২০২৭ সালের সরকারি ছুটির প্রজ্ঞাপন প্রকাশ: সাধারণ ছুটি ১৪ দিন, নির্বাহী আদেশে ১৪ দিনসহ মোট ছুটি কত?
২০২৭ সালের সরকারি ছুটির তালিকা প্রকাশ করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। নতুন বছরের সরকারি ছুটির প্রজ্ঞাপনে সাধারণ ছুটি, নির্বাহী আদেশে সরকারি ছুটি, ঐচ্ছিক ছুটি এবং বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের জন্য পৃথক ছুটির দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে সরকারি, আধা-সরকারি, সংবিধিবদ্ধ, স্বায়ত্তশাসিত ও আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আগামী বছরের ছুটির পরিকল্পনা আগেভাগেই করতে পারবেন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ৫ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে জারি করা প্রজ্ঞাপনে ২০২৭ খ্রিষ্টাব্দের ছুটির বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনটি চার পৃষ্ঠার। এতে শুধু সাধারণ ছুটি ও নির্বাহী আদেশে ছুটিই নয়, বরং মুসলিম, হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কর্মচারীদের জন্য ঐচ্ছিক ছুটির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য এই ছুটির তালিকা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ঈদ, পূজা, বড়দিন, বুদ্ধপূর্ণিমা এবং জাতীয় দিবসগুলোকে কেন্দ্র করে সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে মিলিয়ে কর্মচারীরা ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পরিকল্পনা করতে পারবেন।
২০২৭ সালের সরকারি ছুটির হিসাব
প্রজ্ঞাপনের প্রথম তিন পৃষ্ঠায় ছুটির শ্রেণি অনুযায়ী পৃথক তালিকা দেওয়া হয়েছে। ছুটির হিসাবটি নিচে তুলে ধরা হলো।
| ছুটির ধরন | প্রজ্ঞাপনে উল্লেখিত হিসাব |
|---|---|
| সাধারণ ছুটি | সাপ্তাহিক ছুটিসহ ২৫ দিন |
| নির্বাহী আদেশে সরকারি ছুটি | সাপ্তাহিক ছুটিসহ ১৪ দিন |
| মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের ঐচ্ছিক ছুটি | ৬ দিন |
| হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ঐচ্ছিক ছুটি | ৯ দিন |
| খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের ঐচ্ছিক ছুটি | ৮ দিন |
| বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ঐচ্ছিক ছুটি | ৭ দিন |
| পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ঐচ্ছিক ছুটি | ২ দিন |
বিশেষভাবে লক্ষণীয়: সাধারণ ছুটির ২৫ দিনের হিসাবের মধ্যে ৪টি সাপ্তাহিক ছুটির দিন এবং নির্বাহী আদেশের ১৪ দিনের হিসাবের মধ্যে ৩টি সাপ্তাহিক ছুটির দিন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই হিসাবগুলোকে পৃথক ছুটির দিনের সংখ্যা হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
১. সাধারণ ছুটির তালিকায় যেসব দিবস অন্তর্ভুক্ত
২০২৭ সালে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবস এবং ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে সাধারণ ছুটি নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।
ঈদুল ফিতর।
স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস।
বাংলা নববর্ষ।
মে দিবস।
বুদ্ধপূর্ণিমা।
ঈদুল আজহা।
আশুরা।
জন্মাষ্টমী।
দুর্গাপূজা।
বিজয় দিবস।
যিশুখ্রিষ্টের জন্মদিন বা বড়দিন।
অন্যান্য নির্ধারিত জাতীয় ও ধর্মীয় দিবস।
প্রজ্ঞাপনের প্রথম পৃষ্ঠায় এসব ছুটির নাম, সংশ্লিষ্ট দিবসের তারিখ, বাংলা তারিখ এবং ছুটির পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে সরকারি কর্মচারীরা নির্ধারিত ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ছুটির পরিকল্পনা করতে পারবেন।
২. নির্বাহী আদেশে সরকারি ছুটি
সাধারণ ছুটির বাইরে সরকার নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে কয়েকটি বিশেষ দিনে সরকারি ছুটি নির্ধারণ করেছে।
এই তালিকায় রয়েছে—
শবেবরাত।
শবেকদর।
ঈদুল ফিতর উপলক্ষে অতিরিক্ত ছুটি।
বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে নির্ধারিত ছুটি।
ঈদুল আজহা উপলক্ষে অতিরিক্ত ছুটি।
দুর্গাপূজা উপলক্ষে নির্ধারিত ছুটি।
অন্যান্য নির্ধারিত ধর্মীয় ও বিশেষ দিবস।
বিশেষ করে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে একাধিক দিনের ছুটি রাখা হয়েছে। ফলে ঈদের সময় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তুলনামূলক দীর্ঘ ছুটি ভোগের সুযোগ পাবেন।
তবে ঈদের চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল ছুটির তারিখ পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে। এ ক্ষেত্রে সরকারি নির্দেশনা ও প্রজ্ঞাপনের শর্ত অনুসরণ করতে হবে।
৩. মুসলিম কর্মচারীদের ঐচ্ছিক ছুটি
মুসলিম ধর্মাবলম্বী সরকারি কর্মচারীদের জন্য ২০২৭ সালে মোট ৬ দিনের ঐচ্ছিক ছুটি নির্ধারণ করা হয়েছে।
ধর্মীয় উৎসব ও বিশেষ দিন উপলক্ষে এই ছুটিগুলো নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনের দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় সংশ্লিষ্ট তারিখ ও ছুটির পরিমাণ বিস্তারিতভাবে উল্লেখ রয়েছে।
৪. হিন্দু কর্মচারীদের ঐচ্ছিক ছুটি
হিন্দু ধর্মাবলম্বী সরকারি কর্মচারীদের জন্য ২০২৭ সালে মোট ৯ দিনের ঐচ্ছিক ছুটির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
এ তালিকায় সরস্বতী পূজা, শিবরাত্রি ব্রত, দোলযাত্রা, হরিচাঁদ ঠাকুরের আবির্ভাব, মহালয়া, দুর্গাপূজার বিভিন্ন পর্ব এবং অন্যান্য ধর্মীয় উৎসব অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বিশেষ করে দুর্গাপূজার সময় একাধিক দিনে ঐচ্ছিক ছুটির সুযোগ রাখা হয়েছে।
৫. খ্রিষ্টান কর্মচারীদের ঐচ্ছিক ছুটি
খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী সরকারি কর্মচারীদের জন্য মোট ৮ দিনের ঐচ্ছিক ছুটি নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে—
ইস্টার সানডে।
ভস্ম বুধবার।
পুণ্য বৃহস্পতিবার।
পুণ্য শুক্রবার।
পুণ্য শনিবার।
ইস্টার সানডে-সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় অনুষ্ঠান।
বড়দিনের আগের ও পরের নির্ধারিত ধর্মীয় দিবস।
প্রজ্ঞাপনের সংশ্লিষ্ট তালিকায় এসব দিনের তারিখ পৃথকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
৬. বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ঐচ্ছিক ছুটি
বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী সরকারি কর্মচারীদের জন্যও পৃথক ঐচ্ছিক ছুটির ব্যবস্থা রয়েছে।
প্রজ্ঞাপনের দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় বৌদ্ধ ধর্মীয় উৎসবের জন্য মোট ৭ দিনের ছুটি উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও পূর্ণিমা উপলক্ষে নির্ধারিত ছুটি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
৭. পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য বিশেষ ছুটি
পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে কর্মরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কর্মচারীদের জন্য বৈসাবি ও অন্যান্য সামাজিক উৎসব উপলক্ষে ২ দিনের ঐচ্ছিক ছুটি নির্ধারণ করা হয়েছে।
এটি ২০২৭ সালের ছুটির প্রজ্ঞাপনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক। কারণ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসব পালনের বিষয়টি এতে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
৮. ঐচ্ছিক ছুটি ভোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম
প্রজ্ঞাপনের তৃতীয় পৃষ্ঠায় ঐচ্ছিক ছুটি ভোগের বিষয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
প্রথমত: একজন কর্মচারীকে তাঁর নিজ ধর্ম অনুযায়ী বছরে অনধিক মোট ৩ দিনের ঐচ্ছিক ছুটি ভোগের অনুমতি দেওয়া যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত: ঐচ্ছিক ছুটি ভোগ করতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন নিতে হবে।
তৃতীয়ত: সাধারণ ছুটি, নির্বাহী আদেশে সরকারি ছুটি এবং সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে সমন্বয় করে ঐচ্ছিক ছুটি ভোগের ক্ষেত্রে প্রজ্ঞাপনের নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করতে হবে।
চতুর্থত: যেসব অফিস বা প্রতিষ্ঠানের ছুটি তাদের নিজস্ব আইন-কানুন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত অথবা সরকার যেসব প্রতিষ্ঠানকে অত্যাবশ্যকীয় হিসেবে ঘোষণা করেছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নিজস্ব আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী ছুটি নির্ধারিত হবে।
অর্থাৎ, সব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে একইভাবে ছুটি কার্যকর হবে—এমনটি ধরে নেওয়া যাবে না।
৯. সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য এর গুরুত্ব কী?
২০২৭ সালের ছুটির তালিকা প্রকাশের ফলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা তৈরি হয়েছে।
আগাম পারিবারিক পরিকল্পনা: ঈদ, পূজা ও অন্যান্য ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে ছুটির তারিখ আগে থেকেই জানা যাবে। ফলে বাড়িতে যাতায়াত, পারিবারিক অনুষ্ঠান এবং ব্যক্তিগত কাজের পরিকল্পনা করা সহজ হবে।
দাপ্তরিক কার্যক্রমের পরিকল্পনা: সরকারি অফিসগুলো তাদের বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা, সভা, প্রশিক্ষণ এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম ছুটির ক্যালেন্ডারের সঙ্গে সমন্বয় করতে পারবে।
দীর্ঘ ছুটির সুযোগ: কোনো কোনো ধর্মীয় উৎসবের ছুটি সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় কর্মচারীরা তুলনামূলক দীর্ঘ অবকাশ পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
ধর্মীয় বৈচিত্র্যের স্বীকৃতি: বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী কর্মচারীদের জন্য পৃথক ঐচ্ছিক ছুটির ব্যবস্থা থাকায় ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব পালনের সুযোগ নিশ্চিত করার উদ্যোগ প্রতিফলিত হয়েছে।
১০. কোন কোন প্রতিষ্ঠানে এই ছুটির প্রজ্ঞাপন কার্যকর হবে?
প্রজ্ঞাপনের শিরোনাম অনুযায়ী ২০২৭ সালের ছুটির তালিকা বাংলাদেশের—
1. সকল সরকারি অফিস।
2. আধা-সরকারি অফিস।
3. সংবিধিবদ্ধ সংস্থা।
4. স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা।
5. আধা-স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাসমূহের জন্য জারি করা হয়েছে।
তবে যেসব প্রতিষ্ঠানের ছুটি নিজস্ব আইন বা বিধিবিধান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, তাদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধান অনুসরণ করতে হবে।
১১. ২০২৭ সালের সরকারি ছুটির প্রজ্ঞাপন কোথায় পাওয়া যাবে?
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রজ্ঞাপন থেকে সরকারি ছুটির সম্পূর্ণ তালিকা দেখা যাবে।
ওয়েবসাইট: জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়
প্রজ্ঞাপনের তারিখ: ৫ নভেম্বর ২০২৬।
প্রজ্ঞাপনের বিষয়: ২০২৭ খ্রিষ্টাব্দে সরকারি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহে ছুটি পালন।
মূল প্রজ্ঞাপন: এই প্রতিবেদনের সঙ্গে সংযুক্ত চার পৃষ্ঠার PDF-তে সাধারণ ছুটি, নির্বাহী আদেশে সরকারি ছুটি এবং ধর্মভিত্তিক ঐচ্ছিক ছুটির পূর্ণাঙ্গ তালিকা রয়েছে।
শেষ কথা
২০২৭ সালের সরকারি ছুটির প্রজ্ঞাপন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশাসনিক নির্দেশনা। এতে জাতীয় দিবস, ধর্মীয় উৎসব এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সামাজিক অনুষ্ঠানকে বিবেচনায় নিয়ে ছুটির তালিকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে সরকারি চাকরিজীবীদের মনে রাখতে হবে, সাধারণ ছুটি, নির্বাহী আদেশে সরকারি ছুটি এবং ঐচ্ছিক ছুটি এক বিষয় নয়। বিশেষ করে ঐচ্ছিক ছুটি ভোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন প্রয়োজন। তাই ছুটি নেওয়ার আগে মূল প্রজ্ঞাপনের তারিখ ও শর্ত ভালোভাবে দেখে নেওয়া উচিত।
তথ্যসূত্র: জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ৫ নভেম্বর ২০২৬ তারিখের সরকারি ছুটির প্রজ্ঞাপন (৪ পৃষ্ঠা)।



