বৈষম্য । দাবীর খতিয়ান । পুন:বিবেচনা

ঈদের আগে ৯ম পে-স্কেল ও সর্বনিম্ন ৩৫ হাজার টাকা বেতনের দাবি: প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে স্মারকলিপি

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি আর দীর্ঘ ১১ বছরের বেতন বৈষম্য থেকে মুক্তি পেতে এবার সরাসরি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেছে বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদ। আজ রোববার তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সংগঠনটির পক্ষ থেকে এই স্মারকলিপি জমা দেওয়া হয়। এতে পবিত্র ঈদুল ফিতরের আগেই সর্বনিম্ন ৩৫ হাজার টাকা মূল বেতন ধরে ৯ম পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের জোর দাবি জানানো হয়েছে।


প্রধান দাবিগুলো একনজরে:

ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে পেশকৃত স্মারকলিপিতে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট দাবি ও বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে:

  • সর্বনিম্ন বেতন: ৯ম পে-স্কেলে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৩৫,০০০ টাকা নির্ধারণ।

  • কাঠামো: ১:৪ অনুপাতে মোট ১২টি গ্রেডের ভিত্তিতে পে-স্কেল প্রণয়ন।

  • সময়সীমা: আসন্ন ঈদুল ফিতরের আগেই গেজেট জারি করা।

  • ইশতেহার বাস্তবায়ন: বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী ‘যথা সময়ে ৯ম পে-স্কেল’ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি পূরণ।


বৈষম্যের দীর্ঘ ইতিহাস ও বর্তমান সংকট

স্মারকলিপিতে কর্মচারীরা অভিযোগ করেন যে, ২০১৫ সালে ৮ম পে-স্কেল ঘোষণার পর থেকে ১১-২০ গ্রেডের কর্মচারীরা চরম বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। বিগত সরকারের কাছে বারংবার আবেদন করেও কোনো সুরাহা মেলেনি। এমনকি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ৯ম পে-কমিশন গঠন করলেও এবং কমিশন রিপোর্ট জমা দিলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।

সংগঠনটির নেতারা উল্লেখ করেন, বর্তমান বাজারে ৮,২৫০ টাকা সর্বনিম্ন বেতনে ৬ সদস্যের একটি পরিবারের ভরণপোষণ, চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যয় মেটানো কার্যত অসম্ভব। তথ্যাদি বিশ্লেষণে দেখা যায়:

  • ১১-২০ গ্রেডের ব্যবধান: এই ১০টি গ্রেডের বেতনের মোট পার্থক্য মাত্র ৪,২৫০ টাকা (৮,২৫০ টাকা থেকে ১২,৫০০ টাকা)।

  • ১-১০ গ্রেডের সুবিধা: কর্মকর্তাদের বেতন শুরু হয় ১৬,০০০ টাকা থেকে এবং শেষ হয় ৭৮,০০০ টাকায়, যা চরম বেতন বৈষম্যের পরিচায়ক।


জনপ্রশাসন সংস্কার কমিটির সমালোচনা

ঐক্য পরিষদের নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত জনপ্রশাসন সংস্কার কমিটি কেবল প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করেছে। বিপরীতে ১১-২০ গ্রেডের কর্মচারীদের ভাগ্য উন্নয়নে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। অথচ সংবিধানের ১৫ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যুক্তিসঙ্গত মজুরি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব।


প্রত্যাশা ও অভিনন্দন

স্মারকলিপি প্রদানকালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানানো হয়। কর্মচারীরা আশা প্রকাশ করেন যে, ১৯৯১ ও ২০০৫ সালে যেভাবে বিএনপি সরকার দুটি পে-স্কেল দিয়ে কর্মচারীদের পাশে দাঁড়িয়েছিল, এবারও সেই ধারাবাহিকতায় তাদের মুখে হাসি ফোটানো হবে।

“প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের অসহায়ত্বের কথা বিবেচনা করে ঈদের আগেই পে-স্কেলের গেজেট জারি করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান—এমনটাই আমাদের শেষ ভরসা।” — বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদ।

সংগঠনগুলো কি পে স্কেল না দিলে কঠোর কর্মসূচী দিবে?

বর্তমান প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদ এখন পর্যন্ত স্মারকলিপি প্রদান ও আবেদন-নিবেদনের মাধ্যমে তাদের দাবি জানাচ্ছে। তবে তাদের বক্তব্যে এবং পূর্বের ইতিহাস পর্যালোচনায় কঠোর কর্মসূচির একটি প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

নিচে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হলো:

১. স্মারকলিপিতে আল্টিমেটাম বা সময়সীমা

সংগঠনটি তাদের স্মারকলিপিতে স্পষ্ট করে বলেছে যে, তারা পবিত্র ঈদুল ফিতরের পূর্বেই ৯ম পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ দেখতে চায়। যখন কোনো সংগঠন নির্দিষ্ট কোনো উৎসব বা সময়ের আগে দাবি পূরণের অনুরোধ জানায়, তখন সেই সময়ের মধ্যে দাবি পূরণ না হলে সাধারণত তারা পরবর্তী ধাপে কঠোর আন্দোলনের দিকে যায়।

২. পূর্বের আন্দোলনের ধারাবাহিকতা

স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তারা ২০১৯ সাল থেকে বিভিন্ন ‘শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি’ পালন করে আসছে। সাধারণত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দাবি আদায়ের ধাপগুলো এমন হয়:

  • প্রথম ধাপ: আবেদন, নিবেদন ও স্মারকলিপি প্রদান (যা বর্তমানে চলছে)।

  • দ্বিতীয় ধাপ: মানববন্ধন, কালো ব্যাজ ধারণ বা কর্মবিরতি।

  • চূড়ান্ত ধাপ: দাবি আদায় না হলে রাজপথে কঠোর কর্মসূচি বা পূর্ণাঙ্গ ধর্মঘট।

৩. বৈষম্যের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ

নেতারা তাদের বক্তব্যে কয়েকটি বিষয়কে ‘অসহায়ত্ব’ হিসেবে তুলে ধরেছেন:

  • দীর্ঘ ১১ বছর পে-স্কেল না পাওয়া।

  • দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি।

  • ১১-২০ গ্রেডের কর্মচারীদের চরম বেতন বৈষম্য।

  • জনপ্রশাসন সংস্কার কমিটি কর্তৃক কেবল কর্মকর্তাদের সুবিধা প্রদান।

বিশ্লেষণ: যখন বিশাল একটি জনবল (১১-২০ গ্রেড) মনে করে যে তারা বৈষম্যের শিকার এবং তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানো অসম্ভব হয়ে পড়ছে, তখন দাবি পূরণ না হলে তারা সাধারণত ‘কর্মবিরতি’ বা ‘ঢাকা চলো’-র মতো বড় কর্মসূচির দিকে ধাবিত হয়।

৪. রাজনৈতিক প্রত্যাশা বনাম বাস্তবতা

যেহেতু তারা বর্তমান সরকারকে (বিএনপি) তাদের ইশতেহারের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে, তাই তারা আপাতত আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আশা করছে। তবে যদি ঈদের আগে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি বা গেজেট জারি না হয়, তবে সংগঠনের পক্ষ থেকে বিক্ষোভ সমাবেশ বা কঠোর আন্দোলনের ডাক আসা অত্যন্ত স্বাভাবিক।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *