৯ম পে-স্কেলে পদোন্নতির পর পূর্ণ বেতন না পেলে মূল বেতন নির্ধারণ হবে যেভাবে, জানার অপেক্ষায় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা
নতুন জাতীয় বেতন স্কেলে পদোন্নতি পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট গ্রেডের পূর্ণ বেতন পেতে কত বছর চাকরি করতে হবে, তা নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী নির্ধারিত ন্যূনতম চাকরিকাল পূর্ণ হওয়ার আগেই উচ্চতর গ্রেডে পদোন্নতি পাবেন, তাঁদের মূল বেতন কীভাবে নির্ধারিত হবে—এ প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
৯ম জাতীয় পে-স্কেল ২০২৬-এর পূর্ণ বেতন প্রাপ্তির শর্তাবলি নিয়ে প্রকাশিত একটি ছকে গ্রেডভিত্তিক ন্যূনতম চাকরিকালের উল্লেখ রয়েছে। তবে নির্ধারিত সময় পূর্ণ না করেই কেউ উচ্চতর গ্রেডে পদোন্নতি পেলে তাঁর বেতন কত হবে এবং কোন সূত্রে তা হিসাব করা হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা জানা প্রয়োজন।
এ কারণে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বিশেষ করে পে-ফিক্সেশন, পদোন্নতি এবং নতুন বেতন স্কেলে বেতন নির্ধারণের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
৯ম পে-স্কেলের গেজেটে কী বলা হয়েছে?
অর্থ বিভাগের প্রকাশিত সরকারি গেজেট অনুযায়ী, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে জারি করা ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’-এর অনুচ্ছেদ ১১-তে পদের পূর্ণ বেতন প্রাপ্তির শর্তাবলি উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ এটি কেবল কোনো আলোচনা বা প্রস্তাব নয়; সরকারি গেজেটের একটি বিধান।
অর্থ বিভাগ, অর্থ মন্ত্রণালয়+1
গেজেটের সারণি অনুযায়ী গ্রেডভিত্তিক পূর্ণ বেতন পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম চাকরিকাল হলো:
| গ্রেড | বেতন স্কেল | প্রয়োজনীয় চাকরিকাল |
|---|---|---|
| ১ম | ১,৫৬,০০০ টাকা (নির্ধারিত) | ২০ বছর |
| ২য় | ১,৩২,০০০–১,৫৩,০০০ টাকা | ১৭ বছর |
| ৩য় | ১,১৩,০০০–১,৪৮,৮০০ টাকা | ১৪ বছর |
| ৪র্থ | ১,০০,০০০–১,৪২,৪০০ টাকা | ১২ বছর |
| ৫ম | ৮৬,০০০–১,৩৯,৭০০ টাকা | ১০ বছর |
| ৬ষ্ঠ | ৭১,০০০–১,৩৪,০০০ টাকা | ৫ বছর |
| ৭ম | ৫৮,০০০–১,২৬,৮০০ টাকা | ৪ বছর |
Jagonews24+1
এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয়, গ্রেড-৬-এ পদোন্নতি পাওয়া কোনো কর্মচারীর পূর্ণ বেতন পাওয়ার জন্য পাঁচ বছরের চাকরিকাল প্রয়োজন। অন্যদিকে গ্রেড-৭-এর ক্ষেত্রে প্রয়োজন চার বছর। অর্থাৎ উচ্চতর গ্রেডে পদোন্নতি পেলেই সংশ্লিষ্ট গ্রেডের পূর্ণ বেতন পাওয়ার বিষয়টি স্বয়ংক্রিয় নয়।
চাকরিকাল গণনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত
গেজেটের অনুচ্ছেদ ১১-এর উপ-অনুচ্ছেদ (২)-এ চাকরিকাল সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, উপ-অনুচ্ছেদ (১)-এ উল্লেখিত চাকরিকাল বলতে কেবল ৯ম বা তদূর্ধ্ব গ্রেডে নিয়োজিত প্রকৃত চাকরিকাল বোঝাবে।
এর অর্থ, কোনো কর্মচারীর মোট সরকারি চাকরির বয়স এবং এই বিধানের আওতায় গণনাযোগ্য চাকরিকাল এক বিষয় নয়। তাঁর চাকরির কোন সময়টুকু ৯ম বা তদূর্ধ্ব গ্রেডে অতিবাহিত হয়েছে, সেটিও বিবেচ্য।
Bangladesh Service Rules+1
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: নির্ধারিত সময় পূর্ণ না হলে বেতন কত হবে?
সরকারি চাকরিজীবীদের মূল আগ্রহের জায়গা এখানেই।
ধরা যাক, একজন কর্মচারী ৯ম বা তদূর্ধ্ব গ্রেডে মোট তিন বছর চাকরি করার পর ৬ষ্ঠ গ্রেডের পদে পদোন্নতি পেলেন। অথচ ৬ষ্ঠ গ্রেডের পূর্ণ বেতন পাওয়ার জন্য নির্ধারিত চাকরিকাল পাঁচ বছর।
এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে:
তিনি কি ৬ষ্ঠ গ্রেডের সর্বনিম্ন ধাপের বেতন পাবেন?
আগের গ্রেডের মূল বেতনের সঙ্গে সমন্বয় করে নতুন বেতন নির্ধারণ হবে?
নির্ধারিত পাঁচ বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তাঁর বেতন কোনো বিশেষ ধাপে স্থির থাকবে?
পদোন্নতির পর প্রতিবছর ইনক্রিমেন্ট পাওয়ার মাধ্যমে তিনি কি ধাপে ধাপে পূর্ণ বেতনে পৌঁছাবেন?
এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে অনুচ্ছেদ ১১-এর পাশাপাশি একই আদেশের বেতন নির্ধারণসংক্রান্ত বিধান, বিশেষ করে অনুচ্ছেদ ৫, দেখতে হবে।
একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি: অনুচ্ছেদ ১১-তে পূর্ণ বেতন পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় চাকরিকাল নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু শুধু এই সারণি দেখে চাকরিকাল কম থাকলে কত টাকা মূল বেতন হবে, তার কোনো সরল আনুপাতিক সূত্র নির্ধারণ করা যায় না। অর্থাৎ পাঁচ বছরের শর্ত থাকলে তিন বছরের চাকরির জন্য পাঁচ ভাগের তিন ভাগ বেতন হবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
বেতন নির্ধারণের সম্ভাব্য পদ্ধতি কী হতে পারে?
বিষয়টি বুঝতে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।
১. পদোন্নতির পর বেতন নির্ধারণ (Pay Fixation):
পদোন্নতির তারিখে কর্মচারীর পূর্ববর্তী মূল বেতন, নতুন পদের বেতন স্কেল এবং প্রযোজ্য বেতন নির্ধারণের বিধান বিবেচনা করে নতুন মূল বেতন নির্ধারণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ২০২৬ সালের আদেশের অনুচ্ছেদ ৫ এবং সংশ্লিষ্ট বেতন নির্ধারণের নিয়ম গুরুত্বপূর্ণ।
২. পূর্ণ বেতন পাওয়ার যোগ্যতা:
অনুচ্ছেদ ১১ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট গ্রেডের নির্ধারিত চাকরিকাল পূর্ণ হওয়ার বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচিত হবে। পদোন্নতির মাধ্যমে নতুন গ্রেডে বেতন নির্ধারণ এবং ওই গ্রেডের পূর্ণ বেতন পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন একই বিষয় নয়।
তাই নির্ধারিত চাকরিকাল পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত কোন ধাপে বেতন নির্ধারিত থাকবে, পরবর্তী ইনক্রিমেন্ট কীভাবে যুক্ত হবে এবং নির্ধারিত মেয়াদ পূর্ণ হলে বেতন কীভাবে সমন্বয় হবে—এসব বিষয়ে অর্থ বিভাগের ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা
ধরা যাক:
একজন কর্মচারীর ৯ম বা তদূর্ধ্ব গ্রেডে প্রকৃত চাকরিকাল ৩ বছর।
তিনি ৬ষ্ঠ গ্রেডে পদোন্নতি পেলেন।
৬ষ্ঠ গ্রেডের বেতন স্কেল ৭১,০০০–১,৩৪,০০০ টাকা।
পূর্ণ বেতন পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় চাকরিকাল ৫ বছর।
এ ক্ষেত্রে তাঁর বেতন নির্ধারণের সময় তিন বছরের চাকরিকালকে কীভাবে বিবেচনা করা হবে, তা জানা জরুরি।
এখানে দুটি সম্ভাব্য বিষয় আলাদাভাবে যাচাই করতে হবে:
1. পদোন্নতির তারিখে অনুচ্ছেদ ৫ অনুসারে তাঁর মূল বেতন কত নির্ধারিত হবে?
2. পাঁচ বছরের নির্ধারিত চাকরিকাল পূর্ণ হওয়ার পর তাঁর বেতন কীভাবে পূর্ণ বেতনের পর্যায়ে সমন্বিত হবে?
এই দুটি প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর ছাড়া কোনো কাল্পনিক সূত্র প্রয়োগ করে বেতন হিসাব করা ঠিক হবে না।
কোথায় পাওয়া যাবে মূল বিধান?
এ বিষয়ে আগ্রহী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মূল সরকারি গেজেটের নিচের অংশগুলো দেখতে পারেন।
অনুচ্ছেদ ৫: বেতন নির্ধারণসংক্রান্ত বিধান।
অনুচ্ছেদ ১১: পদের পূর্ণ বেতন প্রাপ্তির শর্তাবলি।
অনুচ্ছেদ ১১(২): চাকরিকাল গণনার ব্যাখ্যা।
জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এর মূল সরকারি গেজেট
অর্থ বিভাগ, অর্থ মন্ত্রণালয় | ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রত্যাশা
নতুন বেতন কাঠামোয় পদোন্নতির পর পূর্ণ বেতন পাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট চাকরিকাল বাধ্যতামূলক করায় বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে যারা নির্ধারিত সময়ের আগেই পদোন্নতি পাবেন, তাঁদের বেতন নির্ধারণের পদ্ধতি স্পষ্ট হওয়া জরুরি।
এ ক্ষেত্রে অর্থ বিভাগ, হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয় এবং আইবাস++ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সুস্পষ্ট নির্দেশনা পাওয়া গেলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বিদ্যমান বিভ্রান্তি দূর হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পূর্ণ বেতন পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় চাকরিকাল নির্ধারণ করা হলেও সেই সময় পূর্ণ হওয়ার আগে পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মচারীর মূল বেতন নির্ধারণের সুনির্দিষ্ট উদাহরণ ও হিসাবপদ্ধতি সহজভাবে প্রকাশ করা প্রয়োজন।



