শিশুর টিকাদান কার্ডে কোন টিকা কখন দিতে হবে? জন্ম থেকে ১৫ মাস পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা
শিশুর সুস্বাস্থ্য ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তুলতে জন্মের পর থেকেই নিয়ম অনুযায়ী টিকা দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই)-এর আওতায় শিশুদের বিভিন্ন সংক্রামক ও মারাত্মক রোগ থেকে সুরক্ষার জন্য নির্দিষ্ট বয়সে একাধিক টিকা দেওয়া হয়। এসব টিকার নাম, ডোজ, দেওয়ার তারিখ এবং পরবর্তী টিকার সময় সংরক্ষণ করার জন্য ব্যবহার করা হয় শিশুর টিকাদান কার্ড।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের টিকাদান কার্ডে শিশুর পরিচয়, জন্মতারিখ, নিবন্ধন নম্বর, টিকাদান কেন্দ্রের তথ্য এবং বিভিন্ন টিকা দেওয়ার তারিখ লিপিবদ্ধ করার ব্যবস্থা রয়েছে। তাই শিশুর টিকাদান কার্ডটি শুধু একটি কাগজ নয়; বরং শিশুর টিকাদানের ইতিহাস সংরক্ষণ এবং পরবর্তী ডোজের সময় নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি।
শিশুর টিকাদান কার্ড কেন গুরুত্বপূর্ণ?
শিশুকে নির্ধারিত সময়ে সব প্রয়োজনীয় টিকা দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে টিকাদান কার্ডের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কার্ডে প্রতিটি টিকার নাম ও ডোজের তারিখ লেখা থাকলে অভিভাবক সহজেই পরবর্তী টিকা দেওয়ার সময় জানতে পারেন।
টিকাদান কার্ডের প্রধান উপকারিতা হলো—
- শিশুকে কোন টিকা দেওয়া হয়েছে, তা যাচাই করা যায়।
- পরবর্তী ডোজের নির্ধারিত সময় মনে রাখা সহজ হয়।
- টিকার কোনো ডোজ বাদ পড়েছে কি না, তা শনাক্ত করা যায়।
- স্কুলে ভর্তি, স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ বা প্রয়োজনীয় নথি যাচাইয়ের সময় টিকাদানের তথ্য কাজে আসতে পারে।
- এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গেলেও শিশুর টিকাদানের ইতিহাস সঙ্গে রাখা যায়।
জন্ম থেকে ১৫ মাস পর্যন্ত কোন টিকা কখন দেওয়া হয়?
ছবিতে থাকা টিকাদান কার্ডে জন্মের পর থেকে শিশুর বিভিন্ন বয়সে টিকা দেওয়ার সূচি তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বিসিজি, পেন্টাভ্যালেন্ট, ওপিভি, পিসিভি, আইপিভি এবং এমআর টিকার নাম রয়েছে। তবে টিকার সঠিক বয়স, ডোজের সংখ্যা ও সময়সূচি বর্তমান জাতীয় ইপিআই নির্দেশিকা এবং টিকাদান কেন্দ্রের পরামর্শ অনুযায়ী নিশ্চিত করতে হবে।
১. জন্মের পর বিসিজি টিকা
বিসিজি (BCG) টিকা যক্ষ্মা রোগের বিশেষ করে শিশুদের গুরুতর ধরনের যক্ষ্মা থেকে সুরক্ষা দিতে ব্যবহৃত হয়। সাধারণত জন্মের পর যত দ্রুত সম্ভব এই টিকা দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
জন্মের পরপর টিকা দেওয়া সম্ভব না হলে অভিভাবকদের উচিত শিশুকে নিকটস্থ টিকাদান কেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ নেওয়া।
২. পেন্টাভ্যালেন্ট টিকা
পেন্টাভ্যালেন্ট টিকা একাধিক সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে ব্যবহৃত হয়। এতে ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, ধনুষ্টংকার, হেপাটাইটিস-বি এবং হিমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ-বি সংক্রমণের বিরুদ্ধে সুরক্ষার উপাদান থাকে।
এই টিকার একাধিক ডোজ নির্ধারিত সময় অনুযায়ী দেওয়া হয়। কোনো একটি ডোজ বাদ পড়লে নিজের সিদ্ধান্তে নতুন করে পুরো টিকাদান শুরু না করে টিকাদান কেন্দ্রের স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ নিতে হবে।
৩. ওপিভি টিকা
ওপিভি (OPV) হলো মুখে খাওয়ানোর পোলিও টিকা। পোলিও একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা শিশুর স্থায়ী পক্ষাঘাতের কারণ হতে পারে। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী এই টিকার প্রয়োজনীয় ডোজ দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
৪. পিসিভি টিকা
পিসিভি (PCV) নিউমোকক্কাল ব্যাকটেরিয়ার কারণে হওয়া গুরুতর সংক্রমণ প্রতিরোধে সাহায্য করে। এসব সংক্রমণের মধ্যে নিউমোনিয়া, মেনিনজাইটিস এবং রক্তের সংক্রমণ উল্লেখযোগ্য।
শিশুর বয়স অনুযায়ী নির্ধারিত ডোজগুলো সম্পন্ন করা প্রয়োজন।
৫. আইপিভি টিকা
আইপিভি (IPV) হলো ইনজেকশনের মাধ্যমে দেওয়া পোলিও টিকা। এটি পোলিওর বিরুদ্ধে শিশুর সুরক্ষা গড়ে তুলতে ব্যবহৃত হয়। ওপিভি ও আইপিভির প্রয়োগপদ্ধতি আলাদা হলেও উভয়ই পোলিও প্রতিরোধ কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
৬. এমআর টিকা
এমআর (MR) টিকা হাম ও রুবেলা প্রতিরোধে ব্যবহৃত হয়। হাম শিশুদের মধ্যে গুরুতর জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। অন্যদিকে, রুবেলা বিশেষ করে গর্ভাবস্থায় সংক্রমিত হলে অনাগত শিশুর জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
কার্ডে উল্লিখিত বয়স অনুযায়ী এমআর টিকার নির্ধারিত ডোজগুলো সম্পন্ন করতে হবে। টিকার সময়সূচি পরিবর্তিত হলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি।
টিকাদান কার্ডে কোন তথ্যগুলো পূরণ করতে হবে?
ছবিতে থাকা কার্ডের তথ্য অনুযায়ী, শিশুর পরিচয় এবং টিকাদানের বিবরণ সঠিকভাবে পূরণ করা প্রয়োজন। সাধারণত এতে থাকে—
১. শিশুর নাম ও ছেলে/মেয়ে পরিচিতি।
২. জন্মতারিখ ও জন্মনিবন্ধন নম্বর।
৩. নিবন্ধন নম্বর এবং নিবন্ধনের তারিখ।
৪. মায়ের নাম ও বাবার নাম।
৫. বাড়ি, গ্রাম বা মহল্লা এবং ইউনিয়ন বা ওয়ার্ডের তথ্য।
৬. উপজেলা, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশন এবং জেলা।
৭. টিকাদান কেন্দ্রের নাম ও সংশ্লিষ্ট এলাকার তথ্য।
৮. টিকা প্রদানকারী স্বাস্থ্যকর্মীর নাম ও যোগাযোগের তথ্য।
৯. প্রতিটি টিকার ডোজ দেওয়ার তারিখ এবং প্রয়োজনীয় স্বাক্ষর।
কার্ডে ভুল তথ্য থাকলে বা কোনো ঘর ফাঁকা থাকলে সংশ্লিষ্ট টিকাদান কেন্দ্রের স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় সংশোধন করানো উচিত।
টিকা দেওয়ার পর কী করবেন?
শিশুকে টিকা দেওয়ার পর কিছু বিষয়ে অভিভাবকদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
- টিকা দেওয়ার তারিখ কার্ডে সঠিকভাবে লেখা হয়েছে কি না, যাচাই করুন।
- পরবর্তী ডোজের তারিখ জেনে নিন।
- টিকার স্থানে সামান্য ব্যথা, ফোলা বা অল্প জ্বর হতে পারে; তবে শিশুর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করুন।
- শিশুর শ্বাসকষ্ট, মুখ বা গলা ফুলে যাওয়া, অস্বাভাবিক নিস্তেজতা কিংবা অন্য কোনো গুরুতর লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিন।
- টিকা দেওয়ার পর শিশুর জ্বর হলে বয়স ও শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ দেবেন না।
নির্ধারিত সময়ে টিকা দিতে না পারলে করণীয়
কোনো কারণে শিশুর নির্ধারিত দিনে টিকা দেওয়া না হলে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। যত দ্রুত সম্ভব নিকটস্থ সরকারি টিকাদান কেন্দ্র বা ইপিআই কেন্দ্রে যোগাযোগ করুন। স্বাস্থ্যকর্মী শিশুর বয়স, আগে নেওয়া ডোজ এবং বর্তমান নির্দেশিকা বিবেচনা করে পরবর্তী করণীয় জানাবেন।
টিকার ডোজ বাদ পড়লে নিজে থেকে সূচি পরিবর্তন করা বা একই টিকা আবার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। শিশুর আগের টিকাদানের কার্ড সঙ্গে নিয়ে কেন্দ্রে যাওয়া সবচেয়ে ভালো।
অভিভাবকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
শিশুর টিকাদান কার্ড যত্নসহকারে সংরক্ষণ করুন। প্রতিবার টিকা দেওয়ার সময় কার্ডটি সঙ্গে নিন এবং পরবর্তী টিকার তারিখ লিখে রাখুন। কার্ড হারিয়ে গেলে আগের টিকাদানের তথ্য সংগ্রহের জন্য সংশ্লিষ্ট টিকাদান কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
মনে রাখতে হবে, টিকা শিশুকে বিভিন্ন প্রতিরোধযোগ্য রোগ থেকে সুরক্ষা দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে সব টিকা সব রোগের বিরুদ্ধে শতভাগ সুরক্ষা নিশ্চিত করে না। তাই টিকাদানের পাশাপাশি শিশুর পুষ্টি, পরিচ্ছন্নতা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।



