আয়কর । ভ্যাট । আবগারি শুল্ক

সরকারি দপ্তরের জ্বালানি তেলের বিলে ভ্যাট-আয়কর কর্তন নিয়ে নতুন নির্দেশনা: পেট্রোল পাম্পের ক্ষেত্রে কী নিয়ম?

সরকারি দপ্তরের যানবাহন পরিচালনা, দাপ্তরিক কাজ ও বিভিন্ন সরকারি কার্যক্রমে পেট্রল, অকটেনসহ অন্যান্য জ্বালানি তেল ক্রয়ের বিল পরিশোধের সময় উৎসে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও আয়কর কর্তন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। বিশেষ করে উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিসে পেট্রল, অকটেন ও লুব্রিকেন্টের বিল দাখিল এবং বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে কত শতাংশ ভ্যাট ও আয়কর কর্তন করতে হবে, তা নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্য ও সংশ্লিষ্ট করবিধির বিশ্লেষণে দেখা যায়, পেট্রোল পাম্প থেকে সরাসরি জ্বালানি তেল ক্রয়ের ক্ষেত্রে উৎসে আয়কর কর্তনের বিধান এবং তেল বিপণন কোম্পানি বা ডিলারের কাছ থেকে ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধান এক নয়। একইভাবে উৎসে ভ্যাট কর্তনের ক্ষেত্রেও সরবরাহের ধরন ও প্রযোজ্য এসআরও বিবেচনা করা জরুরি।

২৬ জানুয়ারির ২ শতাংশ ভ্যাট কর্তনের বিধান নিয়ে বিভ্রান্তি

জ্বালানি তেলের বিল থেকে ভ্যাট কর্তনের বিষয়ে ২০২৫ সালের ২৬ জানুয়ারি ২ শতাংশ হারে উৎসে ভ্যাট কর্তনের বিধান নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তবে পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের ২৭ মে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এসআরও নং ১৮২-আইন/২০২৫/৩১০-মূসক জারি করে উৎসে মূল্য সংযোজন কর কর্তন ও আদায় বিধিমালা, ২০২৫ প্রকাশ করে।

নতুন বিধিমালার ফলে আগের বিধান ও নতুন বিধানের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়েছে। তাই ২৬ জানুয়ারি ২০২৫-এর ২ শতাংশ কর্তনের বিষয়টি ধরে পরবর্তী সময়ে সব জ্বালানি তেলের বিল থেকে একই হারে ভ্যাট কর্তন করা সঠিক হবে না।

এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পণ্য, সরবরাহকারী এবং এসআরওর তফসিলে নির্ধারিত বিধান অনুসরণ করতে হবে। বিশেষ করে পেট্রোল পাম্প থেকে সরাসরি জ্বালানি তেল ক্রয়ের ক্ষেত্রে উৎসে ভ্যাট কর্তনের বাধ্যবাধকতা আছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।

পেট্রোল পাম্প থেকে পেট্রল-অকটেন কিনলে আয়কর কর্তন কত?

পেট্রোল পাম্প থেকে সরাসরি পেট্রল, অকটেন বা অন্যান্য জ্বালানি তেল ক্রয়ের ক্ষেত্রে উৎসে আয়কর কর্তনের বিষয়ে বিশেষ বিধান রয়েছে।

আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ৮৯-এর অধীন উৎসে কর বিধিমালা, ২০২৪-এর বিধি ৩(১)-এর সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী পেট্রোল পাম্প বা সিএনজি স্টেশন কর্তৃক তেল বা গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে উৎসে আয়কর কর্তন প্রযোজ্য নয়।

অর্থাৎ সরকারি কোনো দপ্তর পেট্রোল পাম্প থেকে সরাসরি পেট্রল বা অকটেন ক্রয় করলে সেই বিলের বিপরীতে উৎসে আয়কর কর্তন করতে হবে না।

এ কারণে পেট্রোল পাম্প থেকে সরাসরি জ্বালানি তেল কেনার বিল এবং তেল বিপণন কোম্পানি বা ডিলারের কাছ থেকে কেনার বিল একইভাবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

তেল বিপণন কোম্পানি ও ডিলারের ক্ষেত্রে আয়কর কর্তনের হার

পেট্রোল পাম্পের বাইরে তেল বিপণন কোম্পানি বা নির্দিষ্ট ডিলার-এজেন্টের কাছ থেকে জ্বালানি তেল ক্রয়ের ক্ষেত্রে উৎসে আয়করের হার আলাদা হতে পারে।

প্রযোজ্য বিধিমালায় উল্লেখিত হার অনুযায়ী—

  • তেল ও লুব্রিকেন্ট বিপণনে নিয়োজিত তেল বিপণন কোম্পানির ক্ষেত্রে নির্ধারিত উৎসে আয়করের হার ০.৬ শতাংশ।
  • তেল বিপণন কোম্পানির ফিলিং স্টেশন ছাড়া অন্য ডিলার বা এজেন্টের ক্ষেত্রে নির্ধারিত হার ১ শতাংশ।
  • পেট্রোল পাম্প বা ফিলিং স্টেশন থেকে সরাসরি তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে উৎসে আয়কর কর্তন প্রযোজ্য নয়।

তবে বিল নিষ্পত্তির সময় সরবরাহকারীর প্রকৃত পরিচয়, লেনদেনের ধরন এবং সর্বশেষ কার্যকর আয়কর বিধান যাচাই করতে হবে।

লুব্রিকেন্টের বিলের ক্ষেত্রে আলাদা সতর্কতা প্রয়োজন

অনেক সরকারি দপ্তরে জ্বালানি তেলের পাশাপাশি ইঞ্জিন অয়েল, গিয়ার অয়েল, হাইড্রোলিক অয়েল ও অন্যান্য লুব্রিকেন্ট কেনা হয়। এসব পণ্যের বিলের ক্ষেত্রে পেট্রল ও অকটেনের নিয়ম সরাসরি প্রয়োগ করা ঠিক নয়।

লুব্রিকেন্টের বিল থেকে ভ্যাট ও আয়কর কর্তনের বিষয়টি নির্ভর করবে পণ্যের শ্রেণি, সরবরাহকারীর ধরন এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালার ওপর।

বিশেষ করে সরবরাহকারী যদি তেল বিপণন কোম্পানি হয়, তাহলে কোম্পানির সরবরাহের জন্য প্রযোজ্য আয়কর বিধান বিবেচনা করতে হবে। আবার অন্য কোনো ডিলার বা ব্যবসায়ীর কাছ থেকে লুব্রিকেন্ট কেনা হলে সংশ্লিষ্ট সরবরাহের শ্রেণি অনুযায়ী কর কর্তনের হার নির্ধারণ করতে হবে।

উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিসে বিল দাখিলের ক্ষেত্রে করণীয়

সরকারি দপ্তরের হিসাবরক্ষণ ও বিল পরিশোধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভুলভাবে ভ্যাট বা আয়কর কর্তন করলে সরকারি বিল পরিশোধে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় অনুসরণ করা প্রয়োজন—

১. পেট্রোল পাম্প থেকে সরাসরি পেট্রল ও অকটেন কেনা হলে উৎসে আয়কর কর্তনের অব্যাহতির বিধান বিবেচনা করতে হবে।

২. ২০২৫ সালের ২৬ জানুয়ারির ২ শতাংশ ভ্যাট কর্তনের বিষয়টি বর্তমান বিধিমালায় প্রযোজ্য কি না, তা যাচাই করতে হবে।

৩. তেল বিপণন কোম্পানি থেকে তেল কেনা হলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির জন্য নির্ধারিত আয়কর কর্তনের হার অনুসরণ করতে হবে।

৪. ডিলার বা এজেন্টের কাছ থেকে তেল কেনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আয়কর কর্তনের হার যাচাই করতে হবে।

৫. লুব্রিকেন্টের বিলকে সাধারণ জ্বালানি তেলের বিলের সঙ্গে এক করে দেখা যাবে না।

৬. বিলের সঙ্গে যথাযথ ভাউচার, চালান, সরবরাহকারীর পরিচয় এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংযুক্ত রাখতে হবে।

৭. বিল নিষ্পত্তির আগে সংশ্লিষ্ট এসআরও ও সর্বশেষ সংশোধনী অনুসরণ করতে হবে।

একনজরে জ্বালানি তেলের বিলের আয়কর কর্তনের হার

ক্রয়ের উৎসউৎসে আয়কর
পেট্রোল পাম্প থেকে সরাসরি তেল০%
তেল বিপণন কোম্পানি০.৬%
নির্দিষ্ট ডিলার বা এজেন্ট১%

ভ্যাটের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পণ্য ও সরবরাহের ধরন অনুযায়ী উৎসে ভ্যাট কর্তন বিধিমালা, ২০২৫-এর তফসিল অনুসরণ করতে হবে। শুধু আগের ২ শতাংশ কর্তনের বিধানের ভিত্তিতে সব ধরনের জ্বালানি তেলের বিলে কর্তন করা যাবে না।

শেষ কথা

পেট্রল, অকটেন ও লুব্রিকেন্টের বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পণ্যটি কোথা থেকে কেনা হয়েছে এবং সরবরাহকারী কোন শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। পেট্রোল পাম্প থেকে সরাসরি জ্বালানি তেল কেনার ক্ষেত্রে উৎসে আয়কর কর্তনের অব্যাহতি রয়েছে। অন্যদিকে তেল বিপণন কোম্পানি ও ডিলারের ক্ষেত্রে নির্ধারিত হারে আয়কর কর্তন করতে হতে পারে।

তাই উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিসসহ সরকারি দপ্তরের সংশ্লিষ্ট হিসাব শাখার উচিত প্রতিটি বিলের ক্ষেত্রে সরবরাহকারীর পরিচয় ও প্রযোজ্য এসআরও যাচাই করে বিল নিষ্পত্তি করা। এতে অপ্রয়োজনীয় কর কর্তন, বিল ফেরত এবং হিসাব নিষ্পত্তিতে অনাকাঙ্ক্ষিত জটিলতা এড়ানো সম্ভব হবে।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *