শিক্ষকদের অর্থ লোপাটের শঙ্কা : অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্ট পুনর্গঠনে ক্ষোভ
দেশের ৬ লক্ষাধিক এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীর কষ্টার্জিত অর্থের নিরাপত্তা এখন বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টে ঘটে যাওয়া হাজার হাজার কোটি টাকার অনিয়ম ও দুর্নীতির ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই, এই দুই প্রতিষ্ঠানের নীতিগত পুনর্গঠন নিয়ে শিক্ষা পরিবারে চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারিকৃত পূর্ববর্তী অধ্যাদেশের মূল চেতনাকে উপেক্ষা করে নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা শিক্ষকদের জমানো আমানতকে আবারও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
৭ হাজার কোটি টাকা লোপাটের অতীত ও শিক্ষকদের উদ্বেগ
বিগত সরকারের আমলে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন থেকে প্রতি মাসে ১০% হারে অর্থ কর্তন করা হতো। এই কর্তনকৃত অর্থ জমা হতো অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের তহবিলে। তবে তৎকালীন সময়ে এই দুই সংস্থার দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে চরম অব্যবস্থাপনা, স্বজনপ্রীতি এবং দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র ও শিক্ষক নেতাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকদের কষ্টার্জিত অর্থ থেকে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে। অবসরে যাওয়া শিক্ষক-কর্মচারীরা বছরের পর বছর ঘুরেও তাদের পাওনা টাকা পাননি, অথচ একটি বিশেষ সিন্ডিকেট এই বিশাল তহবিল নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে। এই ঘটনা পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকে কলঙ্কিত ও শিক্ষকদের ক্ষুব্ধ করে তোলে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উদ্যোগ ও আশার আলো
পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শিক্ষক-কর্মচারীদের জমানো অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি বলিষ্ঠ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। সরকারের ২৭ ও ২৮ নং অধ্যাদেশের মাধ্যমে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়:
স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ: অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সরকার মনোনীত মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) একজন নিরপেক্ষ পরিচালকের হাতে।
সরকারি নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি: তহবিলের সুরক্ষায় সরকারি প্রতিনিধির সংখ্যা বৃদ্ধি করে ১০ জন নির্ধারণ করা হয়েছিল।
এই সিদ্ধান্তের ফলে সাধারণ শিক্ষক-কর্মচারীদের মনে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছিল এবং তারা আশা করেছিলেন যে, আমলাতান্ত্রিক স্বচ্ছতার মাধ্যমে তাদের অর্থ এবার নিরাপদ থাকবে।
নতুন কমিটি নিয়ে বিতর্ক: উপেক্ষিত অধ্যাদেশের মূল চেতনা
কিন্তু অতি সম্প্রতি সেই আশার আলোতে বড় ধাক্কা লেগেছে। অভিযোগ উঠেছে, পূর্বের অধ্যাদেশের মূল চেতনাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে। বর্তমান পুর্নগঠনে দুটি প্রধান পরিবর্তন শিক্ষক সমাজকে স্তম্ভিত করেছে:
১. পুনরায় বেসরকারি শিক্ষকদের হাতে দায়িত্ব: মাউশির পরিচালকের পরিবর্তে দুই সংস্থার সচিবের দায়িত্ব আবারও এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ২. সরকারি প্রতিনিধি হ্রাস: বোর্ডে সরকারি প্রতিনিধির সংখ্যা ১০ জন থেকে কমিয়ে মাত্র ৭ জন করা হয়েছে।
শিক্ষক সমাজের একাংশের মতে, এই পরিবর্তনের ফলে বিগত সরকারের আমলের মতো আবারও জবাবদিহিহীন পরিবেশ তৈরি হতে পারে। তদারকি কমে যাওয়ায় অতীতের মতো অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থ লোপাটের পথ আবারও সুগম হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
শিক্ষক সমাজের দাবি: অর্থের পূর্ণ নিরাপত্তা
৬ লক্ষাধিক এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীর স্পষ্ট দাবি—তাদের সারাজীবনের সঞ্চয়ের ওপর আর কোনো রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা জুয়া খেলা চলবে না।
“শিক্ষকদের কষ্টার্জিত অর্থ কোনোভাবেই অনিরাপদ হতে পারে না। আমরা অতীতের মতো কোনো দুর্নীতি বা সিন্ডিকেটের পুনরাবৃত্তি দেখতে চাই না। সরকারের উচিত অতি দ্রুত এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে তহবিলের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।”
— সাধারণ শিক্ষক প্রতিনিধি
সচেতন মহল মনে করছেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মেরুদণ্ড টিকিয়ে রাখতে এবং শিক্ষকদের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা দিতে সরকারকে এই দুই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি বজায় রাখতে হবে। কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বা ব্যক্তির স্বার্থে যেন শিক্ষকদের আমানত বিঘ্নিত না হয়, তা নিশ্চিত করার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি জোর দাবি জানানো হয়েছে।


