বৈষম্য । দাবীর খতিয়ান । পুন:বিবেচনা

৮ম পে-স্কেলে বৈষম্যের অভিযোগ: কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ব্যবধান নিয়ে ফের আলোচনায় পুরোনো কাঠামো

সরকারি চাকরিজীবীদের অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেল (২০১৫) কার্যকরের এক দশকের বেশি সময় পরও বেতন কাঠামোতে বিদ্যমান বিভিন্ন অসঙ্গতি ও বৈষম্যের অভিযোগ আবারও আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের দাবি, অষ্টম পে-স্কেলে তাদের বেতন বৃদ্ধি, গ্রেড ব্যবধান এবং ভাতার কাঠামো এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, যা উচ্চ গ্রেডের কর্মকর্তাদের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৈষম্য সৃষ্টি করেছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মচারী সংগঠন ও বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মচারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের পে-স্কেল প্রণয়নের সময় টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাতিল করা হলেও তার পরিবর্তে যে উচ্চতর গ্রেড ব্যবস্থা চালু করা হয়, তা সব কর্মচারীর জন্য সমানভাবে কার্যকর সুবিধা নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে দীর্ঘ সময় একই গ্রেডে কর্মরত অনেক কর্মচারী প্রত্যাশিত আর্থিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাতিলের প্রভাব

অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেলের অন্যতম বড় পরিবর্তন ছিল টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাতিল করা। পূর্ববর্তী কাঠামোতে নির্দিষ্ট সময় পর কর্মচারীরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে উচ্চতর গ্রেডে উন্নীত হওয়ার সুযোগ পেতেন। নতুন ব্যবস্থায় দুটি উচ্চতর গ্রেডের সুযোগ রাখা হলেও অনেকের মতে এটি পূর্বের সুবিধার সমপর্যায়ের নয়।

কর্মচারী প্রতিনিধিদের অভিযোগ, বিশেষ করে ১৫ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে দীর্ঘ চাকরি করেও বেতন বৃদ্ধির হার সীমিত থেকেছে এবং পদোন্নতির সুযোগ কম থাকায় আর্থিক অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

গ্রেড ব্যবধানে বৈষম্যের অভিযোগ

কর্মচারীদের দাবি, ১১ থেকে ২০তম গ্রেডে বেতনের ব্যবধান অত্যন্ত কম রাখা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেন, ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা থেকে ১৯তম গ্রেডে মাত্র ৮,৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। একইভাবে পরবর্তী গ্রেডগুলোতেও সীমিত হারে বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে।

অন্যদিকে, ১ থেকে ১০ম গ্রেডে বেতনের ব্যবধান তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। ফলে উচ্চ গ্রেডের কর্মকর্তারা বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ও গ্রেডভিত্তিক বেতন বৃদ্ধিতে তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা পান বলে কর্মচারীরা অভিযোগ করছেন।

বার্ষিক ইনক্রিমেন্টেও ব্যবধান

কর্মচারীদের উপস্থাপিত হিসাব অনুযায়ী, ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের ১০টি গ্রেডের মোট মূল বেতন ৯৮,৫৫০ টাকা থেকে ইনক্রিমেন্টের পর ১,০৩,৫১০ টাকায় উন্নীত হয়। অর্থাৎ মোট বৃদ্ধি হয় ৪,৯৬০ টাকা, যা গড়ে প্রায় ৫.০৩ শতাংশ।

অন্যদিকে, ১ থেকে ১০ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে একই ধরনের হিসাবে মোট বেতন ৪,০৩,১০০ টাকা থেকে বেড়ে ৪,৩৩,৯৬০ টাকায় পৌঁছায়। এতে মোট বৃদ্ধি হয় ৩০,৮৬০ টাকা বা গড়ে প্রায় ৭.৬৫ শতাংশ।

কর্মচারী সংগঠনগুলোর দাবি, এই হিসাবে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে প্রায় ২.৬২ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে, যা নতুন পে-স্কেলে পুনর্বিবেচনা করা উচিত।

