১১ বছরের প্রতীক্ষার অবসান কি কেবল ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’তে? শতভাগ মূল বেতন বৃদ্ধির জোরালো দাবি
দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের কয়েক লাখ সরকারি কর্মচারী একটি নতুন জাতীয় পে স্কেলের আশায় বুক বেঁধে আছেন। বিশেষ করে নিম্নধাপের কর্মচারীদের জন্য এবারের পে স্কেলটি ছিল অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপট ও সম্ভাব্য বেতন কাঠামোর যে চিত্র সামনে আসছে, তাতে দেখা যাচ্ছে—মূল বেতনের মাত্র আংশিক বা ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা দূর করতে ব্যর্থ হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, মুদ্রাস্ফীতির এই চরম সময়ে সরকারি কর্মচারীদের দাবি অনুযায়ী মূল বেতন (Basic Pay) ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি না করলে প্রস্তাবিত পে স্কেল আদতে কোনো সুফল বয়ে আনবে না।
গাণিতিক সমীকরণে বঞ্চনার চিত্র
একজন ২০তম গ্রেডের কর্মচারীর উদাহরণ দিলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়। ধরি, নতুন ফিক্সেশনের পর একজন কর্মচারীর বেতন ৬,০০০ টাকা বাড়লো। যদি সরকার নতুন পে স্কেলে কেবল ৫০ শতাংশ সুবিধা কার্যকর করে, তবে সেই কর্মচারী বাস্তবে পাবেন মাত্র ৩,০০০ টাকা।
অন্যদিকে, নতুন পে স্কেল ঘোষণার সাথে সাথেই বাজারে যে পরিমাণ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি পরিলক্ষিত হয়, তাতে এই ৩,০০০ টাকা নিমেষেই কর্পূরের মতো উড়ে যাবে। অর্থাৎ, বেতন যেটুকু বাড়লো, বাজারের আগুনে তার চেয়ে বেশি ব্যয় বেড়ে গেল। দিনশেষে কর্মচারীর হাতে উদ্বৃত্ত কিছুই থাকছে না। সাধারণ মানুষের ভাষায় একেই বলা হচ্ছে—‘সেই লাউ সেই কদু’।
কেন ১০০% মূল বেতন বৃদ্ধি জরুরি?
১. মুদ্রাস্ফীতির দাপট: গত কয়েক বছরে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কয়েকগুণ বেড়েছে। ১১ বছর আগে যে বেতন কাঠামো নির্ধারিত হয়েছিল, তা দিয়ে বর্তমানের আকাশছোঁয়া বাজারের সাথে পাল্লা দেওয়া অসম্ভব। ২. দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান: ২০১৫ সালের পর দীর্ঘ ১১ বছর পেরিয়ে গেছে। সাধারণত প্রতি ৫ বছর অন্তর নতুন পে স্কেল আসার কথা থাকলেও এবার কর্মচারীদের অপেক্ষা করতে হয়েছে দ্বিগুণ সময়। এই দীর্ঘ সময়ের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ মেটাতে আংশিক বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। ৩. ১০ম পে স্কেলের পদধ্বনি: বর্তমান গতিধারা বজায় থাকলে ৯ম পে স্কেল পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হতে হতে ১০ম পে স্কেল প্রদানের সময় ঘনিয়ে আসবে। ফলে কর্মচারীরা সবসময়ই সময়ের চেয়ে এক ধাপ পিছিয়ে থাকছেন।
কর্মচারীদের উদ্বেগ ও বর্তমান অবস্থা
সরকারি দপ্তরের নিম্নস্তরের কর্মচারীদের মধ্যে এখন তীব্র হতাশা বিরাজ করছে। তাদের মতে, বিশেষ সুবিধা বা ইনক্রিমেন্টের নামে ছোটখাটো পরিবর্তন না করে সরাসরি মূল বেতন দ্বিগুণ করা সময়ের দাবি। যদি প্রথম ধাপেই সুযোগ-সুবিধা কমিয়ে দেওয়া হয়, তবে নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের জন্য মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও অবশিষ্ট থাকবে না।
উপসংহার
একটি জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। ১১ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর যদি প্রাপ্তি হয় কেবল নামমাত্র বেতন বৃদ্ধি, তবে তা হবে কর্মচারীদের সাথে এক প্রকার পরিহাস। দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে এবং তৃণমূল পর্যায়ের সরকারি সেবা নিশ্চিত করতে বেতন বৈষম্য দূর করে শতভাগ মূল বেতন বৃদ্ধি বাস্তবায়নের বিকল্প নেই।
সরকার কি কর্মচারীদের এই ন্যায্য দাবি বিবেচনা করবে, নাকি কেবল গাণিতিক হিসাবের গ্যাঁড়াকলে বন্দি থাকবে সাধারণ মানুষের ভাগ্য—এখন সেটিই দেখার বিষয়।



