সরকারি কর্মচারী হয়ে সাংবাদিকতা ২০২৬ । নোয়াখালীর সেই প্রধান শিক্ষকের বেতন বৃদ্ধি স্থগিত হয়েছে?
সরকারি কর্মচারী বিধিমালা লঙ্ঘন করে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া সাংবাদিকতা পেশায় জড়িত থাকার অভিযোগে নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার এক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। অভিযুক্ত শিক্ষকের নাম জনাব মুহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন। তিনি উপজেলার জে. হক আজিজিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত।
ঘটনার প্রেক্ষাপট
বিভাগীয় উপপরিচালকের কার্যালয় (প্রাথমিক শিক্ষা, চট্টগ্রাম বিভাগ) কর্তৃক জারিকৃত এক অফিস আদেশে জানানো হয়েছে যে, সরকারি কর্মচারী হওয়া সত্ত্বেও যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি না নিয়ে সাংবাদিকতা করার বিষয়টি প্রাথমিক তদন্তে প্রমাণিত হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয়েছিল।
তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, ওই শিক্ষক শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত থেকেও সক্রিয়ভাবে সাংবাদিকতা চালিয়ে আসছিলেন, যা সরকারি চাকরি বিধিমালার পরিপন্থী।
শাস্তিমূলক ব্যবস্থা
অফিস আদেশে বলা হয়েছে, অভিযুক্ত শিক্ষককে ব্যক্তিগত শুনানির সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তবে শুনানি, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের প্রতিবেদন এবং তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনায় তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপীল) বিধিমালা, ২০১৮’ এর ৩(খ) ধারা মোতাবেক ‘অসদাচরণ’ অপরাধে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। বিধি অনুযায়ী শাস্তি হিসেবে:
তাঁর ০১ (এক) টি বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি (Increment) ০১ (এক) বছরের জন্য স্থগিত করা হয়েছে।
একই সাথে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই স্থগিতকৃত বেতন বৃদ্ধির বকেয়া তিনি ভবিষ্যতে প্রাপ্য হবেন না।
কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা
চট্টগ্রাম বিভাগীয় উপপরিচালক মো: নূরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এই আদেশে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের সার্ভিস বইয়ে (চাকুরী বহি) লিপিবদ্ধ করার জন্য উপজেলা শিক্ষা অফিসারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আদেশের অনুলিপি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, এই আদেশ সরকারি চাকুরিজীবীদের জন্য একটি সতর্কবার্তা, যারা একই সাথে অন্য কোনো লাভজনক পেশা বা সাংবাদিকতায় যুক্ত রয়েছেন।

অন্য পেশায় জড়ালে কি কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হয়?
হ্যাঁ, বাংলাদেশে সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে অন্য কোনো পেশা, ব্যবসা বা কর্মসংস্থানে জড়িত হতে চাইলে অবশ্যই কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি নিতে হয়। এটি সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালার একটি মৌলিক অংশ।
এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়মগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা (১৯৭৯)
এই বিধিমালার ১৭ নং ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, কোনো সরকারি কর্মচারী সরকারের পূর্বানুমতি ব্যতিরেকে অন্য কোনো ব্যবসা বা চাকরিতে নিয়োজিত হতে পারবেন না। এমনকি অবৈতনিক কোনো কাজে যুক্ত হতে গেলেও অনুমতি প্রয়োজন হতে পারে।
২. কেন অনুমতি প্রয়োজন?
স্বার্থের সংঘাত: সরকারি দায়িত্ব পালনকালে যেন অন্য কোনো পেশার কারণে নিরপেক্ষতা নষ্ট না হয়।
অফিস সময়ের সদ্ব্যবহার: অন্য কাজে ব্যস্ত থাকলে সরকারি কাজে ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
অসদাচরণ রোধ: আপনার শেয়ার করা অফিস আদেশের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, অনুমতি ছাড়া সাংবাদিকতা করাকে ‘অসদাচরণ’ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে এবং শাস্তি দেওয়া হয়েছে।
৩. অনুমতি পাওয়ার শর্তাবলি
সরকার সাধারণত নিচের বিষয়গুলো বিবেচনা করে অনুমতি দেয়:
অন্য পেশাটি যেন সরকারি কাজের সময় বা গুণগত মানকে প্রভাবিত না করে।
পেশাটি যেন কোনোভাবেই সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ না করে।
এটি যেন কোনো বাণিজ্যিক বা লাভজনক ব্যবসা না হয় (বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে সীমিত পরিসরে সুযোগ থাকলেও তা বেশ জটিল)।
৪. লেখালেখি বা শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে শিথিলতা
কিছু ক্ষেত্রে নিয়ম কিছুটা নমনীয়, তবে শর্তসাপেক্ষে:
সাহিত্য ও শিল্পচর্চা: বিশুদ্ধ সাহিত্যকর্ম, বিজ্ঞানসম্মত বা শৈল্পিক কাজে সাধারণত অনুমতির প্রয়োজন হয় না, তবে তাতে যেন কোনো রাজনৈতিক বা স্পর্শকাতর সরকারি তথ্য না থাকে।
সাংবাদিকতা: সংবাদপত্রে কলাম লেখা বা নিয়মিত সাংবাদিকতা করার জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিভাগের প্রধানের কাছ থেকে অনাপত্তি সনদ (NOC) নিতে হয়।
সহজ কথায়: আপনি যদি সরকারি চাকরির পাশাপাশি টিউশনি, ব্যবসা, ফ্রিল্যান্সিং বা পার্ট-টাইম কোনো কাজ করতে চান, তবে নিরাপদ থাকতে আপনার নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ বা বিভাগীয় প্রধানের কাছ থেকে লিখিত অনুমতি নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। অনুমতি ছাড়া এমন কাজে যুক্ত হলে তা বিভাগীয় মামলার কারণ হতে পারে।



