৮ম বেতন কমিশন: ৪০০% পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির বৈপ্লবিক প্রস্তাব, জমা পড়ল একগুচ্ছ দাবি
অষ্টম কেন্দ্রীয় বেতন কমিশন (8th Pay Commission) গঠনের পর থেকেই দেশজুড়ে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী এবং পেনশনভোগীদের মধ্যে প্রত্যাশার পারদ চড়ছে। ২০২৬ সালের মে মাসের শেষলগ্নে এসে এই আলোচনা এক নতুন মোড় নিয়েছে। ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ জয়েন্ট কনসাল্টেটিভ মেশিনারি (NC-JCM) এবং ইন্ডিয়ান রেলওয়ে টেকনিকাল supervisor্স অ্যাসোসিয়েশন (IRTSA)-এর মতো শীর্ষস্থানীয় কর্মী সংগঠনগুলি ইতিমধ্যেই কমিশনের কাছে তাদের বিস্তারিত স্মারকলিপি ও একগুচ্ছ বৈপ্লবিক প্রস্তাব জমা দিয়েছে।
এই প্রস্তাবগুলির মধ্যে সবচেয়ে বেশি সাড়া জাগিয়েছে একটি বিশেষ ফর্মুলা, যা অনুমোদিত হলে শীর্ষস্তরের কর্মকর্তাদের মূল বেতন এক ধাক্কায় প্রায় ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।
৫টি আলাদা ফিটমেন্ট ফ্যাক্টরের দাবি: একনজরে প্রস্তাবিত কাঠামো
সাধারণত পূর্ববর্তী বেতন কমিশনগুলিতে সবার জন্য একটি নির্দিষ্ট ‘ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর’ বা গুণক নির্ধারণ করা হতো (যেমন সপ্তম বেতন কমিশনে এটি ছিল ২.৫৭ গুণ)। তবে এবার IRTSA-এর তরফে পদের দায়িত্ব ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে একটি ৫-স্তরের গ্রেডেড ফিটমেন্ট ফ্যাক্টরের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সংগঠনটির প্রস্তাবিত ফর্মুলা এবং এর ফলে সম্ভাব্য বেতন বৃদ্ধির খতিয়ান নিচে দেওয়া হলো:
| পে-ম্যাট্রিক্স লেভেল | প্রস্তাবিত ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর | বর্তমান আনুমানিক বেসিক | প্রস্তাবিত ফর্মুলায় নতুন বেসিক |
লেভেল ১ থেকে ৫ (এন্ট্রি লেভেল ও জুনিয়র স্টাফ) | ২.৯২ | ₹২০,০০০ | ₹৫৮,৪০০ |
লেভেল ৬ থেকে ৮ (মিড-লেভেল ও টেকনিক্যাল সুপারভাইজার) | ৩.৫০ | ₹৪৫,০০০ | ₹১,৫৭,৫০০ |
লেভেল ৯ থেকে ১২ (সিনিয়র টেকনিক্যাল ও অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ) | ৩.৮০ | — | — |
লেভেল ১৩ থেকে ১৬ (হায়ার ম্যানেজমেন্ট) | ৪.০৯ | ₹১,২০,০০০ | ₹৪,৯০,৮০০ |
লেভেল ১৭ থেকে ১৮ (শীর্ষ আমলা ও সিনিয়র এক্সিকিউটিভ) | ৪.৩৮ | ₹২,৫০,০০0 | ₹১০,৯৫,০০০ |
৪০০% বৃদ্ধির সমীকরণ: প্রস্তাবনা অনুযায়ী, ১৭ ও ১৮ নম্বর লেভেলে থাকা সর্বোচ্চ পদের কর্মকর্তাদের মূল বেতন (Basic Pay) বর্তমানের ২.৫ লাখ টাকা থেকে ৪.৩৮ গুণ বেড়ে প্রায় ১০.৯৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে, যা শতাংশের হিসেবে ৪০০%-এরও বেশি বৃদ্ধি। একই সাথে সর্বনিম্ন মূল বেতন ১৮,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে প্রায় ৬৯,০০০ টাকা করার দাবি জানিয়েছে NC-JCM।
কেন এই বৈপ্লবিক প্রস্তাব?
কর্মী সংগঠনগুলির যুক্তি, বিগত কয়েক বছরে আকাশছোঁয়া মুদ্রাস্ফীতি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বর্তমানের সপ্তম বেতন কমিশনের কাঠামোটি সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে রেলের টেকনিক্যাল ও সেফটি ক্যাটাগরির কর্মচারীদের কাজের ঝুঁকি, অতিরিক্ত শ্রমঘণ্টা এবং জবাবদিহিতার কথা মাথায় রেখে এই বিশেষ বেতন কাঠামোর দাবি তোলা হয়েছে। সংগঠনগুলির মতে, একক ফিটমেন্ট ফ্যাক্টরের কারণে জুনিয়র ও সিনিয়র পদের বেতনের ব্যবধান কমে যাচ্ছিল (Pay Compression), যা এই নতুন ৫-স্তরের ফর্মুলা দূর করতে পারবে।
পুরনো পেনশন স্কিম (OPS) ফেরানোর জোরালো দাবি
বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি এই স্মারকলিপিতে সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে, তা হলো পুরনো পেনশন ব্যবস্থা (OPS) পুনর্বহাল করা।
কর্মী সংগঠনগুলির একটি বড় অংশের দাবি, অবসর জীবনের সামাজিক ও আর্থিক সুরক্ষার জন্য পুরনো পেনশন ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই।
যদিও কিছু সংগঠন বাস্তবতার নিরিখে স্বীকার করেছে যে, জাতীয় পেনশন সিস্টেম (NPS) পুরোপুরি বাতিল করা হয়তো সরকারের পক্ষে কঠিন হতে পারে, তবুও তারা NPS-এর ভেতরেই OPS-এর মতো নিশ্চিত সুরক্ষাকবচ বা গ্যারান্টিযুক্ত পেনশনের দাবি জানিয়েছে।
অন্যান্য উল্লেখযোগ্য দাবি সমূহ:
বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট: বর্তমানের ৩% বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির হার বাড়িয়ে ৫% থেকে ৬% করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
MACP ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ: ৩০ বছরের চাকরি জীবনে ৩টির পরিবর্তে ৫টি আর্থিক পদোন্নতির (৬, ১২, ১৮, ২৪ ও ৩০তম বছরে) দাবি জানানো হয়েছে।
HRA সংশোধন: শহরভিত্তিক বাড়ি ভাড়া ভাতা (HRA) ৩০% থেকে ৪০% পর্যন্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
পরবর্তী ধাপ কী?
অবসরপ্রাপ্ত সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি রঞ্জনা প্রকাশ দেশাইয়ের নেতৃত্বে গঠিত অষ্টম বেতন কমিশন বর্তমানে দেশজুড়ে বিভিন্ন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে (যেমন লাদাখ, শ্রীনগর, লখনউ, ভুবনেশ্বর) গিয়ে কর্মচারী সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রকগুলির সাথে ধারাবাহিক বৈঠক করছে। অনলাইনের মাধ্যমে প্রস্তাব জমা দেওয়ার সময়সীমা ৩১ মে, ২০编制৬ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। কমিশন সমস্ত প্রস্তাব খতিয়ে দেখে ২০২৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে তাদের চূড়ান্ত রিপোর্ট সরকারের কাছে জমা দিতে পারে এবং তা অনুমোদিত হলে ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ভূতাপেক্ষভাবে (Retrospectively) কার্যকর হতে পারে।



