পেনশন । লাম্পগ্র্যান্ট I পিআরএল

এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অবসর ও কল্যাণ ভাতার হিসাব: চাকরির মেয়াদ অনুযায়ী কত টাকা মিলবে

এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষকদের চাকরিজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক বিষয় হলো অবসর ও কল্যাণ সুবিধা। দীর্ঘদিন চাকরি করার পর অবসরে গেলে শেষ মূল বেতন এবং চাকরির মেয়াদের ভিত্তিতে এককালীন আর্থিক সুবিধা পাওয়ার বিধান রয়েছে। তবে অবসর ও কল্যাণ—এই দুই সুবিধার হিসাব এক নয়। প্রচলিত হিসাবপদ্ধতিতে কল্যাণ সুবিধা চাকরির বছর দিয়ে এবং অবসর সুবিধা চাকরির মেয়াদের নির্ধারিত মাসসংখ্যা দিয়ে হিসাব করা হয়।

সম্প্রতি প্রকাশিত হিসাবচিত্রে এই দুই সুবিধার সম্ভাব্য হিসাব খুব সহজভাবে তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি চলতি ২০২৬ সালে দীর্ঘদিন আটকে থাকা এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর ও কল্যাণ সুবিধা পরিশোধের উদ্যোগও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সরকারি উদ্যোগে প্রায় ৭৫ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীর পাওনা পরিশোধের প্রস্তুতির খবরও প্রকাশিত হয়েছে।

কল্যাণ ভাতা কীভাবে হিসাব করা হয়

প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, কল্যাণ ভাতার ক্ষেত্রে একটি সরল সূত্র দেখানো হয়েছে—

কল্যাণ ভাতা = সর্বশেষ মূল বেতন × চাকরির মোট বছর

অর্থাৎ অবসরের সময় একজন শিক্ষক যে মূল বেতন পেতেন, সেটিকে চাকরির মোট বছর দিয়ে গুণ করে কল্যাণ ভাতার পরিমাণ নির্ণয়ের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে।

যেমন, কোনো শিক্ষকের সর্বশেষ মূল বেতন যদি ২৬ হাজার ৬৮০ টাকা হয় এবং তিনি ২৯ বছর চাকরি করেন, তাহলে হিসাব হবে—

২৬,৬৮০ × ২৯ = ৭,৭৩,৭২০ টাকা।

অন্যদিকে একই মূল বেতনে ২০ বছর চাকরি করলে—

২৬,৬৮০ × ২০ = ৫,৩৩,৬০০ টাকা।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চাকরির মেয়াদ যত বাড়ে, এই সূত্রে হিসাব করা কল্যাণ সুবিধার পরিমাণও তত বাড়ে।

অবসর ভাতার হিসাব আলাদা

অবসর সুবিধার ক্ষেত্রে প্রকাশিত চার্টে চাকরির মেয়াদকে নির্দিষ্ট মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ সুবিধায় রূপান্তর করা হয়েছে।

অর্থাৎ—

অবসর ভাতা = সর্বশেষ মূল বেতন × প্রযোজ্য মাসসংখ্যা।

এই হিসাবে ২৫ বছর বা তার বেশি চাকরির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৭৫ মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ অবসর সুবিধার কথা দেখানো হয়েছে। ৭৫ মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ অবসর সুবিধার বিষয়টি শিক্ষকদের অবসর সুবিধা সংক্রান্ত প্রকাশিত তথ্যেও উল্লেখ রয়েছে।

চাকরির মেয়াদ অনুযায়ী অবসর সুবিধার মাসসংখ্যা

প্রকাশিত তালিকায় চাকরির মেয়াদ অনুযায়ী অবসর সুবিধার মাসসংখ্যা এভাবে দেখানো হয়েছে—

চাকরির কার্যকর মেয়াদঅবসর সুবিধা১০ বছর বা তদূর্ধ্ব ১১ বছর১০ মাসের মূল বেতন১১ বছর বা তদূর্ধ্ব ১২ বছর১৩ মাসের মূল বেতন১২ বছর বা তদূর্ধ্ব ১৩ বছর১৬ মাসের মূল বেতন১৩ বছর বা তদূর্ধ্ব ১৪ বছর১৯ মাসের মূল বেতন১৪ বছর বা তদূর্ধ্ব ১৫ বছর২২ মাসের মূল বেতন১৫ বছর বা তদূর্ধ্ব ১৬ বছর২৫ মাসের মূল বেতন১৬ বছর বা তদূর্ধ্ব ১৭ বছর২৯ মাসের মূল বেতন১৭ বছর বা তদূর্ধ্ব ১৮ বছর৩৩ মাসের মূল বেতন১৮ বছর বা তদূর্ধ্ব ১৯ বছর৩৭ মাসের মূল বেতন১৯ বছর বা তদূর্ধ্ব ২০ বছর৪২ মাসের মূল বেতন২০ বছর বা তদূর্ধ্ব ২১ বছর৪৭ মাসের মূল বেতন২১ বছর বা তদূর্ধ্ব ২২ বছর৫২ মাসের মূল বেতন২২ বছর বা তদূর্ধ্ব ২৩ বছর৫৭ মাসের মূল বেতন২৩ বছর বা তদূর্ধ্ব ২৪ বছর৬৩ মাসের মূল বেতন২৪ বছর বা তদূর্ধ্ব ২৫ বছর৬৯ মাসের মূল বেতন২৫ বছর বা তদূর্ধ্ব৭৫ মাসের মূল বেতন

উদাহরণে বিষয়টি আরও সহজ

ধরা যাক, একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষক অবসরের সময় ২৬ হাজার ৬৮০ টাকা মূল বেতন পান।

তিনি যদি ২০ বছর চাকরি করেন, তাহলে প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী অবসর সুবিধা হবে—

২৬,৬৮০ × ৪৭ = ১২,৫৩,৯৬০ টাকা।

অন্যদিকে ২৯ বছর চাকরি করলে সর্বোচ্চ ৭৫ মাসের সুবিধা প্রযোজ্য হওয়ার ক্ষেত্রে হিসাব দাঁড়াবে—

২৬,৬৮০ × ৭৫ = ২০,০১,০০০ টাকা।

অর্থাৎ একই শেষ মূল বেতন হলেও চাকরির মেয়াদ অনুযায়ী অবসর সুবিধার পরিমাণে বড় পার্থক্য তৈরি হতে পারে।

কেন এই হিসাব এখন গুরুত্বপূর্ণ

এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর ও কল্যাণ সুবিধা দীর্ঘদিন ধরে একটি বড় সমস্যা হয়ে ছিল। তহবিলের ঘাটতি ও বিপুলসংখ্যক আবেদন জমে থাকায় অবসরে যাওয়ার পর অনেক শিক্ষক বছরের পর বছর তাঁদের প্রাপ্য অর্থের জন্য অপেক্ষা করেছেন।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের পর থেকে অবসর সুবিধা বোর্ডে প্রায় ৬৭ হাজার আবেদন অনিষ্পন্ন ছিল এবং সেগুলো নিষ্পত্তিতে প্রায় ৮ হাজার ৭১০ কোটি টাকা প্রয়োজন ছিল। একই সময়ে অবসর তহবিলে অর্থের পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম ছিল। কল্যাণ ট্রাস্টেও হাজার হাজার আবেদন জমে থাকার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে সরকার বিশেষ অর্থায়নের মাধ্যমে পুরোনো পাওনা পরিশোধের উদ্যোগ নিয়েছে। আগস্ট ২০২৬-এ প্রায় ৭৫ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীর কাছে আটকে থাকা অবসর ও কল্যাণ সুবিধার অর্থ পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তুতির খবর প্রকাশিত হয়েছে। অর্থ সরাসরি ব্যাংক হিসাবে পাঠানোর জন্য ইএফটি ও আইবাস++ ব্যবহারের কথাও জানানো হয়েছে।

তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি

প্রকাশিত ছবির হিসাবটি মূলত শিক্ষক-কর্মচারীদের বোঝানোর জন্য তৈরি একটি হিসাবচিত্র। ব্যক্তিগতভাবে একজন শিক্ষক ঠিক কত টাকা পাবেন, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাঁর চাকরির স্বীকৃত মেয়াদ, অবসরের তারিখ, সর্বশেষ প্রযোজ্য মূল বেতন, কর্তন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত হিসাব বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এ কারণে শুধু সর্বশেষ মূল বেতনকে বছর বা মাস দিয়ে গুণ করলেই চূড়ান্ত পাওনা নিশ্চিত ধরে নেওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে নিয়ম বা প্রাপ্যতার ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক আইন, অধ্যাদেশ ও সংশ্লিষ্ট বোর্ড/ট্রাস্টের সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে পারে। ২০২৬ সালে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর সুবিধা আইনেও সংশোধনী আনা হয়েছে বলে বাসস জানিয়েছে।

১০ এক্স বিশ্লেষণ

এই হিসাব থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো—অবসরের সময় শেষ মূল বেতন যত বেশি হবে এবং স্বীকৃত চাকরির মেয়াদ যত দীর্ঘ হবে, এককালীন সুবিধার অঙ্কও তত বড় হবে। তবে দীর্ঘদিন ধরে টাকা আটকে থাকার কারণে শুধু হিসাবের পরিমাণ জানা যথেষ্ট নয়; প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে সেই প্রাপ্য অর্থ শিক্ষক-কর্মচারীর ব্যাংক হিসাবে পৌঁছে দেওয়া।

সরকার বর্তমানে পুরোনো আবেদনজট কমাতে যে বিশেষ অর্থপ্রদানের উদ্যোগ নিয়েছে, সেটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে বহু অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীর দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটতে পারে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে নতুন করে যাতে বছরের পর বছর আবেদন জমে না থাকে, সে জন্য নিয়মিত অর্থপ্রবাহ, ডিজিটাল আবেদন নিষ্পত্তি এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পাওনা পরিশোধের ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা জরুরি।

সুতরাং, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে কল্যাণ ভাতা ও অবসর সুবিধাকে একই ধরনের হিসাব হিসেবে দেখলে ভুল হবে। দুটির হিসাবের ভিত্তি আলাদা—আর অবসরের সময় প্রকৃত পাওনা জানতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ অনুমোদিত হিসাবই চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচ্য।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *