আগস্টেই গেজেটের সম্ভাবনা, ১ জুলাই থেকেই কার্যকারিতা—চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দ্বারপ্রান্তে নবম পে-স্কেল
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নতুন বেতনকাঠামো বা নবম জাতীয় পে-স্কেল চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫-এর সুপারিশ পর্যালোচনায় গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটি চলতি মাসের মধ্যেই তাদের সুপারিশ চূড়ান্ত করতে পারে। এরপর তা মন্ত্রিসভার অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে আগামী আগস্ট মাসের মধ্যেই নতুন পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের প্রস্তুতি রয়েছে সরকারের। তবে গেজেট প্রকাশের সময় যাই হোক না কেন, নতুন বেতনকাঠামোর আর্থিক কার্যকারিতা ধরা হবে ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে।
অর্থ বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নতুন পে-স্কেল এক ধাপে বাস্তবায়ন হবে নাকি দুই বা ততোধিক ধাপে কার্যকর করা হবে—সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে মন্ত্রিসভা। তবে সরকারি প্রস্তুতি অনুযায়ী, কার্যকারিতা ১ জুলাই থেকেই গণ্য করা হবে এবং পরে গেজেট জারি করা হবে।
শুধু মূল বেতন নয়, বদল আসছে ভাতা কাঠামোতেও
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, এবারের পে-স্কেল শুধু মূল বেতন বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। বরং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন ভাতা ও সুযোগ-সুবিধার কাঠামোও নতুনভাবে সাজানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াত ভাতাসহ বিভিন্ন ভাতা পুনর্বিন্যাসের কাজ চলছে। কয়েকটি বিদ্যমান ভাতা একীভূত করার বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে। পাশাপাশি বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন কিছু সুবিধা যুক্ত করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
এছাড়া অবসরকালীন সুবিধা, পেনশন এবং গ্র্যাচুইটির কাঠামোতেও পরিবর্তনের প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে। এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে একাধিক বিধিবদ্ধ নিয়ন্ত্রক আদেশ (এসআরও) জারি করতে হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় এসআরওর খসড়া প্রস্তুতের নির্দেশ ইতোমধ্যে অর্থ বিভাগকে দেওয়া হয়েছে।
সচিব কমিটির যাচাই শেষে যাবে মন্ত্রিসভায়
জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫–সংক্রান্ত সুপারিশ প্রণয়ন কমিটির বৈঠকে বিভিন্ন বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। এখন সচিব কমিটি আর্থিক সক্ষমতা, প্রশাসনিক প্রভাব ও কারিগরি দিকগুলো যাচাই করে চূড়ান্ত সুপারিশ মন্ত্রিসভার কাছে পাঠাবে।
মন্ত্রিসভা অনুমোদন দিলে এরপর আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং, প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন এবং সরকারি গেজেট প্রকাশের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে।
১১ বছর পর নতুন পে-স্কেল
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল ঘোষণা করা হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর প্রতিবছর মূল বেতনের ওপর ৫ শতাংশ বার্ষিক বৃদ্ধি দেওয়া হলেও নতুন কোনো জাতীয় পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়নি।
জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির কারণে দীর্ঘদিন ধরেই নতুন বেতনকাঠামোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ কী ছিল?
অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ গঠন করে। কমিশন গত ২২ জানুয়ারি সরকারের কাছে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করে।
প্রস্তাব অনুযায়ী—
- সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০,০০০ টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে।
- সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,৬০,০০০ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।
- বৈশাখী ভাতা বর্তমানের ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে।
- বিশেষ করে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের যাতায়াত ভাতাসহ বিভিন্ন ভাতায় বড় ধরনের সংস্কারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
উচ্চপর্যায়ের ১০ সদস্যের কমিটি
জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ যাচাই করতে গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়।
কমিটিতে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব, অর্থসচিব, জনপ্রশাসনসচিব, আইনসচিব, প্রতিরক্ষা সচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা সচিব, স্বাস্থ্যসেবা সচিব, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার এবং হিসাব মহানিয়ন্ত্রক।
কমিটির দায়িত্ব জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫, বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশন-২০২৫ এবং সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিটি-২০২৫-এর প্রতিবেদন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সরকারের কাছে সুপারিশ উপস্থাপন করা।
নিম্ন গ্রেডে বেশি গুরুত্ব
সংশ্লিষ্ট এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, এবার নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ধারণা অনুযায়ী—
- ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
- ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে বৃদ্ধি ৯০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
যদিও এগুলো এখনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নয়; মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পরই চূড়ান্ত কাঠামো জানা যাবে।
কর্মচারী নেতাদের প্রত্যাশা
আন্তমন্ত্রণালয় কর্মচারী অ্যাসোসিয়েশনের সমন্বয়ক নজরুল ইসলাম বলেছেন, দীর্ঘ সময় পর নতুন বেতনকাঠামো প্রণয়ন হওয়ায় সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
তার মতে, শুধু মূল বেতন বাড়ালেই হবে না; মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত ভাতা, পেনশন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও বাস্তবসম্মতভাবে সংস্কার করতে হবে।
এক ধাপ নাকি দুই ধাপ?
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
শুরুতে তিন ধাপে বাস্তবায়নের একটি প্রস্তাব ছিল। পরে দুই ধাপের বিকল্পও আলোচনায় আসে। বর্তমানে বিষয়টি পুরোপুরি মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
২০১৫ সালের পে-স্কেলও দুই ধাপে বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। প্রথম বছরে মূল বেতন কার্যকর হয় এবং পরের বছরে বিভিন্ন ভাতা সমন্বয় করা হয়।
সাবেক অর্থসচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরীর মতে, বর্তমান আর্থিক বাস্তবতা বিবেচনায় এবারও দুই ধাপে বাস্তবায়নের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে তিনি মনে করেন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি প্রয়োজন হলেও দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
সরকারের আর্থিক প্রস্তুতি
অর্থ বিভাগের হিসাবে বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য বছরে প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে।
জাতীয় বেতন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, নতুন বেতনকাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়নে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে।
তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার জন্য ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা এবং পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ মোট ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, নতুন বেতনকাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের জন্য অতিরিক্ত ৪৪ হাজার কোটি টাকা সংরক্ষিত রয়েছে।
বাজেটেই ছিল ঘোষণা
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় ঘোষণা দিয়েছিলেন, নতুন বেতনকাঠামো চলতি অর্থবছর থেকেই বাস্তবায়ন শুরু হবে এবং এর কার্যকারিতা ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ধরা হবে।
কী অপেক্ষা করছে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য?
সব প্রক্রিয়া নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হলে ২০১৫ সালের পর প্রথমবারের মতো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা একটি পূর্ণাঙ্গ নতুন জাতীয় পে-স্কেল পাবেন। শুধু মূল বেতন নয়, ভাতা, পেনশন, অবসর-সুবিধা এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধায়ও বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তবে বেতন বৃদ্ধির হার, বাস্তবায়নের ধাপ, ভাতা পুনর্বিন্যাস এবং অতিরিক্ত সুবিধার চূড়ান্ত রূপ জানতে এখন অপেক্ষা করতে হবে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত ও সরকারি গেজেট প্রকাশ পর্যন্ত।


