৯ম পে স্কেল নিউজ ২০২৬

২ বছরের মধ্যে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রস্তাব, মন্ত্রিসভার অনুমোদনের অপেক্ষা

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের পরিকল্পনা এখন মন্ত্রিসভার অনুমোদনের অপেক্ষায়। মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বাধীন সচিবদের কমিটি নবম পে-স্কেলের খসড়া প্রস্তাবনা নীতিগতভাবে চূড়ান্ত করেছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই থেকেই নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়ন ধরা হবে এবং ধাপে ধাপে পুরো পে-স্কেল বাস্তবায়ন শেষ করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে ২০২৮ সালের জানুয়ারির মধ্যে।

সচিবদের কমিটির সাম্প্রতিক বৈঠকে খসড়া প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে ঠিক কতটি ধাপে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা হবে, সেই সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত মন্ত্রিসভাই নেবে।

সচিবদের কমিটির এক সদস্যের বরাত দিয়ে দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছে, প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুত করা হলেও বাস্তবায়নের ধাপসংখ্যা এখনো চূড়ান্ত নয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তাও একই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

জুলাই থেকেই আংশিক বাস্তবায়নের প্রস্তাব

নবম পে-স্কেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো এর বাস্তবায়ন সময়সূচি। প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই থেকে নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়ন কার্যকর হিসেবে ধরা হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে বেতন ও সংশ্লিষ্ট সুবিধাগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০২৮ সালের জানুয়ারির মধ্যে পুরো প্রক্রিয়া শেষ করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে।

অর্থাৎ, পুরো পে-স্কেল একসঙ্গে কার্যকর না করে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির চাপ সরকারি কোষাগারে ধাপে ধাপে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতে একদিকে কর্মচারীরা নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পাবেন, অন্যদিকে সরকারের ওপর তাৎক্ষণিক বড় ধরনের আর্থিক চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।

তবে বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট ধাপ, কোন পর্যায়ে কোন গ্রেডের বেতন কতটা বাড়বে এবং কোন সুবিধা কখন কার্যকর হবে—এসব বিষয়ে মন্ত্রিসভার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হবে।

নিম্ন গ্রেডে বেশি বেতন বৃদ্ধির সম্ভাবনা

নবম পে-স্কেলের খসড়া প্রস্তাব তৈরির ক্ষেত্রে নিম্ন গ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের তুলনামূলক বেশি সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

অর্থ বিভাগ গত ২৬ জুলাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নবম পে-স্কেল সংক্রান্ত বিষয় অবহিত করে। ওই আলোচনা ও নির্দেশনার ভিত্তিতেই পরবর্তী সময়ে সচিবদের কমিটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব তৈরি করেছে বলে জ্যেষ্ঠ দুই সরকারি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছে।

আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং বর্তমান বেতনের সঙ্গে দৈনন্দিন খরচের সামঞ্জস্যের বিষয়টি। ফলে উচ্চ গ্রেডের তুলনায় নিম্ন গ্রেডে বেতন বৃদ্ধির হার বেশি রাখার একটি নীতিগত প্রবণতা খসড়া পরিকল্পনায় প্রতিফলিত হয়েছে।

এর আগে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে নবম পে-স্কেলে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর বিভিন্ন প্রস্তাবের কথা উঠে এসেছে। তবে কোন প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত কার্যকর হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

নিম্ন গ্রেডের বেতন একবারে বাড়ানোর পরামর্শ

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়া নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন ধাপে ধাপে না বাড়িয়ে একবারে ১০০ শতাংশ বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছেন।

তার মতে, উচ্চ গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বেতনের পাশাপাশি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন। কিন্তু নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের আর্থিক সংকট তুলনামূলক বেশি। তাই নতুন পে-স্কেল প্রণয়নের সময় নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

তিনি মনে করেন, উচ্চ গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন তাৎক্ষণিকভাবে না বাড়ালেও তাতে বড় ধরনের সমস্যা হবে না। বরং সীমিত সরকারি সম্পদ ব্যবহার করে নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধিতে বেশি গুরুত্ব দিলে বৈষম্য কমানো সম্ভব হতে পারে।

বিচার বিভাগের বেতন কাঠামো নিয়ে জটিলতা

নবম পে-স্কেল চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়ায় বিচার বিভাগের কর্মচারীদের বেতন কাঠামো নিয়ে কিছু জটিলতা দেখা দিয়েছে বলেও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একটি সূত্র জানিয়েছে।

এই জটিলতা নিরসনের জন্য গত ৬ আগস্ট অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির মূল দায়িত্ব হচ্ছে বিচার বিভাগের কর্মচারীদের পে-স্কেল সংক্রান্ত বিষয় পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ দেওয়া।

আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে অর্থ মন্ত্রণালয়ে এ কমিটির বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। কমিটির সুপারিশ পাওয়ার পর নবম পে-স্কেলের চূড়ান্ত খসড়া মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের পথ আরও পরিষ্কার হবে।

মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ

সচিবদের কমিটি খসড়া প্রস্তাবনা নীতিগতভাবে চূড়ান্ত করলেও এটিই এখনো চূড়ান্ত পে-স্কেল নয়। মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের পর প্রস্তাবের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হতে পারে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তনও আসতে পারে।

বিশেষ করে বাস্তবায়নের ধাপসংখ্যা, নিম্ন ও উচ্চ গ্রেডের বেতন বৃদ্ধির হার, বাস্তবায়নের সময়সূচি এবং বিচার বিভাগের কর্মচারীদের বেতন কাঠামো—এসব বিষয়ে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

মন্ত্রিসভা অনুমোদন দিলে পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আর্থিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে।

সরকারি কর্মচারীদের প্রত্যাশা

দীর্ঘদিন ধরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নবম পে-স্কেল নিয়ে ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। ২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার পর জীবনযাত্রার ব্যয়, খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে বর্তমান বেতন কাঠামো দিয়ে নিম্ন আয়ের সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে—এমন দাবি দীর্ঘদিনের।

সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে নবম পে-স্কেলে মূল বেতন বৃদ্ধি, নিম্ন গ্রেডকে অগ্রাধিকার, পেনশন ও বিভিন্ন ভাতা পুনর্নির্ধারণসহ একাধিক প্রস্তাবের কথা এসেছে। তবে এসব প্রস্তাবের সবগুলো চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হয়েছে—এমন তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।

দুই বছরের বাস্তবায়ন পরিকল্পনায় নজর

সব মিলিয়ে নবম পে-স্কেলের ক্ষেত্রে সরকারের সামনে এখন দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। প্রথমত, বিচার বিভাগের বেতন কাঠামো সংক্রান্ত জটিলতা নিরসন করে চূড়ান্ত খসড়া প্রস্তুত করা। দ্বিতীয়ত, মন্ত্রিসভায় সেই খসড়া উপস্থাপন করে অনুমোদন নেওয়া।

প্রস্তাব অনুযায়ী ২০২৬ সালের জুলাই থেকে আংশিক বাস্তবায়ন শুরু করে ২০২৮ সালের জানুয়ারির মধ্যে পুরো পে-স্কেল বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ফলে মন্ত্রিসভা যদি প্রস্তাবটি অনুমোদন করে, তাহলে প্রায় দুই বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের পথ খুলে যেতে পারে।

তবে চূড়ান্তভাবে সরকারি কর্মচারীরা কত টাকা বেতন পাবেন, কোন গ্রেডে কত শতাংশ বৃদ্ধি হবে এবং কোন তারিখ থেকে কোন সুবিধা কার্যকর হবে—এসব বিষয়ে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত ও পরবর্তী সরকারি প্রজ্ঞাপনই হবে শেষ কথা।

সুতরাং, নবম পে-স্কেল এখন আর শুধু প্রস্তাব তৈরির পর্যায়ে নেই; বরং বাস্তবায়নের রূপরেখা চূড়ান্ত করে তা মন্ত্রিসভার অনুমোদনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *