সরকারি কর্মচারীদের বকেয়া বেতন বিল তৈরি হবে সহজেই, এক ক্লিকেই তৈরি ও প্রিন্ট করা যাবে Salary Bill
বাংলাদেশের সরকারি কর্মচারীদের বকেয়া বেতন-ভাতার হিসাব তৈরি এবং বিল প্রস্তুতের কাজ আরও সহজ করতে তৈরি করা হয়েছে ‘বকেয়া বেতন বিল জেনারেটর’ নামে একটি বিশেষ ডিজিটাল টুল। এর মাধ্যমে নন-গেজেটেড সরকারি কর্মচারীদের প্রয়োজনীয় তথ্য ইনপুট দিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বকেয়া বেতন বিল তৈরি, হিসাব যাচাই এবং প্রিন্ট বা PDF আকারে সংরক্ষণ করা সম্ভব।
বিশেষ করে জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুযায়ী বেতন বৃদ্ধির ফলে আগের উত্তোলিত বেতন এবং নতুন স্কেলে প্রাপ্য বেতনের পার্থক্য হিসাব করার ক্ষেত্রে এ ধরনের টুল সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজে আসতে পারে। এতে একাধিক কর্মচারীর তথ্য একসঙ্গে সংরক্ষণ এবং প্রত্যেকের জন্য আলাদা বেতন বিল প্রস্তুতের সুবিধাও রাখা হয়েছে।
বকেয়া বেতন বিল জেনারেটরে যেসব সুবিধা থাকছে
প্রাপ্ত HTML ফাইলটি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এটি মূলত নন-গেজেটেড সরকারি কর্মচারীদের বেতন বিল তৈরির জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। টুলটিতে দুটি প্রধান বিভাগ রয়েছে। একটি হলো ডেটা এন্ট্রি এবং অন্যটি হলো Salary_Bill বা প্রস্তুতকৃত বেতন বিল।
প্রথম বিভাগে কর্মচারীদের ব্যক্তিগত ও বেতনসংক্রান্ত তথ্য ইনপুট দিতে হয়। এসব তথ্যের ভিত্তিতে দ্বিতীয় বিভাগে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেতন বিল তৈরি হয়।
১. কর্মচারীদের তথ্য এন্ট্রির সুবিধা
বিল তৈরির জন্য প্রতিটি কর্মচারীর নিম্নোক্ত তথ্য দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে—
কর্মচারীর নাম;
পদবি;
বিদ্যালয়ের নাম;
জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর (NID);
জিপিএফ হিসাব নম্বর;
বেতন গ্রেড;
পুরোনো মূল বেতন;
পুরোনো বাড়ি ভাড়া;
২০১৫ সালের জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী উত্তোলিত মূল বেতন;
উত্তোলিত বাড়ি ভাড়া;
বিশেষ সুবিধা;
নতুন স্কেলে প্রাপ্য ৫০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির পরিমাণ।
এ ছাড়া নতুন কর্মচারীর তথ্য যুক্ত করার জন্য ‘নতুন সারি’ যুক্ত করার অপশন রয়েছে। প্রয়োজনে কোনো কর্মচারীর তথ্য মুছে ফেলার সুবিধাও রাখা হয়েছে।
২. বকেয়ার মাস নির্বাচন
বকেয়া বেতন হিসাব করার জন্য কোন কোন মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে, তা নির্ধারণের ব্যবস্থা রয়েছে।
টুলটির ডিফল্ট সেটিংসে জুলাই ২০২৬, আগস্ট ২০২৬ এবং সেপ্টেম্বর ২০২৬ মাস উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ব্যবহারকারী প্রয়োজন অনুযায়ী মাস পরিবর্তন করতে পারবেন।
উদাহরণস্বরূপ, তিন মাসের বকেয়া হিসাব করতে চাইলে মাসের ঘরে লিখতে হবে—
জুলাই/২৬
আগস্ট/২৬
সেপ্টেম্বর/২৬
এভাবে মাসের নাম কমা দিয়ে আলাদা করে লিখলে সফটওয়্যারটি নির্ধারিত মাসের সংখ্যা অনুযায়ী হিসাব করবে।
৩. বাড়ি ভাড়া ও বিশেষ সুবিধার স্বয়ংক্রিয় হিসাব
বকেয়া বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাড়ি ভাড়া ও বিশেষ সুবিধার হিসাব গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখে জেনারেটরে বাড়ি ভাড়া এবং বিশেষ সুবিধার হার নির্ধারণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে বাড়ি ভাড়ার হার ৪০ শতাংশ এবং বিশেষ সুবিধার হার ১৫ শতাংশ দেওয়া রয়েছে। তবে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহারকারী এসব হার পরিবর্তন করতে পারবেন।
এখানে দুটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—
বাড়ি ভাড়া-১ হিসাব করা হবে পুরোনো মূল বেতনের ভিত্তিতে।
বাড়ি ভাড়া-২ এবং বিশেষ সুবিধা হিসাব করা হবে ২০১৫ সালের স্কেলে উত্তোলিত মূল বেতনের ভিত্তিতে।
কোনো কর্মচারীর ক্ষেত্রে বাড়ি ভাড়া বা বিশেষ সুবিধার পরিমাণ আলাদা হলে সংশ্লিষ্ট ঘরে সরাসরি টাকার পরিমাণ ইনপুট দেওয়ার সুবিধাও রয়েছে।
৪. নতুন ও পুরোনো বেতনের পার্থক্য নির্ধারণ
বকেয়া বেতন হিসাবের মূল ভিত্তি হলো নতুন স্কেলে প্রাপ্য বেতন এবং আগের স্কেলে উত্তোলিত বেতন-ভাতার পার্থক্য।
জেনারেটরটির হিসাব পদ্ধতিতে দুটি অংশ রাখা হয়েছে।
প্রথম অংশ: নতুন স্কেলে প্রাপ্য বেতন-ভাতা
এখানে মূল বেতন, বাড়ি ভাড়া এবং সংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী প্রাপ্য অর্থ যোগ করা হবে।
দ্বিতীয় অংশ: আগের স্কেলে উত্তোলিত বেতন-ভাতা
এখানে ২০১৫ সালের জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী উত্তোলিত মূল বেতন, বাড়ি ভাড়া এবং বিশেষ সুবিধা হিসাব করা হবে।
এরপর দুই অংশের পার্থক্য নির্ধারণ করে বকেয়া অর্থ বের করা হবে।
জেনারেটরের ব্যবহৃত হিসাবের সূত্র হলো—
প্রাপ্য বকেয়া = (নতুন স্কেলে প্রাপ্য মোট বেতন-ভাতা) − (আগের স্কেলে উত্তোলিত মোট বেতন-ভাতা) − স্ট্যাম্প ডিউটি।
এ ছাড়া টুলটিতে স্ট্যাম্প ডিউটির পরিমাণ নির্ধারণের আলাদা ঘর রয়েছে। ডিফল্ট হিসেবে ১০ টাকা দেওয়া আছে।
৫. স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেতন বিল তৈরি
কর্মচারীর প্রয়োজনীয় তথ্য ইনপুট দেওয়ার পর Salary_Bill বিভাগে গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর নামে বেতন বিল তৈরি হবে।
বিলটিতে যেসব তথ্য প্রদর্শিত হবে—
টিআর ফরম: ১৫;
এসআর ১৫০(১) উল্লেখ;
কর্মচারীর নাম ও পদবি;
জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর;
জিপিএফ হিসাব নম্বর;
দপ্তরের নাম;
প্রাতিষ্ঠানিক কোড;
বিলের বছর ও মাস;
টোকেন নম্বর;
ভাউচার নম্বর;
বিলের তারিখ;
অর্থনৈতিক কোড;
মাসভিত্তিক বেতন ও ভাতার হিসাব;
মোট প্রাপ্য বকেয়া;
কর্তন ও স্ট্যাম্প ডিউটি;
কথায় বকেয়ার পরিমাণ।
বিলের নিচে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর, সিল, হিসাবরক্ষণ অফিসের ব্যবহার এবং চেকসংক্রান্ত তথ্যের জন্য জায়গাও রাখা হয়েছে।
৬. এক ক্লিকেই Print ও PDF সংরক্ষণ
জেনারেটরটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো প্রিন্ট ও PDF তৈরি করার ব্যবস্থা।
এতে দুটি আলাদা অপশন রয়েছে।
সকলের Print/PDF: একাধিক কর্মচারীর তথ্য যুক্ত করা থাকলে প্রত্যেকের জন্য আলাদা বিল তৈরি করে একসঙ্গে প্রিন্ট করা যাবে।
শুধু বর্তমান Print: তালিকা থেকে নির্দিষ্ট একজন কর্মচারী নির্বাচন করে শুধু তাঁর বেতন বিল প্রিন্ট করা যাবে।
PDF সংরক্ষণ করতে প্রিন্ট অপশনে গিয়ে Destination হিসেবে ‘Save as PDF’ নির্বাচন করতে হবে।
৭. একাধিক কর্মচারীর তথ্য সংরক্ষণের সুবিধা
টুলটিতে ব্রাউজারের Local Storage ব্যবহার করে তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ফলে একই ব্রাউজারে পরবর্তী সময়ে প্রবেশ করলে আগের ইনপুট করা তথ্য পুনরায় পাওয়া যেতে পারে।
এ ছাড়া কর্মচারী নির্বাচন করার জন্য Previous ও Next অপশন রয়েছে। ফলে একাধিক কর্মচারীর বিল সহজে দেখা ও তৈরি করা সম্ভব।
কীভাবে বকেয়া বেতন বিল তৈরি করবেন?
