জ্বালানি সাশ্রয়ে অফিসের নতুন সময়সূচী নির্ধারণ ২০২৬ । ২ ঘন্টা কমবে এবং সন্ধ্যা ৬টায় বন্ধ হবে দোকানপাট?
দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি ব্যয় হ্রাস এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে সরকারি অফিস, ব্যাংক ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সময়সূচীতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আজ শুক্রবার এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই নতুন সময়সূচী চূড়ান্ত করা হয়।
অফিসের নতুন সময়সূচী
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, জ্বালানি সাশ্রয়ের উদ্দেশ্যে এখন থেকে সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত অফিসের কার্যক্রম সকাল ৯টায় শুরু হয়ে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলবে। এর আগে সাধারণ অফিস সময় ৫টা পর্যন্ত থাকলেও এখন তা এক ঘণ্টা কমিয়ে আনা হয়েছে। মূলত দিনের আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
ব্যাংকিং লেনদেনে পরিবর্তন
নতুন এই নির্দেশনার আওতায় ব্যাংকিং সেবার সময়েও সমন্বয় করা হয়েছে। এখন থেকে ব্যাংকগুলো সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত গ্রাহকদের জন্য খোলা থাকবে। বিকেল ৩টার পর আনুষঙ্গিক দাপ্তরিক কাজ শেষ করে ব্যাংকাররা অফিস ত্যাগ করবেন।
দোকান ও শপিং মল বন্ধের নির্দেশ
বিদ্যুৎ সাশ্রয় নিশ্চিত করতে ব্যবসায়িক খাতেও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। সারা দেশের সব ধরনের দোকানপাট এবং শপিং মল সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে জরুরি সেবা যেমন—ওষুধের দোকান ও কাঁচাবাজার এই নির্দেশনার আওতামুক্ত থাকতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত রবিবার
অফিস ও ব্যাংকের সময়সূচী পরিবর্তন করা হলেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে আজ কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। আগামী রবিবার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং অংশীজনদের সাথে বৈঠকের পর স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সময়সূচী বা সাপ্তাহিক ছুটির বিষয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা আসবে।
সরকারের উদ্দেশ্য
বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ চাহিদা সামাল দিতেই এই কৃচ্ছ্রসাধন নীতি গ্রহণ করেছে সরকার। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই নতুন সময়সূচী কার্যকর হলে বিদ্যুতের পিক-আওয়ারে চাপের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে এবং জ্বালানি আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে।
আগামী সপ্তাহের শুরু থেকেই এই নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
০১ ঘন্টা অফিস কমালে কতটা বিদ্যুৎ সাশ্রয় হতে পারে?
ঠিক কতটা বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে, তা সুনির্দিষ্টভাবে নির্ভর করে ওই এক ঘণ্টায় কতগুলো অফিস সচল থাকে এবং সেখানে কী পরিমাণ এসি, লাইট ও ইলেকট্রনিক্স সরঞ্জাম ব্যবহৃত হয় তার ওপর। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞদের বিভিন্ন গবেষণা ও আগের তথ্য বিশ্লেষণ করলে একটি ধারণা পাওয়া যায়:
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের সম্ভাব্য হিসাব
১. পিক-আওয়ারের চাপ নিয়ন্ত্রণ: অফিস সময় ১ ঘণ্টা কমিয়ে ৫টার পরিবর্তে ৪টা করলে বিকালের “পিক-আওয়ার” (যখন বাসাবাড়িতেও বিদ্যুতের চাহিদা বাড়তে শুরু করে) শুরুর আগেই অফিসগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। এতে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ প্রায় ৫০০ থেকে ৮০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত কমতে পারে।
২. শতকরা হিসেবে সাশ্রয়: বিভিন্ন সরকারি প্রতিবেদন অনুযায়ী, অফিস ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে এসি এবং লাইটিংয়ের সময় এক ঘণ্টা কমিয়ে আনলে মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রায় ২% থেকে ৩% সাশ্রয় করা সম্ভব। জাতীয় পর্যায়ে এটি প্রতিদিন কয়েক মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের সমান।
৩. এসি ব্যবহারের প্রভাব: অফিসের বড় অংশ বিদ্যুৎ খরচ হয় সেন্ট্রাল এসি বা স্প্লিট এসিতে। ১ ঘণ্টা আগে অফিস বন্ধ হলে সেই সময়ের কুলিং লোড পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। যেহেতু বিকাল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত তাপমাত্রা বেশি থাকে, তাই এই সময়ে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের হার সবচেয়ে বেশি হয়।
অন্যান্য প্রভাব
জ্বালানি সাশ্রয়: বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে পরিমাণ গ্যাস বা ফার্নেস অয়েল লাগে, তা ১ ঘণ্টা কম ব্যবহার হলে সরকারের বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।
যানজট নিরসন: অফিস ১ ঘণ্টা আগে ছুটি হলে মানুষ সন্ধ্যার আগেই বাসায় ফিরতে পারে। এতে রাস্তায় যানজট কম থাকে, ফলে যানবাহনের জ্বালানিও সাশ্রয় হয়।
সারসংক্ষেপ: যদিও ১ ঘণ্টা সময় খুব কম মনে হতে পারে, কিন্তু দেশজুড়ে হাজার হাজার সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত অফিসে একযোগে এসি এবং বাতি বন্ধ হলে তা বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবিলায় বিশাল ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে গরমের মৌসুমে এই ১ ঘণ্টার সাশ্রয় কয়েকশ কোটি টাকার জ্বালানি খরচ বাঁচাতে পারে।



