সার্ভিস রুলস । নীতি । পদ্ধতি । বিধি

পিআরএল বাতিলের এখতিয়ার কি স্থানীয় অফিস প্রধানের আছে? সরকারি চাকরি বিধি যা বলে

সরকারি চাকরিজীবীদের অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটি বা পিআরএল (PRL) নিয়ে মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন দপ্তরে প্রায়শই জটিলতা ও বিভ্রান্তি তৈরি হতে দেখা যায়। সম্প্রতি এক সরকারি কর্মচারীর জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে পিআরএল-এ যাওয়ার কথা থাকলেও, সংশ্লিষ্ট দপ্তর প্রধান তাকে পিআরএল না দিয়ে আরও এক বছর দায়িত্ব পালন করার মৌখিক নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানা গেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভুক্তভোগী কর্মচারী ও প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

সরকারি চাকরি বিধিমালা ও প্রশাসনিক আইন বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, কোনো স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বা অফিস প্রধানের একক সিদ্ধান্তে কোনো কর্মচারীর পিআরএল বাতিল বা স্থগিত করে তাকে কর্মস্থলে রেখে দেওয়ার কোনো আইনি সুযোগ নেই।

বয়স ৫৯ বছর হলে পিআরএল বাধ্যতামূলক

নির্ধারিত ছুটি বিধিমালা ও সরকারি চাকুরি আইন অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বয়স ৫৯ বছর (এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষেত্রে ৬০ বছর) পূর্ণ হওয়ার পরদিন থেকে তিনি বাধ্যতামূলকভাবে অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটি বা পিআরএল-এ যাবেন। সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে এই ছুটি প্রাপ্তির নির্দিষ্ট সময় আগে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করতে হয়। স্থানীয় কোনো কর্তৃপক্ষের এই বিধিমালার বাইরে গিয়ে ছুটি আটকে রাখা বা বাতিল করার কোনো এখতিয়ার নেই।

আইন কী বলে? (সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮)

প্রশাসনিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৯ ধারা মোতাবেক শুধুমাত্র মহামান্য রাষ্ট্রপতি জনস্বার্থে কোনো কর্মচারীর অবসর গ্রহণের পর তার পিআরএল বাতিল করে তাকে ‘চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ’ দিতে পারেন।

যদি কোনো অফিসে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে, সংশ্লিষ্ট কর্মচারী ছাড়া ওই কাজ করার মতো বিকল্প কোনো দক্ষ জনবল নেই, তবে দাপ্তরিক কাজের সুবিধার্থে কর্তৃপক্ষ তাকে রাখতে পারেন। তবে তা অবশ্যই সুনির্দিষ্ট পরিপত্র ও প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ‘চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ’ হিসেবে কার্যকর হতে হবে। এই ক্ষেত্রে ওই কর্মচারী সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সমন্বিত বা সর্বসাকুল্যে অতিরিক্ত বেতন-ভাতা প্রাপ্য হবেন। তবে এই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ সব জায়গায় বা সব পদের জন্য ঢালাওভাবে প্রযোজ্য নয়।

লিখিত আদেশ ছাড়া দায়িত্ব পালনের ভয়াবহ ঝুঁকি

প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, কোনো বৈধ অফিস আদেশ বা লিখিত চুক্তিপত্র ছাড়া শুধুমাত্র উর্ধ্বতন কর্মকর্তার মৌখিক অনুরোধে পিআরএল-এর সময়ে কাজ চালিয়ে যাওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

  • আর্থিক ক্ষতি ও আইনি জটিলতা: যথাসময়ে নিয়মতান্ত্রিকভাবে পিআরএল-এ না গেলে পরবর্তীতে পেনশন, গ্র্যাচুইটিসহ অবসরকালীন আর্থিক সুবিধা (লাভেমূলে সব) প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বড় ধরনের আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।

  • মামলা ও অডিট আপত্তি: বিধি বহির্ভূতভাবে কর্মস্থলে উপস্থিত থেকে সরকারি নথিপত্রে স্বাক্ষর করলে তা পরবর্তীতে বিভাগীয় মামলা বা অডিট আপত্তির কারণ হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ: যদি কোনো উর্ধ্বতন কর্মকর্তা জরুরি দাপ্তরিক প্রয়োজনে কাজ করাতেই চান, তবে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর নিজের আইনি সুরক্ষার স্বার্থে অবশ্যই ওই কর্মকর্তার কাছ থেকে স্মারক নম্বর সম্বলিত একটি স্পষ্ট ‘অফিস আদেশ’ (Office Order) লিখিতভাবে চেয়ে নিতে হবে। মুখে মুখে বা অলিখিতভাবে কোনো দায়িত্ব পালন করা সমীচীন হবে না।

সচেতন মহলের মিশ্র প্রতিক্রিয়া

বিষয়টি নিয়ে সামাজিক ও প্রশাসনিক ফোরামে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। প্রবীণ কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, পিআরএল মানেই হলো অবসরের প্রস্তুতি। এই সময়ে জোরপূর্বক কাজ করানো বা বিধি না জেনে ছুটি আটকে রাখা প্রশাসনিক অজ্ঞতার শামিল। আইন না জেনে যারা এমন সিদ্ধান্ত নেন, তারা এই পদের যোগ্য নন। ব্যক্তিত্বসম্পন্ন কোনো কর্মচারীর উচিত নয় লিখিত ও বৈধ আদেশ ছাড়া পিআরএল-এর সময়ে অফিসে কাজ করা।

তবে অন্য একটি পক্ষের মতে, অনেক সময় স্থানীয় অফিসগুলোতে তীব্র জনবল সংকট থাকে। সে ক্ষেত্রে কাজের গতি সচল রাখতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ আন-অফিসিয়ালি বা অনানুষ্ঠানিকভাবে অভিজ্ঞ কর্মচারীকে থেকে যাওয়ার অনুরোধ করেন। তবে এটি পুরোপুরি পারস্পরিক সমঝোতার বিষয়, যার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক আইনগত ভিত্তি নেই।

সার্বকুল্যে সিদ্ধান্ত: আইন অনুযায়ী, আগামী জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে ওই কর্মচারীর বয়স ৫৯ বছর পূর্ণ হলে তিনি পিআরএল-এ যাবেন এটাই বিধি। অফিস প্রধান চাইলেই তার পিআরএল বাতিল করতে পারেন না। দাপ্তরিক প্রয়োজনে তাকে রাখতে হলে সরকারি বিধি মোতাবেক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে হবে, অন্যথায় নিয়মতান্ত্রিকভাবে তাকে বিদায় দেওয়াই আইনের বিধান।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *