প্রশাসন I একাউন্টস I অডিট আপত্তি

পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন (সংশোধন) ২০২৬-এর গেজেট প্রকাশ: সরকারি ক্রয়ে যুক্ত হলো ‘টেকসই ক্রয়’ ও ‘বিপিপিএ’

বাংলাদেশে সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং আধুনিকায়ন নিশ্চিত করতে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬-এর ব্যাপক সংশোধন করে নতুন গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে ২০২৬ সনের ৪১ নং এই আইনটি গত ১০ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভ করে এবং এটি ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ থেকে কার্যকর হয়েছে বলে গণ্য করা হয়েছে

সংশোধিত আইনের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

১. আইনের পরিধি ও লক্ষ্য সম্প্রসারণ

আইনের মূল শিরোনাম ও প্রস্তাবনায় এখন থেকে কেবল ‘স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা’ নয়, বরং “অর্থের সর্বোত্তম মূল্য, দক্ষতা, নৈতিকতা, গুণগতমান ও টেকসই ক্রয়” শব্দগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এটি নিশ্চিত করবে যে সরকারি অর্থে কেবল কম দামে নয়, বরং মানসম্মত এবং পরিবেশবান্ধব পণ্য ও সেবা কেনা হচ্ছে

২. টেকসই সরকারি ক্রয় (Sustainable Public Procurement)

নতুন সংশোধনীতে ‘টেকসই সরকারি ক্রয়’-এর সংজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এর মাধ্যমে ক্রয় প্রক্রিয়ায় পরিবেশ রক্ষা, সামাজিক অগ্রগতি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নকে প্রাধান্য দেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করা হয়েছে ধারা ১৬ অনুযায়ী, ক্রয়কারী এমন কোনো শর্ত আরোপ করতে পারবে না যা শ্রমিকদের মজুরি, স্বাস্থ্য নিরাপত্তা বা শিশু শ্রম নিষিদ্ধকরণ আইনের পরিপন্থী

৩. বিপিপিএ (BPPA) এবং ক্রয় কৌশল

সংশোধিত আইনে বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ)-কে কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এখন থেকে ক্রয়কারীকে কেবল ‘ক্রয় পরিকল্পনা’ নয়, বরং বিপিপিএ নির্ধারিত আদর্শ দলিল ব্যবহার করে ‘ক্রয় কৌশল’ প্রণয়ন করতে হবে

৪. নতুন ক্রয় পদ্ধতি: বিপরীত নিলাম (Reverse Auction)

আধুনিক প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে ‘বিপরীত নিলাম’ পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয়েছে এই পদ্ধতিতে সরবরাহকারীরা রিয়েল টাইমে ক্রমান্বয়ে কম দামের দরপত্র জমা দিয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারবেন এছাড়া ‘ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট’-এর পরিধি বাড়িয়ে এতে ভৌত সেবা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সেবা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে

৫. ই-জিপি (e-GP) বাধ্যতামূলক

ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট বা ই-জিপি পোর্টালে সকল সরকারি ক্রয় সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে বিশেষ কারণে ই-জিপিতে কোনো ক্রয় করা সম্ভব না হলে বিপিপিএ-এর পূর্বানুমোদন নিতে হবে, তবে সকল ক্রয় পরিকল্পনা অবশ্যই পোর্টালে প্রকাশ করতে হবে

৬. অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন

  • বিদেশি দূতাবাস: বিশেষ ক্ষেত্রে বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশি মিশনগুলো সংশ্লিষ্ট দেশের ক্রয় বিধি অনুসরণ করতে পারবে, তবে এর জন্য ‘অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি’র অনুমোদন লাগবে

  • তথ্যপ্রযুক্তি সেবা: সরকারি অর্থে আইটি সেবা ক্রয়ে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হলে দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে যৌথ উদ্যোগ (Joint Venture) অংশীদার হিসেবে রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে

  • অস্বাভাবিক কম দর: যদি কোনো দরদাতা প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কম দর (Significantly low price) প্রদান করে, তবে বিধি অনুযায়ী তা কঠোরভাবে মূল্যায়ন করতে হবে

এই সংশোধনী সরকারি ক্রয়ে অপচয় রোধ এবং টেকসই উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে আইনটি এখন থেকে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) আইন, ২০২৬ নামে অভিহিত হবে


সূত্র: বাংলাদেশ গেজেট, অতিরিক্ত সংখ্যা, ১০ এপ্রিল, ২০২৬।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *