বাংলাদেশ সরকারের চ্যালেঞ্জ ২০২৬ । বিএনপির ইশতেহারে ফ্যামিলি কার্ড, সবুজ বিপ্লব ও দুর্নীতিমুক্ত শাসনের অঙ্গীকার?
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ও ৩১ দফার মাধ্যমে রাষ্ট্র কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের অঙ্গীকার করেছে। দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষিত এই ইশতেহারে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, পরিবেশ রক্ষা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
১. ফ্যামিলি কার্ড: প্রান্তিক মানুষের অর্থনৈতিক ঢাল
বিএনপির অন্যতম বড় প্রতিশ্রুতি হলো ‘ফ্যামিলি কার্ড’। দলটির মতে, এটি কেবল একটি সহায়তা নয়, বরং প্রান্তিক পরিবারের মর্যাদা ও সামাজিক সুরক্ষার দলিল।
সুবিধা: প্রতিটি নিম্ন-আয় ও দরিদ্র পরিবারকে এই কার্ড দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে প্রতি মাসে ২,৫০০ টাকা সরাসরি অর্থ সাহায্য অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য (চাল, ডাল, তেল ইত্যাদি) সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে।
নারীর ক্ষমতায়ন: এই কার্ডটি মূলত পরিবারের নারী প্রধানের নামে ইস্যু করা হবে, যাতে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ত্বরান্বিত হয়।
ব্যাপ্তি: শুরুতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও পর্যায়ক্রমে দেশের প্রায় ৪ কোটি পরিবারের কাছে এই সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে দলটির।
২. ২৫ কোটি গাছ ও সবুজ অর্থনীতি
পরিবেশ রক্ষায় বিএনপি এক উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় তারা ‘সবুজ বিপ্লব’ বা গ্রিন ইকোনমি চালুর কথা বলেছে।
বৃক্ষরোপণ: আগামী ৫ বছরে সারাদেশে ২৫ কোটি গাছের চারা রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বিএনপি। গ্রামীণ পর্যায়ের জনগণকে সরাসরি এই প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করা হবে।
কর্মসংস্থান: বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ সংরক্ষণ খাতে প্রায় ২ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা দেখছে দলটি।
কার্বন ট্রেডিং: আন্তর্জাতিক কার্বন ট্রেডিং মার্কেট থেকে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার আয়ের সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
৩. দুর্নীতি দমনে ‘জিরো টলারেন্স’ ও পদ্ধতিগত সংস্কার
দুর্নীতিকে ক্যানসারের সঙ্গে তুলনা করে বিএনপি ঘোষণা করেছে যে, তারা ক্ষমতায় গেলে দুর্নীতির সঙ্গে কোনো আপস করবে না।
আইন সংশোধন: দুর্নীতি তদন্তে সরকারি কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে পূর্বানুমতি নেওয়ার বিধান (কালাকানুন) বাতিল করা হবে।
অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সংস্কার: স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ওপেন টেন্ডারিং, রিয়েল-টাইম অডিট এবং প্রজেক্টের পারফরম্যান্স অডিট বাধ্যতামূলক করা হবে।
পাচার করা অর্থ ফেরত: গত দেড় দশকে দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে একটি বিশেষ সেল গঠন এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে বিএনপি।
প্রতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা: দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
৪. অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি
প্রধানমন্ত্রী পদের মেয়াদ: কোনো ব্যক্তি টানা দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না।
উচ্চকক্ষ গঠন: আইনসভায় বিশিষ্ট নাগরিক ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে পার্লামেন্টের ‘আপার হাউস’ বা উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে।
বেকারত্ব দূরীকরণ: ‘শিক্ষিত বেকার’দের জন্য কর্মসংস্থান নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ‘বেকার ভাতা’ প্রবর্তন অথবা আত্মকর্মসংস্থানের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা।
কৃষক কার্ড: সার, বীজ ও কীটনাশক স্বল্পমূল্যে সরবরাহ করতে কৃষকদের জন্য আলাদা ‘কৃষক কার্ড’ চালু করা।
বিশ্লেষণ: রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির এই ইশতেহারে সরাসরি সাধারণ মানুষের পকেটে টাকা পৌঁছানো (ফ্যামিলি কার্ড) এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশ পরিকল্পনার (বৃক্ষরোপণ) সমন্বয় দেখা গেছে। তবে বিশাল এই অর্থায়ন এবং দুর্নীতি দমনে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা তৈরি করা দলটির জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে।