ভাতা যুগোপযোগী নয় বলে অভিযোগ

অষ্টম পে-স্কেলে নির্ধারিত বিভিন্ন ভাতা নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। কর্মচারীদের মতে, ২০১৫ সালে নির্ধারিত যাতায়াত ভাতা, চিকিৎসা ভাতা, শিক্ষা ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা বর্তমান বাজারদর ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে আর সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বিশেষ করে ৩০০ টাকার যাতায়াত ভাতা এবং দীর্ঘদিন অপরিবর্তিত চিকিৎসা ভাতা বর্তমান মূল্যস্ফীতির বাস্তবতায় কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। অনেকের মতে, বাড়িভাড়া ভাতাও বর্তমান আবাসন ব্যয়ের তুলনায় পর্যাপ্ত নয়।

কিছু শ্রেণির কর্মচারী বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ

কর্মচারীদের অভিযোগ অনুযায়ী, ১ জুলাই ২০১৫ সালের আগে অবসরে যাওয়া অনেক সরকারি কর্মচারী নতুন বেতন কাঠামোর আর্থিক সুবিধা পাননি। এছাড়া কিছু চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মচারীও একই ধরনের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

এছাড়া বিভিন্ন ক্যাডার ও বাহিনীর মধ্যে বেতন, ঝুঁকি ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রেও বৈষম্যের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে।

দক্ষতাভিত্তিক ইনক্রিমেন্ট বাতিলের সমালোচনা

অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিকসহ কিছু পদের জন্য পূর্বে বিদ্যমান দক্ষতাভিত্তিক অতিরিক্ত দুইটি ইনক্রিমেন্ট বাতিল করাকেও কর্মচারীরা নেতিবাচক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এতে দক্ষতা অর্জনের আর্থিক প্রণোদনা কমে গেছে।

নবম পে-স্কেলে কী চান কর্মচারীরা?

নবম জাতীয় পে-স্কেল নিয়ে চলমান আলোচনায় কর্মচারীদের অন্যতম দাবি হলো—

  • কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে গ্রেড ব্যবধান যৌক্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ করা।
  • ১১ থেকে ২০তম গ্রেডে বেতন বৃদ্ধির হার পুনর্নির্ধারণ।
  • বর্তমান মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সব ধরনের ভাতা বৃদ্ধি।
  • দীর্ঘদিন একই গ্রেডে কর্মরতদের জন্য কার্যকর উচ্চতর গ্রেড বা বিকল্প সুবিধা নিশ্চিত করা।
  • বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করা।

বিশেষজ্ঞদের মত

জনপ্রশাসন ও অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, একটি কার্যকর বেতন কাঠামোর মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত কর্মীদের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবিলায় সহায়তা এবং বিভিন্ন গ্রেডের মধ্যে যৌক্তিক ভারসাম্য বজায় রাখা। তারা মনে করেন, দীর্ঘ সময় ধরে অপরিবর্তিত থাকা ভাতা ও বেতন কাঠামো মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে কর্মচারীদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়।

উপসংহার

অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেল নিয়ে উত্থাপিত এসব অভিযোগ নতুন নয়। তবে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া সামনে রেখে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বৈষম্য, ইনক্রিমেন্টের হার, গ্রেড ব্যবধান এবং ভাতা পুনর্বিন্যাসের বিষয়গুলো আবারও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনায় এসেছে।

যদিও কর্মচারী সংগঠনগুলো সমতাভিত্তিক ও যুগোপযোগী বেতন কাঠামোর দাবি জানিয়ে আসছে, তবুও সরকার এখন পর্যন্ত নবম পে-স্কেলের চূড়ান্ত কাঠামো সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত প্রকাশ করেনি। ফলে নতুন পে-স্কেলে এই দাবিগুলোর কতটা প্রতিফলন ঘটবে, সেটিই এখন সরকারি চাকরিজীবীদের প্রধান প্রত্যাশা।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *