পেনশন ও অবসর সুবিধায় বড় পরিবর্তন: ৫ বছর চাকরিতেই পেনশন সুবিধা, বৃদ্ধি পেল ছুটি নগদায়ন
সরকারি চাকরিজীবীদের অবসরকালীন সুবিধা ও পেনশন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনে ২০১৫ সালে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে পেনশনযোগ্য চাকরিকাল, পেনশনের হার, আনুতোষিক (গ্র্যাচুইটি), পারিবারিক পেনশন এবং ছুটি নগদায়নের ক্ষেত্রে একাধিক সুবিধা বাড়ানো হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের জারি করা এ প্রজ্ঞাপনের ফলে সরকারি কর্মচারীদের অবসর-পরবর্তী আর্থিক নিরাপত্তা আরও জোরদার হয়েছে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, পেনশনযোগ্য চাকরিকালের সর্বনিম্ন সীমা পূর্বের ১০ বছর থেকে কমিয়ে ৫ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ পেনশনের হার শেষ অর্জিত মূল বেতনের ৮০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৯০ শতাংশ করা হয়েছে। ফলে দীর্ঘ সময় চাকরি করা সরকারি কর্মচারীরা আগের তুলনায় বেশি পেনশন পাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।
পেনশনের হার পুনর্নির্ধারণ
প্রজ্ঞাপনে ৫ বছর থেকে ২৫ বছর ও তদূর্ধ্ব চাকরিকালের জন্য নতুন পেনশন হার নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে ৫ বছর চাকরির ক্ষেত্রে ২১ শতাংশ পেনশন থেকে শুরু করে ২৫ বছর বা তার বেশি চাকরির ক্ষেত্রে ৯০ শতাংশ পেনশন পাওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। ১০ বছর চাকরির ক্ষেত্রে পেনশন হার ৩২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৬ শতাংশ, ১৫ বছরে ৪৮ শতাংশ থেকে ৫৪ শতাংশ এবং ২০ বছরে ৬৪ শতাংশ থেকে ৭২ শতাংশ করা হয়েছে।
তবে ৫ থেকে ২৪ বছর চাকরিকালের পেনশন কেবল নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। এর মধ্যে রয়েছে চাকরিরত অবস্থায় মৃত্যু, সরকারি মেডিকেল বোর্ড কর্তৃক স্থায়ীভাবে অক্ষম (Invalid) ঘোষিত হওয়া এবং স্থায়ী পদ বিলুপ্তির কারণে চাকরি হারানো।
অবসরভোগীদের পেনশন বৃদ্ধি
২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে অবসরভোগীদের পেনশন বৃদ্ধিরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ৬৫ বছরের কম বয়সী পেনশনভোগীরা ৪০ শতাংশ এবং ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সীরা ৫০ শতাংশ পেনশন বৃদ্ধি পান। পাশাপাশি মাসিক ন্যূনতম পেনশন ৩ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়।
আনুতোষিকের হারেও পরিবর্তন
পেনশনযোগ্য চাকরিকালের সর্বনিম্ন সীমা ১০ বছর থেকে ৫ বছরে নামিয়ে আনার ফলে আনুতোষিকের ক্ষেত্রেও নতুন হার নির্ধারণ করা হয়েছে। ৫ থেকে ৯ বছর চাকরিকালের জন্য প্রতি ১ টাকা পেনশনের বিপরীতে ২৬৫ টাকা আনুতোষিক নির্ধারণ করা হয়। অন্যদিকে ১০ থেকে ১৫ বছর, ১৫ থেকে ২০ বছর এবং ২০ বছর বা তদূর্ধ্ব চাকরিকালের ক্ষেত্রে বিদ্যমান হার বহাল রাখা হয়েছে।
মৃত্যু বা অক্ষমতার ক্ষেত্রে বিশেষ আর্থিক সহায়তা
চাকরির মেয়াদ ৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই কোনো সরকারি কর্মচারী স্বাস্থ্যগত কারণে অক্ষম হয়ে পড়লে বা মৃত্যুবরণ করলে তার পরিবার এককালীন বিশেষ আর্থিক সহায়তা পাবে। এ ক্ষেত্রে চাকরির প্রতিটি পূর্ণ বছরের জন্য শেষ অর্জিত তিনটি মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ বিশেষ সহায়তা হিসেবে প্রদানের বিধান রাখা হয়েছে।
বিধবা স্ত্রী ও পরিবারের জন্য সুবিধা
প্রজ্ঞাপনে বিধবা স্ত্রীর আজীবন পারিবারিক পেনশন প্রাপ্তির শর্ত শিথিল করা হয়েছে। ৫০ বছর বয়সোর্ধ্ব বিধবা স্ত্রীর ক্ষেত্রে পুনর্বিবাহ না করার অঙ্গীকারনামা বা প্রত্যয়নপত্র দাখিলের শর্ত তুলে দেওয়া হয়।
এ ছাড়া মৃত মহিলা সরকারি কর্মচারীর স্বামীও নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে পারিবারিক পেনশন পাওয়ার অধিকারী হবেন বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ছুটি নগদায়নে বড় সুবিধা
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি ছিল ছুটি নগদায়ন সুবিধা বৃদ্ধি। পূর্বে সর্বোচ্চ ১২ মাসের ছুটি নগদায়নের সুযোগ থাকলেও তা বাড়িয়ে ১৮ মাস করা হয়। অর্থাৎ অবসরের সময় একজন কর্মচারী সর্বোচ্চ ১৮ মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ ছুটি নগদায়ন হিসেবে পেতে পারবেন।
একই সঙ্গে পিআরএল (PRL) এবং ছুটি নগদায়নের ক্ষেত্রে দুই দিনের অর্ধগড় বেতনের ছুটিকে এক দিনের গড় বেতনের ছুটিতে রূপান্তরের সুবিধাও বহাল রাখা হয়েছে।
কার্যকারিতা
প্রজ্ঞাপনটি জনস্বার্থে ১ জুলাই ২০১৫ থেকে কার্যকর বলে গণ্য হবে এবং ওই তারিখে পিআরএলে থাকা কর্মচারীরাও সংশোধিত সুবিধাগুলো পাওয়ার অধিকারী হবেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি কর্মচারীদের অবসর-পরবর্তী আর্থিক সুরক্ষা জোরদার, নিম্ন চাকরিকাল সম্পন্ন কর্মচারীদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং পরিবারভিত্তিক পেনশন ব্যবস্থাকে আরও মানবিক করতে এ পরিবর্তনগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।


