টাকা পার্থক্য থাকায় পদোন্নতির আর্থিক প্রণোদনা অনেকাংশে কমে যায় বলে অভিযোগ ওঠে।
এছাড়া ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের অনেকেই মনে করেন, বেতন বৃদ্ধি হলেও জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় তারা প্রত্যাশিত সুবিধা পাননি।
অবসর সুবিধা নিয়ে জটিলতা
অষ্টম পে স্কেল কার্যকরের সময়ের কাছাকাছি অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে নতুন বেতন স্কেলের ভিত্তিতে পেনশন ও গ্র্যাচুইটি নির্ধারণ নিয়ে নানা জটিলতা সৃষ্টি হয়।
বিভিন্ন পর্যায়ে এ বিষয়ে আবেদন ও দাবিও উত্থাপিত হয়েছিল।
ইনক্রিমেন্ট স্থগিতের বিতর্ক
পে স্কেল কার্যকরের শুরুতে এক বছরের জন্য বাৎসরিক ইনক্রিমেন্ট স্থগিত রাখার একটি প্রস্তাবও ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।
সরকারি কর্মচারীদের বিভিন্ন সংগঠন এটিকে আইন ও প্রচলিত বিধির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছিল।
অষ্টম পে স্কেলের কার্যকর মূল বেতন কাঠামো
অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেলে মোট ২০টি গ্রেড ছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গ্রেডের মূল বেতন ছিল—
| গ্রেড | মূল বেতন |
|---|---|
| ১ম | ৭৮,০০০ টাকা (নির্ধারিত) |
| ২য় | ৬৬,০০০ টাকা |
| ৩য় | ৫৬,০০০ টাকা |
| ৪র্থ | ৫০,০০০ টাকা |
| ৫ম | ৪৩,০০০ টাকা |
| ৬ষ্ঠ | ৩৫,৫০০ টাকা |
| ৭ম | ২৯,০০০ টাকা |
| ৮ম | ২৩,০০০ টাকা |
| ৯ম | ২২,০০০ টাকা |
| ১০ম | ১৬,০০০ টাকা |
| ১১তম | ১২,৫০০ টাকা |
| ১২তম | ১১,৩০০ টাকা |
| ১৩তম | ১১,০০০ টাকা |
| ১৪তম | ১০,২০০ টাকা |
| ১৫তম | ৯,৭০০ টাকা |
| ১৬তম | ৯,৩০০ টাকা |
| ১৭তম | ৯,০০০ টাকা |
| ১৮তম | ৮,৮০০ টাকা |
| ১৯তম | ৮,৫০০ টাকা |
| ২০তম | ৮,২৫০ টাকা |
কেন নতুন পে স্কেল এখন সময়ের দাবি
অষ্টম পে স্কেল কার্যকরের পর দেশে মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
খাদ্যপণ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্তমান বেতন কাঠামো বাস্তব জীবনের ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে সরকারি কর্মচারীদের দাবি।
অর্থনীতিবিদদেরও অনেকে মনে করেন, নিয়মিত সময়ের ব্যবধানে বেতন কাঠামো পুনর্বিবেচনা না করলে সরকারি চাকরির আকর্ষণ কমে যেতে পারে।
নবম পে স্কেলে কী থাকতে পারে
নতুন পে কমিশনের প্রাথমিক আলোচনা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী কয়েকটি বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে।
মূল বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে
মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিয়ে মূল বেতন দ্বিগুণের কাছাকাছি বাড়ানোর বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।
সে ক্ষেত্রে—
- প্রথম গ্রেডের মূল বেতন প্রায় ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা
- সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ টাকা
হতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে।
তবে এ ধরনের কোনো অঙ্ক এখনো সরকারিভাবে অনুমোদিত বা গেজেটভুক্ত হয়নি।
গ্রেড সংখ্যা কমানোর চিন্তা
বর্তমান ২০টি গ্রেড কমিয়ে তুলনামূলক কম সংখ্যক গ্রেডে নতুন কাঠামো তৈরির বিষয়টি কমিশন বিবেচনা করছে।
এতে পদোন্নতি কাঠামো সহজ হওয়ার পাশাপাশি বেতন বৈষম্যও কিছুটা কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভাতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা
চিকিৎসা ভাতা, শিক্ষা ভাতা এবং অবসরোত্তর চিকিৎসা সুবিধা বৃদ্ধির বিষয়েও কমিশনের প্রাথমিক পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে।
বর্তমান চিকিৎসা ভাতা দীর্ঘদিন অপরিবর্তিত থাকায় এটি বাড়ানোর দাবি দীর্ঘদিনের।
পদোন্নতি ব্যবস্থায় নতুন কাঠামো
টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড পুনর্বহাল না করে পদোন্নতি প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর ও সহজ করার বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মত
জনপ্রশাসন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র বেতন বৃদ্ধি করলেই হবে না; নতুন পে স্কেলে গ্রেডভিত্তিক বৈষম্য, পদোন্নতির সুযোগ, ভাতা এবং অবসর সুবিধার মধ্যেও ভারসাম্য নিশ্চিত করতে হবে।
তাদের মতে, নতুন বেতন কাঠামো এমন হওয়া উচিত যাতে একই সঙ্গে সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবিলা এবং রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতার মধ্যে একটি বাস্তবসম্মত ভারসাম্য বজায় থাকে।
যা এখনো চূড়ান্ত নয়
যদিও নতুন পে কমিশনের কাজ চলছে এবং বিভিন্ন সম্ভাব্য কাঠামো নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তবে নবম জাতীয় বেতন স্কেলের কোনো চূড়ান্ত বেতন কাঠামো, গ্রেড সংখ্যা বা কার্যকরের নির্দিষ্ট তারিখ এখনো সরকারিভাবে গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়নি।
অতএব, বর্তমানে প্রচারিত সম্ভাব্য বেতন কাঠামোকে সরকারি সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়, বরং কমিশনের আলোচনা ও বিভিন্ন সূত্রে প্রকাশিত সম্ভাব্য প্রস্তাব হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।



