সরকারী চাকুরীতে ‘বিভাগীয় প্রার্থী’ আসলে কারা? স্পষ্ট করল বিধিমালা
সরকারী চাকুরীর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে প্রায়শই একটি শর্ত দেখা যায়—”বিভাগীয় প্রার্থীদের ক্ষেত্রে বয়সসীমা শিথিলযোগ্য” কিংবা “বিভাগীয় প্রার্থীদের জন্য কোটা সংরক্ষিত থাকবে”। কিন্তু এই ‘বিভাগীয় প্রার্থী’ বলতে আসলে কাদের বোঝায়? তারা কি যেকোনো সরকারি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী, নাকি নির্দিষ্ট কোনো দপ্তরের? আবার বিগত বছরগুলোতে ব্যাপকভাবে চালু হওয়া ‘আউটসোর্সিং’ কর্মীরাই বা এই সংজ্ঞায় পড়েন কি না—তা নিয়ে চাকরিপ্রার্থীদের মাঝে রয়েছে নানা জিজ্ঞাসা।
সরকারি চাকুরীর বিধিমালা ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন বিশ্লেষণ করে এ বিষয়ে একটি স্পষ্ট চিত্র পাওয়া গেছে।
১. ‘বিভাগীয় প্রার্থী’র মূল সংজ্ঞা: সংশ্লিষ্ট দপ্তর নাকি যেকোনো সরকারি অফিস?
বাংলাদেশ সরকারের চাকুরীর বিধিমালা অনুযায়ী, বিভাগীয় প্রার্থী বলতে যেকোনো সরকারি অফিসের কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে বোঝায় না।
প্রকৃত নিয়ম: বিভাগীয় প্রার্থী বলতে কেবল ওই নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর বা পরিদপ্তরের (Department) কর্মকর্তা/কর্মচারীদের বোঝায়, যেখানে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশিত হয়েছে। অর্থাৎ, যে নির্দিষ্ট দপ্তরে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, সেই দপ্তরেই যারা ইতিমধ্যে স্থায়ী বা নিয়মিত ভিত্তিতে কর্মরত আছেন, তারাই কেবল ওই বিজ্ঞপ্তির বিপরীতে ‘বিভাগীয় প্রার্থী’ হিসেবে গণ্য হবেন।
২. একই মন্ত্রণালয়ের অন্যান্য দপ্তরের ক্ষেত্রে নিয়ম কী?
অনেকের মনেই প্রশ্ন থাকে, একই মন্ত্রণালয়ের অধীনে অন্য কোনো দপ্তরে চাকুরী করলে বিভাগীয় প্রার্থী হওয়া যাবে কি না?
নিয়ম হলো: যদি কোনো নির্দিষ্ট অধিদপ্তরের (যেমন: প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর) নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি হয়, তবে কেবল ওই অধিদপ্তরের কর্মচারীরাই বিভাগীয় প্রার্থী। একই মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ অন্য কোনো অধিদপ্তর বা বোর্ডের কর্মচারীরা সেখানে বিভাগীয় প্রার্থী হিসেবে সুবিধা পাবেন না।
তবে, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিটি যদি সরাসরি মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব পদের (সচিবালয় কাঠামো) জন্য হয়, এবং নিয়োগ বিধিমালায় উল্লেখ থাকে—তবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ দপ্তরের কর্মচারীরা ক্ষেত্রবিশেষে সুযোগ পেতে পারেন। তবে সাধারণ নিয়ম হলো, বিজ্ঞপ্তি প্রদানকারী নির্দিষ্ট সংস্থাই এর পরিধি নির্ধারণ করে।
৩. আউটসোর্সিং বা চুক্তিভিত্তিক কর্মচারীরা কি বিভাগীয় প্রার্থী?
বিগত সরকারের আমলে চালু হওয়া ‘আউটসোর্সিং’ বা প্রজেক্টের আওতায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া কর্মচারীদের নিয়ে একটি বড় বিতর্ক রয়েছে। অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে একে আধুনিক যুগের “সেবাদাস প্রথা”র সাথে তুলনা করে থাকেন, কারণ এতে চাকুরীর স্থায়ীত্ব বা ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা থাকে না।
আইনি বাস্তবতা:
সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী, আউটসোর্সিং, দৈনিক ভিত্তিক (Daily Basis), মাস্টাররোল কিংবা সম্পূর্ণ অস্থায়ী/প্রকল্পের আওতায় নিয়োজিত কর্মকর্তা বা কর্মচারীরা কোনোভাবেই ‘বিভাগীয় প্রার্থী’ হিসেবে গণ্য হন না।
বিভাগীয় প্রার্থীর সুবিধা পেতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে অবশ্যই রাজস্ব খাতের (Revenue Budget) নিয়মিত বা স্থায়ী পদে কর্মরত থাকতে হবে এবং চাকুরীর নির্দিষ্ট মেয়াদ (সাধারণত ন্যূনতম ২ বছর) পূর্ণ করতে হবে।
তাই আউটসোর্সিংয়ে নিয়োজিত কর্মীরা সংশ্লিষ্ট অফিসে বছরের পর বছর কাজ করলেও, সরাসরি নতুন স্থায়ী নিয়োগের ক্ষেত্রে তারা সাধারণ প্রার্থী হিসেবেই বিবেচিত হবেন, বিভাগীয় প্রার্থী হিসেবে কোনো অতিরিক্ত বয়সসীমা বা কোটার সুবিধা পাবেন না।
এক নজরে বিভাগীয় প্রার্থীর যোগ্যতা:
| বৈশিষ্ট্য | বিভাগীয় প্রার্থী হিসেবে গণ্য হবেন? |
| সংশ্লিষ্ট দপ্তরের স্থায়ী/রাজস্ব খাতের কর্মচারী | হ্যাঁ (সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য) |
| অন্য যেকোনো সরকারি অফিসের নিয়মিত কর্মচারী | না |
| সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আউটসোর্সিং বা প্রজেক্টের কর্মী | না |
| মাস্টাররোল বা দৈনিক ভিত্তিক শ্রমিক | না |
উপসংহার
সার্বিক তথ্যাদি বিশ্লেষণ করে স্পষ্ট যে, সরকারী চাকুরীতে ‘বিভাগীয় প্রার্থী’ হওয়ার প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো—যে দপ্তরে নিয়োগ হচ্ছে, সেই দপ্তরেরই নিয়মিত ও রাজস্বভুক্ত কর্মচারী হওয়া। আউটসোর্সিং বা ভিন্ন দপ্তরের কর্মীদের এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার কোনো আইনগত সুযোগ বর্তমান বিধিমালায় নেই। ফলে নিয়োগ পরীক্ষায় আবেদনের পূর্বে বিজ্ঞপ্তি এবং নিজের চাকুরীর ধরণটি ভালোভাবে যাচাই করে নেওয়া জরুরি।