জেনারেটরটি ব্যবহারের সাধারণ ধাপগুলো হলো—
1. প্রথমে বকেয়া বেতন বিল জেনারেটর HTML ফাইলটি ব্রাউজারে খুলতে হবে।
2. ডেটা এন্ট্রি বিভাগে প্রবেশ করতে হবে।
3. বকেয়ার মাস, বাড়ি ভাড়ার হার, বিশেষ সুবিধার হার এবং স্ট্যাম্প ডিউটি নির্ধারণ করতে হবে।
4. সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর নাম, পদবি, বিদ্যালয়, NID, GPF ও গ্রেড লিখতে হবে।
5. পুরোনো মূল বেতন, বাড়ি ভাড়া এবং ২০১৫ সালের স্কেলে উত্তোলিত বেতনের তথ্য দিতে হবে।
6. নতুন স্কেলে প্রাপ্য ৫০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির পরিমাণসহ প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করতে হবে।
7. এরপর বিল বিভাগে গিয়ে কর্মচারীর নামে তৈরি হওয়া বেতন বিল দেখতে হবে।
8. সব তথ্য যাচাই শেষে Print অথবা Save as PDF অপশন ব্যবহার করতে হবে।
ব্যবহারের আগে যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে
ডিজিটাল বেতন বিল জেনারেটরটি হিসাব প্রস্তুতের কাজ সহজ করতে পারে। তবে এটি সরকারি অনুমোদিত বেতন নির্ধারণী বা হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
বিশেষ করে কয়েকটি বিষয়ে সতর্কতা প্রয়োজন।
প্রথমত, বেতন ও ভাতার হার যাচাই: বাড়ি ভাড়া, বিশেষ সুবিধা এবং নতুন বেতন বৃদ্ধির হার সংশ্লিষ্ট সরকারি আদেশ ও প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, মাসভিত্তিক হিসাব: সব মাসের বেতন ও ভাতা একই হারে প্রযোজ্য কি না, তা যাচাই করা জরুরি।
তৃতীয়ত, কর্তনের হিসাব: জেনারেটরে শ্রান্তি বিনোদন ভাতার অতিরিক্ত উত্তোলিত অংশ সমন্বয়ের ঘর থাকলেও সেটি বর্তমানে শূন্য হিসেবে দেখানো হয়েছে। বাস্তবে কোনো সমন্বয় প্রয়োজন হলে আলাদাভাবে হিসাব করতে হবে।
চতুর্থত, তথ্যের গোপনীয়তা: NID ও GPF নম্বর সংবেদনশীল তথ্য। তাই ব্যক্তিগত বা অনিরাপদ কম্পিউটারে এসব তথ্য ব্যবহার না করাই ভালো। ব্রাউজারের Local Storage-এ তথ্য থেকে যেতে পারে।
পঞ্চমত, হিসাবের নির্ভুলতা: বিল জমা দেওয়ার আগে প্রস্তুতকৃত হিসাব সংশ্লিষ্ট ডিডিও এবং হিসাবরক্ষণ অফিসের মাধ্যমে যাচাই করা উচিত।
শেষ কথা
সরকারি কর্মচারীদের বকেয়া বেতন-ভাতার হিসাব প্রস্তুত করা অনেক সময়সাপেক্ষ কাজ হতে পারে। বিশেষ করে একাধিক কর্মচারীর বেতন, বাড়ি ভাড়া, বিশেষ সুবিধা এবং বিভিন্ন মাসের বকেয়া হিসাব করতে গিয়ে ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এ অবস্থায় ‘বকেয়া বেতন বিল জেনারেটর’ একটি সহায়ক ডিজিটাল উদ্যোগ হতে পারে। এর মাধ্যমে একই জায়গায় কর্মচারীদের তথ্য সংরক্ষণ, স্বয়ংক্রিয় হিসাব, আলাদা বেতন বিল তৈরি এবং একসঙ্গে PDF বা প্রিন্ট করার সুবিধা পাওয়া যাবে।



