আইবাস++ । পে ফিক্সেশন । ই-ফাইলিং

মোবাইলেই কি নিজে নিজে পে ফিক্সেশন করা যাবে? কর্মচারীদের জন্য iBAS++-এর নতুন প্রক্রিয়া ও করণীয়

নতুন জাতীয় বেতনকাঠামো–২০২৬ বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ ধাপে প্রবেশ করেছে সরকার। আজ ৫ অক্টোবর ২০২৬ থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন নির্ধারণ বা ‘পে ফিক্সেশন’ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। অর্থ বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী, আগামী ২০ অক্টোবরের মধ্যে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন বেতন নির্ধারণ করা হবে সরকারের সমন্বিত বাজেট ও হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থা iBAS++-এর Pay Fixation মডিউলের মাধ্যমে।

এতে সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে তা হলো—সাধারণ সরকারি কর্মচারী কি নিজেই মোবাইল ফোন ব্যবহার করে পে ফিক্সেশন করতে পারবেন? বর্তমান অনলাইন ব্যবস্থার তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নন-গেজেটেড কর্মচারীদের জন্য নিজে অনলাইনে পে ফিক্সেশনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অর্থাৎ কম্পিউটার ছাড়াও স্মার্টফোনের ব্রাউজার ব্যবহার করে নির্ধারিত পোর্টালে প্রবেশ করে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা সম্ভব হওয়ার কথা। তবে শুধু অনলাইনে তথ্য পূরণ করলেই পে ফিক্সেশন চূড়ান্ত হবে না; পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ কর্তৃপক্ষ তথ্য যাচাই করবে।

মোবাইল দিয়ে পে ফিক্সেশন করতে পারবেন কারা?

পে ফিক্সেশনের ক্ষেত্রে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রবেশ পদ্ধতিতে পার্থক্য রাখা হয়েছে।

গেজেটেড কর্মকর্তারা নিজেদের User ID ও Password ব্যবহার করে সিস্টেমে প্রবেশ করবেন। অন্যদিকে নন-গেজেটেড কর্মচারীদের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ও জন্মতারিখ ব্যবহার করে প্রবেশের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরে OTP পাঠানো হবে এবং সেটি ব্যবহার করে পরিচয় যাচাই করে সিস্টেমে প্রবেশ করতে হবে।

iBAS++-এর বর্তমান পোর্টালেও “Pay Fixation-2026 GoB Staff – Running (Without User ID)” অপশন দেখা যাচ্ছে।

অর্থাৎ একজন নন-গেজেটেড কর্মচারীর হাতে একটি স্মার্টফোন, ইন্টারনেট সংযোগ, NID এবং সংশ্লিষ্ট মোবাইল নম্বর থাকলে তিনি নিজেই প্রক্রিয়াটি শুরু করতে পারবেন।

মোবাইল দিয়ে পে ফিক্সেশন করার সম্ভাব্য ধাপ

১. iBAS++ পে ফিক্সেশন পোর্টালে প্রবেশ

প্রথমে স্মার্টফোনের Chrome বা অন্য কোনো আধুনিক ব্রাউজার খুলে নির্ধারিত iBAS++ পোর্টালে প্রবেশ করতে হবে। সরকারি iBAS++ পোর্টালে বর্তমানে ২০২৬ সালের পে ফিক্সেশনের আলাদা অপশন রয়েছে।

২. NID ও জন্মতারিখ দিয়ে প্রবেশ

নন-গেজেটেড কর্মচারীদের ক্ষেত্রে NID নম্বর ও জন্মতারিখ ব্যবহার করে পরিচয় যাচাইয়ের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।

এরপর নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরে OTP বা ভেরিফিকেশন কোড পাঠানো হবে। সেই কোড দিয়ে লগইন/ভেরিফিকেশন সম্পন্ন করতে হবে।

৩. চাকরির তথ্য যাচাই

সিস্টেমে প্রবেশের পর চাকরিসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য যাচাই করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর
  • জন্মতারিখ
  • নাম
  • বর্তমান পদবি
  • বর্তমান গ্রেড
  • চাকরিতে যোগদানের তারিখ
  • ৩০ জুন ২০২৬ তারিখের মূল বেতন
  • আগের বেতন নির্ধারণের তথ্য
  • পদোন্নতির তথ্য
  • বদলির তথ্য
  • টাইম স্কেল
  • সিলেকশন গ্রেড
  • উচ্চতর গ্রেড
  • সংশ্লিষ্ট অফিস আদেশ ও অন্যান্য নথি

অর্থাৎ বর্তমান বেতন জানলেই পে ফিক্সেশন সম্পন্ন হবে না। চাকরির পূর্ববর্তী ইতিহাসও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মোবাইল দিয়ে করলেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—তথ্য যাচাই

এখানেই কর্মচারীদের সবচেয়ে বেশি সতর্ক হতে হবে।

অনলাইনে নিজের তথ্য দেখা গেলে সেটি ভালোভাবে যাচাই করতে হবে। বিশেষ করে ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে প্রচলিত মূল বেতন সঠিক আছে কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ নতুন বেতন নির্ধারণের ভিত্তি হিসেবে ওই তারিখের মূল বেতন বিবেচনা করা হচ্ছে।

একইভাবে আগে যদি পদোন্নতি, উচ্চতর গ্রেড, টাইম স্কেল বা সিলেকশন গ্রেড পেয়ে থাকেন, সেসব তথ্যও সঠিকভাবে থাকতে হবে।

কোনো তথ্য ভুল থাকলে ভবিষ্যতে নতুন বেতন নির্ধারণ, বেতন বিল এবং বকেয়া বা এরিয়ার হিসাব—সবকিছুতেই সমস্যা তৈরি হতে পারে।

শুধু মোবাইলে Submit করলেই কি পে ফিক্সেশন শেষ?

না।

এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

কর্মচারী অনলাইনে তথ্য দিয়ে আবেদন বা পে ফিক্সেশন সাবমিট করার পর সংশ্লিষ্ট বেতন ও হিসাব পরিশোধ কর্মকর্তা/হিসাবরক্ষণ কার্যালয় তথ্য যাচাই করবেন। চাকরির নথি, পূর্বের বেতন নির্ধারণ এবং অনলাইনে দেওয়া তথ্যের মধ্যে মিল রয়েছে কি না, তা দেখা হবে।

তাই—

অনলাইনে তথ্য পূরণ → Submit → কর্তৃপক্ষের যাচাই → চূড়ান্ত অনুমোদন

এই ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়েই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হবে।

পে ফিক্সেশনের আগে যেসব কাগজপত্র প্রস্তুত রাখবেন

কর্মচারীদের শেষ মুহূর্তে সমস্যায় পড়া এড়াতে আগে থেকেই প্রয়োজনীয় নথি হাতের কাছে রাখা উচিত। বিশেষ করে—

১. জাতীয় পরিচয়পত্র
২. জন্মতারিখের সঠিক তথ্য
৩. বর্তমান বেতন-সংক্রান্ত তথ্য
৪. ৩০ জুন ২০২৬-এর মূল বেতনের তথ্য
৫. সর্বশেষ বেতন নির্ধারণের কাগজ
৬. পদোন্নতির অফিস আদেশ
৭. উচ্চতর গ্রেডের আদেশ
৮. টাইম স্কেল/সিলেকশন গ্রেডের কাগজপত্র
৯. বদলি বা পদায়ন সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নথি
১০. চাকরিতে যোগদানের সঠিক তারিখ

এসব তথ্যের সঙ্গে iBAS++-এ প্রদর্শিত তথ্যের মিল আছে কি না, তা ভালোভাবে দেখতে হবে।

ভুল তথ্য দিলে কী হতে পারে?

পে ফিক্সেশনে ভুল তথ্য দেওয়া হলে সেটি শুধু অনলাইন আবেদনের সমস্যা হিসেবে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে।

ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্যের কারণে—

  • নতুন মূল বেতন ভুল নির্ধারিত হতে পারে;
  • বেতন বিল তৈরিতে সমস্যা হতে পারে;
  • বকেয়া বা এরিয়ার হিসাব পরিবর্তিত হতে পারে;
  • কর্তৃপক্ষের কাছে সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে;
  • পূর্ববর্তী বেতন নির্ধারণের সঙ্গে অসংগতি ধরা পড়তে পারে।

তাই দ্রুত পে ফিক্সেশন করার চেয়ে সঠিকভাবে পে ফিক্সেশন করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

নতুন বেতন ও বকেয়া কীভাবে নির্ধারিত হবে?

নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে প্রাপ্ত মূল বেতনকে ভিত্তি ধরে নতুন কাঠামোয় বেতন নির্ধারণ করা হবে।

প্রজ্ঞাপনের বাস্তবায়ন কাঠামো অনুযায়ী নতুন ও পুরোনো মূল বেতনের পার্থক্যের—

  • ৪০ শতাংশ কার্যকর হবে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত;
  • ৭০ শতাংশ কার্যকর হবে ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত;
  • পূর্ণ নতুন মূল বেতন কার্যকর হবে ১ জুলাই ২০২৭ থেকে।

নতুন কাঠামোর বিভিন্ন ভাতা ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।

ফলে জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের বকেয়া বা এরিয়ার পরিমাণ প্রত্যেক কর্মচারীর ক্ষেত্রে এক হবে না। কারও গ্রেড, ৩০ জুনের মূল বেতন, নতুন নির্ধারিত মূল বেতন এবং কার্যকর তারিখের ওপর বকেয়ার পরিমাণ নির্ভর করবে।

অক্টোবরের বেতনের সঙ্গে বকেয়া পাওয়ার সম্ভাবনা

পে ফিক্সেশন দ্রুত সম্পন্ন হলে অক্টোবর মাসের বেতনের সঙ্গে জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের প্রায় তিন মাসের বকেয়া দেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে বলে অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে এটি নির্ভর করবে পে ফিক্সেশন ও পরবর্তী বেতন বিল প্রক্রিয়া যথাসময়ে সম্পন্ন হওয়ার ওপর।

অর্থাৎ কর্মচারীদের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সঠিকভাবে পে ফিক্সেশন সম্পন্ন করা।

মোবাইল দিয়ে পে ফিক্সেশন করতে গিয়ে সমস্যা হলে কী করবেন?

সবার মোবাইলে একইভাবে ওয়েবসাইট কাজ নাও করতে পারে। ইন্টারনেট দুর্বলতা, OTP না আসা, তথ্য না মেলা কিংবা সিস্টেমে অতিরিক্ত চাপের কারণে সমস্যা হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে বারবার ভুল তথ্য দিয়ে চেষ্টা না করে প্রথমে—

NID → জন্মতারিখ → নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর → চাকরির তথ্য → পুরোনো বেতন নির্ধারণ

এসব তথ্য সঠিক আছে কি না যাচাই করতে হবে।

সমস্যা অব্যাহত থাকলে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ কার্যালয় বা বেতন ও হিসাব পরিশোধ কর্মকর্তার সহায়তা নেওয়া উচিত। পে ফিক্সেশন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের অনলাইন প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে।

কর্মচারীদের জন্য বিশেষ সতর্কবার্তা

মোবাইল দিয়ে পে ফিক্সেশন করা গেলেও এটিকে কোনোভাবেই সাধারণ মোবাইল ফরম পূরণের মতো দেখা উচিত নয়। কারণ এখানে দেওয়া তথ্যের ওপর ভবিষ্যতের মূল বেতন, বেতন বিল এবং বকেয়া পাওনার হিসাব নির্ভর করবে।

বিশেষ করে যাদের—

  • দীর্ঘ চাকরির ইতিহাস রয়েছে,
  • একাধিকবার পদোন্নতি হয়েছে,
  • উচ্চতর গ্রেড পেয়েছেন,
  • টাইম স্কেল পেয়েছেন,
  • সিলেকশন গ্রেড পেয়েছেন,
  • একাধিকবার বেতন ফিক্সেশন হয়েছে,

তাদের আগের সব তথ্য ও অফিস আদেশ মিলিয়ে নিয়ে তারপর Final Submit করা উচিত।

শেষ কথা

হ্যাঁ—নন-গেজেটেড সরকারি কর্মচারীরা স্মার্টফোন ব্যবহার করে নিজেরাই iBAS++-এ পে ফিক্সেশন প্রক্রিয়া শুরু ও অনলাইনে তথ্য জমা দিতে পারবেন। তবে মোবাইল দিয়ে আবেদন করলেই পুরো পে ফিক্সেশন শেষ হয়ে যাবে না। অনলাইনে দেওয়া তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যাচাই করার পরই প্রক্রিয়াটি চূড়ান্ত হবে।

তাই ৫ অক্টোবর থেকে ২০ অক্টোবর ২০২৬-এর নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে প্রত্যেক কর্মচারীর উচিত নিজের NID, জন্মতারিখ, বর্তমান গ্রেড, ৩০ জুনের মূল বেতন এবং পূর্ববর্তী বেতন নির্ধারণের ইতিহাস ভালোভাবে যাচাই করে পে ফিক্সেশন সম্পন্ন করা।

iBAS++ সরকারি পোর্টাল

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *