টিআইএন থাকলেই কি আয়কর রিটার্ন দিতে হবে? জরিমানা এড়াতে করদাতাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা
বাংলাদেশে কর শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন (TIN) নেওয়ার পর আয়কর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা রয়েছে কি না, তা নিয়ে অনেক করদাতার মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে যাঁরা কয়েক বছর আগে টিআইএন নিয়েছেন, কিন্তু বর্তমানে আয় নেই কিংবা আয় করমুক্ত সীমার নিচে, তাঁদের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো রিটার্ন দাখিল না করলে প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী জরিমানা ও অন্যান্য জটিলতার মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা থাকতে পারে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নামে প্রচারিত একটি সচেতনতামূলক পোস্টারে টিআইএনধারীদের রিটার্ন দাখিলের বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। পোস্টারটিতে নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন জমা দেওয়ার পাশাপাশি সম্ভাব্য জরিমানা এবং শূন্য রিটার্নের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। তবে পোস্টারে উল্লেখ করা জরিমানার অঙ্ক ও কার্যকরের তারিখ সংশ্লিষ্ট আইন ও সরকারি প্রজ্ঞাপনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি।
করদাতাদের জন্য মূল বিষয় হলো, টিআইএন থাকা, করযোগ্য আয় থাকা এবং আয়কর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা—এই তিনটি বিষয় এক নয়। কারও আয় না থাকলেও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তাঁর রিটার্ন দাখিলের আইনি বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে। আবার শুধু টিআইএন থাকার কারণে প্রত্যেক ব্যক্তিকে একই নিয়মে কর দিতে হবে, এমনটিও নয়।
কেন টিআইএনধারীদের রিটার্ন দাখিলে গুরুত্ব দিতে হবে?
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৬৬ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শ্রেণির ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে হয়। করযোগ্য আয় করমুক্ত সীমা অতিক্রম করলে যেমন রিটার্ন দিতে হয়, তেমনি কিছু ক্ষেত্রে আয় করমুক্ত সীমার নিচে থাকলেও রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক হতে পারে।
সরকারি চাকরিজীবী: আইন অনুযায়ী গণকর্মচারীদের রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
ব্যবসায়ী ও পেশাজীবী: আয়, করদাতার নিবন্ধন এবং প্রযোজ্য আইনি শর্ত অনুযায়ী রিটার্ন দিতে হতে পারে।
কোম্পানির পরিচালক ও ফার্মের অংশীদার: নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক।
টিআইএনধারী ব্যক্তি: তাঁর নিবন্ধনের ধরন ও আইনগত অবস্থার ওপর নির্ভর করে রিটার্ন দিতে হতে পারে।
করযোগ্য আয় নেই এমন ব্যক্তি: আয় না থাকলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে রিটার্নের বাধ্যবাধকতা শেষ হয়ে যায় না।
তাই নিজের ক্ষেত্রে রিটার্ন বাধ্যতামূলক কি না, তা নির্ধারণের জন্য এনবিআরের নির্দেশনা ও প্রযোজ্য আইনের বিধান যাচাই করা প্রয়োজন।
রিটার্ন না দিলে কী ধরনের জরিমানা হতে পারে?
রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও কেউ যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া তা জমা না দিলে আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ২৬৬ অনুযায়ী জরিমানা আরোপ করা যেতে পারে।
এনবিআরের প্রকাশিত ব্যাখ্যা অনুযায়ী, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে জরিমানার পরিমাণ হতে পারে সর্বশেষ নিরূপিত আয়ের ওপর ধার্য করের ১০ শতাংশ, তবে ন্যূনতম এক হাজার টাকা। ব্যর্থতা অব্যাহত থাকলে প্রতিদিন ৫০ টাকা হারে অতিরিক্ত জরিমানার বিধানও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিস্থিতি, প্রযোজ্য বিধান ও আইনি ব্যতিক্রমের ভিত্তিতে বিষয়টি নির্ধারিত হবে।
তবে প্রচারিত পোস্টারে উল্লেখ করা প্রতি বছরের জন্য ৫,০০০ টাকা জরিমানা অথবা ২০২২ সালে টিআইএন নিয়ে তিন বছরে ১৫,০০০ টাকা জরিমানার তথ্যকে সবার জন্য প্রযোজ্য নির্দিষ্ট জরিমানা হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। এ ধরনের অঙ্ক প্রযোজ্য আইন বা নির্দিষ্ট সরকারি নির্দেশনা দিয়ে যাচাই করা জরুরি।
আয় না থাকলেও কি শূন্য রিটার্ন জমা দিতে হবে?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। ‘শূন্য রিটার্ন’ বলতে সাধারণভাবে এমন রিটার্নকে বোঝানো হয়, যেখানে করদাতার করযোগ্য আয় বা প্রদেয় কর নেই। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে আয়, সম্পদ, ব্যয় ও অন্যান্য তথ্য না দেখিয়ে সব ঘরে শূন্য বসিয়ে রিটার্ন জমা দিতে হবে।
রিটার্নে প্রকৃত আয়, সম্পদ, দায় এবং প্রযোজ্য অন্যান্য তথ্য সঠিকভাবে উল্লেখ করতে হয়। আয় না থাকলে বা করযোগ্য আয় না থাকলে সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী রিটার্ন প্রস্তুত করতে হবে। কর প্রদেয় না হলেও রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে।
কীভাবে অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেবেন?
