প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের গ্রেড নিয়ে বড় পার্থক্য: পদ উন্নীত হওয়া আর উচ্চতর গ্রেড পাওয়া এক বিষয় নয়
সরকারি চাকরিতে একই পদে কর্মরত হলেও চাকরিতে যোগদানের তারিখ, পদটির বেতনগ্রেড পরিবর্তনের সময় এবং উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্যতা—এই তিনটি বিষয় একজন কর্মকর্তার বর্তমান বেতনগ্রেড নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে ‘পদ উন্নীতকরণ’ এবং ‘উচ্চতর গ্রেড’—দুটিকে একই বিষয় মনে করায় প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।
প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদকে ঘিরে এমন একটি উদাহরণ সামনে এসেছে, যেখানে একই পদের একদল কর্মকর্তা ২০২০ সালে পদটির গ্রেড উন্নীত হওয়ার সুবিধা পেয়েছেন, অন্যদিকে ২০১৭ সালে যোগদানকারী কর্মকর্তাদের একটি অংশ ২০২৫ সালে প্রথম উচ্চতর গ্রেড পেয়ে ৯ম গ্রেডে উন্নীত হয়েছেন। ফলে প্রশ্ন উঠছে—একই পদে কর্মরত হয়েও কেন কারও গ্রেড ১০ম, আবার কারও ৯ম?
জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬-এর আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে এর পেছনে পদ উন্নীতকরণ ও ব্যক্তিগত উচ্চতর গ্রেড—দুটি আলাদা প্রক্রিয়ার পার্থক্য স্পষ্ট হয়। অর্থ বিভাগের ওয়েবসাইটে জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬-এর জন্য পৃথক সরকারি পেজও প্রকাশিত রয়েছে।
২০২০ সালে প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদের গ্রেড উন্নীত
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদটি যে দপ্তর বা সংস্থাতেই থাকুক না কেন, ওই পদের ১১তম গ্রেডের ১২,৫০০–৩০,২৩০ টাকা বেতনক্রম থেকে ১০ম গ্রেডের ১৬,০০০–৩৮,৬৪০ টাকা বেতনক্রমে উন্নীত করা হয় ২২ জানুয়ারি ২০২০ তারিখে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এটি কোনো নির্দিষ্ট কর্মকর্তাকে ব্যক্তিগতভাবে দেওয়া উচ্চতর গ্রেড নয়; বরং পদের গ্রেড উন্নীতকরণ।
অর্থাৎ, একটি পদ ১১তম গ্রেডে থাকাকালে যারা ওই পদে ছিলেন এবং পরবর্তীতে সরকারি সিদ্ধান্তে পদটি ১০ম গ্রেডে উন্নীত হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে পদটির অনুমোদিত গ্রেড পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় আসে।
তবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ওই পদের প্রত্যেক কর্মকর্তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ৯ম গ্রেডের অধিকারী হয়ে যাবেন—এমনটি ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
পদ উন্নীতকরণ ও উচ্চতর গ্রেডের মৌলিক পার্থক্য
পদ উন্নীতকরণ বলতে বোঝায়—সরকার কোনো নির্দিষ্ট পদের অনুমোদিত বেতনগ্রেড পরিবর্তন করেছে।
অন্যদিকে উচ্চতর গ্রেড হলো কোনো কর্মচারীর নির্দিষ্ট চাকরিকাল ও প্রযোজ্য শর্ত পূরণের পর ব্যক্তিগতভাবে পরবর্তী উচ্চতর গ্রেডে যাওয়ার সুবিধা।
সহজভাবে বলা যায়—
পদ উন্নীত হলে পদের গ্রেড বদলায়; উচ্চতর গ্রেড পেলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর বেতনগ্রেড বদলায়।
এই পার্থক্যটি প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বর্তমান গ্রেড বোঝার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১৯ জুলাই ২০১৭ সালে যোগদানকারীদের ক্ষেত্রে কী ঘটেছে?
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো ১৯ জুলাই ২০১৭ তারিখে প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে যোগদানকারী কর্মকর্তাদের।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬-এর বিধান অনুসারে তারা ১৯ জুলাই ২০২৫ তারিখে প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন। ফলে ২০১৭ সালের ১৯ জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ১৯ জুলাই পর্যন্ত নির্ধারিত চাকরিকাল পূর্ণ হওয়ার পর তাদের প্রথম উচ্চতর গ্রেড হিসেবে ৯ম গ্রেড দেওয়া হয়।
অর্থাৎ, তাদের ক্ষেত্রে ৯ম গ্রেড পাওয়া শুধুমাত্র প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদটি ২০২০ সালে ১১তম থেকে ১০ম গ্রেডে উন্নীত হওয়ার কারণে নয়; বরং প্রযোজ্য চাকরিকাল পূরণের মাধ্যমে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার বিষয়টির সঙ্গে সম্পর্কিত।
এ কারণেই একই পদে কর্মরত কর্মকর্তাদের মধ্যেও গ্রেডের পার্থক্য দেখা দিতে পারে।
তাহলে ২০২০ সালে ১০ম গ্রেড পাওয়া কর্মকর্তাদের কী হবে?
এখানেই মূল বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
যারা প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে কর্মরত থাকা অবস্থায় ২২ জানুয়ারি ২০২০ তারিখে ১১তম গ্রেড থেকে ১০ম গ্রেডে উন্নীত পদের সুবিধা পেয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে পরবর্তী উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সময় নির্ধারণ করতে সংশ্লিষ্ট বিধান, পূর্বের চাকরিকাল, পদোন্নতি/উচ্চতর গ্রেডের ইতিহাস এবং প্রযোজ্য সরকারি আদেশ বিবেচনা করতে হবে।
অর্থাৎ, শুধু ২০২০ সালে পদটি ১০ম গ্রেডে উন্নীত হয়েছে বলেই সবাই একই তারিখে ৯ম গ্রেড পাবেন—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক হবে না।
কোন তারিখ থেকে উচ্চতর গ্রেডের চাকরিকাল গণনা হবে—এটাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
কারণ উচ্চতর গ্রেডের ক্ষেত্রে শুধু বর্তমানে কোন গ্রেডে আছেন সেটিই বিবেচ্য নয়; বরং সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর চাকরির ধারাবাহিকতা ও পূর্বে কোনো গ্রেড সুবিধা পেয়েছেন কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
একটি সহজ উদাহরণ
ধরা যাক—
কর্মকর্তা ‘ক’
- প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে কর্মরত
- পদটি আগে ১১তম গ্রেডে ছিল
- ২২ জানুয়ারি ২০২০ সালে পদটি ১০ম গ্রেডে উন্নীত
- বর্তমানে ১০ম গ্রেডে
- এখন পরবর্তী উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার অপেক্ষায়
অন্যদিকে—
কর্মকর্তা ‘খ’
- ১৯ জুলাই ২০১৭ সালে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান
- ১৯ জুলাই ২০২৫ তারিখে প্রথম উচ্চতর গ্রেডের যোগ্যতা অর্জন
- উচ্চতর গ্রেড হিসেবে ৯ম গ্রেড পেয়েছেন
দুই কর্মকর্তার পদ একই হলেও গ্রেড পরিবর্তনের কারণ এক নয়।
‘ক’-এর ক্ষেত্রে ১০ম গ্রেড এসেছে পদ উন্নীতকরণের মাধ্যমে।
‘খ’-এর ক্ষেত্রে ৯ম গ্রেড এসেছে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার মাধ্যমে।
এই পার্থক্যটিই পুরো বিষয়টি বোঝার মূল চাবিকাঠি।
৯ম গ্রেড পাওয়া মানেই পদোন্নতি নয়
আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন। উচ্চতর গ্রেড পাওয়া এবং পদোন্নতি এক বিষয় নয়।
উচ্চতর গ্রেড সাধারণত একই পদে থেকে বেতনগ্রেডের সুবিধা দেয়। কিন্তু পদোন্নতির ক্ষেত্রে পদ, দায়িত্ব, পদমর্যাদা ও নিয়োগবিধির বিষয় জড়িত থাকে।
ফলে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেই কেউ উচ্চতর গ্রেডের মাধ্যমে ৯ম গ্রেডে যেতে পারেন—এতে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন কোনো পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত হয়েছেন, এমনটি বলা যাবে না।
অর্থ বিভাগের সরকারি নথিতেও উচ্চতর গ্রেড, টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেডকে আলাদা সুবিধা হিসেবে বিবেচনার নজির রয়েছে।
২০২৬ সালের বেতন কাঠামোয় বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ কার্যকর হওয়ার পর পুরোনো চাকরিকাল, পূর্বে পাওয়া গ্রেড এবং নতুন গ্রেডে বেতন নির্ধারণ—এসব বিষয় নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। অর্থ বিভাগ জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬-এর সরকারি তথ্য আলাদাভাবে প্রকাশ করেছে এবং অনলাইন বেতন নির্ধারণের ব্যবস্থাও রয়েছে।
ফলে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও শুধু বর্তমান বেতনগ্রেড দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন হবে—
- নিয়োগের তারিখ;
- পদে যোগদানের তারিখ;
- পদটির পূর্ববর্তী গ্রেড;
- পদ উন্নীত হওয়ার তারিখ;
- উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার তারিখ;
- পূর্বে টাইমস্কেল/সিলেকশন গ্রেড বা উচ্চতর গ্রেড পাওয়া হয়েছে কি না;
- সংশ্লিষ্ট সরকারি আদেশ বা পরিপত্র;
- এবং ২০২৬ সালের নতুন বেতন কাঠামোর প্রযোজ্য বিধান
—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করা।
‘উন্নীত গ্রেড’ বনাম ‘উচ্চতর গ্রেড’—এক নজরে
| বিষয় | উন্নীত গ্রেড | উচ্চতর গ্রেড |
|---|---|---|
| মূল ভিত্তি | পদের গ্রেড পরিবর্তন | কর্মচারীর চাকরিকাল ও বিধান |
| কার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য | নির্দিষ্ট পদে | যোগ্য কর্মচারীর ক্ষেত্রে |
| উদাহরণ | ১১তম → ১০ম গ্রেড | ১০ম → ৯ম গ্রেড |
| ২২ জানুয়ারি ২০২০ | প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদের গ্রেড উন্নীত | — |
| ১৯ জুলাই ২০২৫ | — | ২০১৭ সালে যোগদানকারীদের প্রথম উচ্চতর গ্রেডের উদাহরণ |
| ফলাফল | পদটির অনুমোদিত গ্রেড পরিবর্তন | সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর ব্যক্তিগত গ্রেড উন্নীত |
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: একই পদ মানেই একই গ্রেড নয়
প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদ নিয়ে তৈরি বিভ্রান্তির মূল কারণ হলো—অনেকে মনে করছেন, একই পদে কর্মরত হলে সবার গ্রেডও একই হওয়া উচিত।
কিন্তু বাস্তবে একজন কর্মকর্তা পদ উন্নীতকরণের মাধ্যমে ১০ম গ্রেডে থাকতে পারেন, আবার অন্য একজন কর্মকর্তা উচ্চতর গ্রেডের মাধ্যমে ৯ম গ্রেডে থাকতে পারেন।
তাই ২০২০ সালের ২২ জানুয়ারি পদটির ১১তম গ্রেড থেকে ১০ম গ্রেডে উন্নীত হওয়ার ঘটনা এবং ২০১৭ সালে যোগদানকারীদের ২০২৫ সালে ৯ম গ্রেড পাওয়ার ঘটনা—দুটিকে একই প্রক্রিয়া হিসেবে দেখলে ভুল হবে।
সামনে অপেক্ষা যাদের
যেসব প্রশাসনিক কর্মকর্তা ২০২০ সালের পদ উন্নীতকরণের মাধ্যমে ১০ম গ্রেডে এসেছেন কিন্তু এখনো ৯ম গ্রেডের উচ্চতর গ্রেড পাননি, তাদের জন্য মূল বিষয় হলো কবে এবং কোন বিধানের অধীনে তারা পরবর্তী উচ্চতর গ্রেডের যোগ্য হবেন।
অর্থাৎ, তাদের ক্ষেত্রে শুধু ‘পদটি ১০ম গ্রেডে উন্নীত হয়েছে’—এ তথ্য দিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া যাবে না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ব্যক্তিগত চাকরিকাল ও পূর্ববর্তী গ্রেড সুবিধার রেকর্ড যাচাই করেই উচ্চতর গ্রেডের তারিখ নির্ধারণ করতে হবে।
শেষ কথা
প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদকে ঘিরে বর্তমান আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো—‘উন্নীত গ্রেড’ এবং ‘উচ্চতর গ্রেড’ দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
২২ জানুয়ারি ২০২০ তারিখে প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদ ১১তম গ্রেড (১২,৫০০–৩০,২৩০ টাকা) থেকে ১০ম গ্রেড (১৬,০০০–৩৮,৬৪০ টাকা) উন্নীত হওয়ার বিষয়টি ছিল পদের গ্রেড পরিবর্তন। আর ১৯ জুলাই ২০১৭ সালে যোগদানকারী কর্মকর্তাদের ১৯ জুলাই ২০২৫ তারিখে ৯ম গ্রেডে উচ্চতর গ্রেড পাওয়া ছিল চাকরিকালভিত্তিক ব্যক্তিগত সুবিধার উদাহরণ।
তাই একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা বর্তমানে ১০ম গ্রেডে আছেন বলেই তিনি কখন ৯ম গ্রেড পাবেন—এটি নির্ধারণ করতে তার নিয়োগ, যোগদান, পূর্ববর্তী গ্রেড, উচ্চতর গ্রেডের ইতিহাস এবং প্রযোজ্য বিধান একসঙ্গে দেখতে হবে।
জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ সংক্রান্ত সরকারি তথ্য অর্থ বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে; ফলে চূড়ান্ত বেতন নির্ধারণ বা উচ্চতর গ্রেডের দাবি করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি আদেশ ও মূল বিধান অনুসরণ করাই সবচেয়ে নিরাপদ।
সুতরাং, ২০২০ সালে পদ উন্নীত হয়েছে বলে সবাই একই সঙ্গে ৯ম গ্রেড পাবেন—এমনটি নয়; বরং যার যে তারিখে এবং যে বিধানের অধীনে উচ্চতর গ্রেডের যোগ্যতা তৈরি হবে, তার ভিত্তিতেই পরবর্তী গ্রেড নির্ধারণের প্রশ্ন আসবে।



