সরকারি চাকরিতে ‘তদবির’ করলেই বিভাগীয় ব্যবস্থা, ডোসিয়ারে থাকবে তথ্য
সরকারি কর্মচারীদের চাকরি-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত তদবিরের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। কোনো সরকারি কর্মচারীর পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ চাকরি-সংক্রান্ত বিষয়ে তদবির করলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তদবিরের ঘটনা ও সংশ্লিষ্ট তথ্য ওই কর্মচারীর ডোসিয়ার বা চাকরি-সংক্রান্ত নথিতে সংরক্ষণ করতে বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে একটি নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। চিঠিটি প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, সব সিনিয়র সচিব ও সচিব, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতেও চিঠিটির একই বিষয়বস্তু তুলে ধরা হয়েছে।
কেন এমন নির্দেশনা
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের চিঠিতে বলা হয়েছে, সরকারি কর্মচারীরা কী ধরনের আচরণ করবেন, তা সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর সংশ্লিষ্ট বিধিতে নির্ধারিত রয়েছে।
সম্প্রতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, সরকারি কর্মচারীদের কারও কারও পক্ষে চাকরি-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে তদবির করার জন্য বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের কাছে যাচ্ছেন।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনায় এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর বিধি ২০-এর লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে এটি সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ২(খ) অনুযায়ী অসদাচরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে নির্দেশনায় বলা হয়েছে।
তদবির করলে কী হতে পারে
নির্দেশনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—কোনো সরকারি কর্মচারী নিজের চাকরি-সংক্রান্ত কোনো বিষয়ে অন্য ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গকে দিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত তদবির করালে তার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
শুধু বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ থাকছে না। এ ধরনের তদবিরের বিস্তারিত তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর ডোসিয়ারে সংরক্ষণ করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে ওই কর্মচারীর চাকরি-সংক্রান্ত নথিতে এমন ঘটনার রেকর্ড থাকার সুযোগ তৈরি হবে।
তবে বৈধভাবে আবেদন করার সুযোগ থাকছে
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নির্দেশনাটি সরকারি কর্মচারীদের চাকরি-সংক্রান্ত সব ধরনের আবেদন নিষিদ্ধ করছে না।
চিঠিতে স্পষ্ট করা হয়েছে, কোনো কর্মচারী তার চাকরি-সংক্রান্ত বিষয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করতে পারবেন।
অর্থাৎ বদলি, পদায়ন, পদোন্নতি, চাকরি-সংক্রান্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কিংবা অন্যান্য বিষয়ে কোনো সমস্যা বা দাবি থাকলে নির্ধারিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। নিষেধাজ্ঞার মূল বিষয় হচ্ছে—নিজের পক্ষে প্রভাবশালী বা অন্য ব্যক্তিকে ব্যবহার করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ওপর অনাকাঙ্ক্ষিত চাপ বা তদবির সৃষ্টি করা।
আবেদন করলে এক মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ
সরকারি কর্মচারীদের জন্য নির্দেশনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রাখা হয়েছে। যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে চাকরি-সংক্রান্ত আবেদন করা হলে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা কর্তৃপক্ষকে সর্বোচ্চ এক মাসের মধ্যে যৌক্তিকভাবে তা নিষ্পত্তি করতে হবে।
এর ফলে একদিকে যেমন অনানুষ্ঠানিক তদবিরের পথ নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে, অন্যদিকে কর্মচারীদের বৈধ প্রশাসনিক প্রতিকার পাওয়ার একটি নির্ধারিত পথও নির্দেশনায় স্পষ্ট করা হয়েছে।
ডোসিয়ারে তথ্য সংরক্ষণের বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ
সরকারি কর্মচারীর ডোসিয়ার বা চাকরি-সংক্রান্ত নথিতে সাধারণত তার চাকরিজীবনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংরক্ষিত থাকে। নতুন নির্দেশনায় তদবিরের তথ্যও সেখানে সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে।
অর্থাৎ কোনো কর্মচারীর পক্ষে চাকরি-সংক্রান্ত বিষয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত তদবিরের ঘটনা ঘটলে সেটি শুধু সংশ্লিষ্ট সময়ে একটি প্রশাসনিক অভিযোগ হিসেবে থেকে যাবে না; নির্দেশনা অনুযায়ী ঘটনার বিস্তারিত তথ্য চাকরির নথিতেও রাখা হবে।
সরকারি কর্মচারীদের জন্য বার্তা
নতুন নির্দেশনার ফলে চাকরি-সংক্রান্ত বিষয়ে সরকারি কর্মচারীদের জন্য মূলত দুটি পথ স্পষ্ট হলো—
প্রথমত, নিজের চাকরি-সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো দাবি বা সমস্যা থাকলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা যাবে।
দ্বিতীয়ত, নিজের পক্ষে অন্য কাউকে দিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে অনাকাঙ্ক্ষিত তদবির করানো হলে তা আচরণবিধি ও শৃঙ্খলা বিধির আওতায় আসতে পারে এবং বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ঘটনাটি ডোসিয়ারে সংরক্ষণ করা হতে পারে।
সরকারি কর্মচারীদের আচরণ নিয়ন্ত্রণে ১৯৭৯ সালের আচরণ বিধিমালা দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর রয়েছে; সরকারি চাকরির আচরণ ও শৃঙ্খলা-সংক্রান্ত বিষয়গুলো বিধি ও সরকারের সময় সময় জারি করা আদেশের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়।
শেষ কথা
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ১৭ সেপ্টেম্বরের নির্দেশনায় মূলত চাকরি-সংক্রান্ত অনাকাঙ্ক্ষিত তদবির বন্ধ এবং নিয়মতান্ত্রিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। সরকারি কর্মচারীরা তাদের চাকরি-সংক্রান্ত বিষয়ে নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করতে পারবেন, তবে অন্য ব্যক্তিকে ব্যবহার করে তদবির করানোর ক্ষেত্রে বিভাগীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি চাকরির নথিতে তথ্য সংরক্ষণের বিষয়টি এখন বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে।