ধাপ ১: ই-রিটার্ন ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন
এনবিআরের ই-রিটার্ন পোর্টাল ব্যবহার করে অনলাইন রিটার্ন দাখিলের প্রক্রিয়া শুরু করুন।
ধাপ ২: নিবন্ধন ও পরিচয় যাচাই করুন
প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করুন। টিআইএন, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং পোর্টালে চাওয়া তথ্য প্রস্তুত রাখুন।
ধাপ ৩: আয় ও সম্পদের তথ্য পূরণ করুন
বেতন, ব্যবসা, বাড়িভাড়া, বিনিয়োগ, সম্পদ, দায় এবং অন্যান্য প্রযোজ্য তথ্য সঠিকভাবে উল্লেখ করুন।
ধাপ ৪: রিটার্ন জমা দিয়ে প্রমাণ সংরক্ষণ করুন
তথ্য যাচাই করে রিটার্ন জমা দিন। জমা দেওয়ার পর প্রাপ্তি স্বীকারপত্র বা সংশ্লিষ্ট প্রমাণপত্র ডাউনলোড করে সংরক্ষণ করুন।
এনবিআরের নির্দেশনা অনুযায়ী, ২০২৬–২০২৭ করবর্ষে সাধারণ ব্যক্তি করদাতাদের জন্য অনলাইনে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে প্রবীণ, শারীরিকভাবে অসমর্থ বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তি, বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি করদাতা এবং মৃত করদাতার আইনগত প্রতিনিধিসহ নির্দিষ্ট শ্রেণির জন্য ব্যতিক্রম রয়েছে। ই-রিটার্নে নিবন্ধনসংক্রান্ত সমস্যার ক্ষেত্রেও নির্ধারিত পদ্ধতিতে অনুমোদন নিয়ে কাগজে রিটার্ন জমার সুযোগ থাকতে পারে।
যাঁরা আগে টিআইএন নিয়েছেন, তাঁদের করণীয় কী?
যাঁরা কয়েক বছর আগে টিআইএন নিয়েছেন কিন্তু নিয়মিত রিটার্ন দেননি, তাঁদের প্রথমে নিজের কর-সংক্রান্ত অবস্থা যাচাই করা উচিত। বিশেষ করে—
1. কোন কারণে টিআইএন নেওয়া হয়েছিল, তা পর্যালোচনা করুন।
2. আগের বছরগুলোতে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক ছিল কি না, যাচাই করুন।
3. কোনো করবর্ষের রিটার্ন বকেয়া থাকলে সংশ্লিষ্ট কর সার্কেল বা কর পরামর্শকের সহায়তায় করণীয় নির্ধারণ করুন।
4. কোনো আয় না থাকলে প্রকৃত তথ্যের ভিত্তিতে রিটার্ন প্রস্তুত করুন।
5. দীর্ঘদিন টিআইএন ব্যবহার না করলে এবং ভবিষ্যতেও রিটার্ন দেওয়ার বাধ্যবাধকতা না থাকলে নিবন্ধন বাতিলের যোগ্যতা আছে কি না যাচাই করুন। আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ২৬২-এ নির্দিষ্ট শর্তে নিবন্ধন বাতিলের বিধান রয়েছে।
এনবিআরের চিঠির অপেক্ষা করা কি ঠিক হবে?
রিটার্ন দাখিল আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক হলে এনবিআরের চিঠি পাওয়ার অপেক্ষা না করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা দেওয়াই যুক্তিযুক্ত। কারণ, চিঠি না পেলেও আইনের অধীনে রিটার্ন দাখিলের দায়িত্ব থাকতে পারে।
তবে পোস্টারে বলা হয়েছে, ‘আগস্ট ২০২৬ থেকে নতুন নিয়ম কার্যকর’। এই নির্দিষ্ট তারিখ এবং পোস্টারের জরিমানার অঙ্কের পক্ষে এখানে স্বতন্ত্র সরকারি প্রজ্ঞাপন যাচাই করা যায়নি। তাই এগুলোকে নিশ্চিত সরকারি ঘোষণা হিসেবে প্রচার না করে এনবিআরের মূল নির্দেশনা থেকে যাচাই করা উচিত।
সারকথা: টিআইএন নেওয়ার পর রিটার্ন দিতে হবে কি না, তা ব্যক্তির আয়, পেশা, করদাতা হিসেবে নিবন্ধন এবং আইনগত অবস্থার ওপর নির্ভর করে। জরিমানা এড়াতে নিজের রিটার্নের বাধ্যবাধকতা যাচাই করুন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা দিন এবং জমার প্রমাণ সংরক্ষণ করুন।



