ভ্রমণ ভাতা I অধিকাল ভাতা

সরকারি বিদেশ ভ্রমণ ভাতা পুনর্নির্ধারণ : কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন নির্দেশনা জারি হয়েছে কি?

সরকারি কাজে বিদেশ সফরে কর্মকর্তা-কর্মচারী, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও অন্যান্য প্রতিনিধিদের জন্য বৈদেশিক মুদ্রায় প্রাপ্য ভ্রমণ ভাতা, হোটেল ভাড়া, নগদ ভাতা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পুনর্নির্ধারণ করে বিস্তারিত নির্দেশনা জারি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ। বিশ্বব্যাপী জীবনযাত্রার ব্যয়, বিশেষ করে হোটেল ভাড়া, খাদ্য, পরিবহন ও অন্যান্য দৈনন্দিন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকার এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

নতুন নির্দেশনায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ভ্রমণকারীদের বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগ করে তাদের জন্য পৃথক ভাতার হার নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে তিনটি গ্রুপে ভাগ করে গ্রুপভিত্তিক ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা নির্ধারণ করা হয়েছে।

দেশভিত্তিক তিনটি গ্রুপ

সরকার বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে দেশগুলোকে তিনটি গ্রুপে ভাগ করেছে।

গ্রুপ-১-এ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতারসহ ইউরোপ, ওশেনিয়া এবং উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার অধিকাংশ দেশ।

গ্রুপ-২-এ রয়েছে ভারত, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, মালদ্বীপ, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিশরসহ আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ।

গ্রুপ-৩-এ রাখা হয়েছে নেপাল, ভিয়েতনাম, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, আফগানিস্তান এবং এশিয়ার অন্যান্য দেশসমূহ।

বিশেষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য বাড়তি সুবিধা

জাতীয় সংসদের স্পিকার, প্রধান বিচারপতি, মন্ত্রিসভার সদস্য, ডেপুটি স্পিকার এবং সমমর্যাদার ব্যক্তিদের জন্য বিদেশে অবস্থানকালে মডারেট স্যুটে থাকার সুযোগসহ পৃথক হোটেল ভাড়া ও নগদ ভাতার হার নির্ধারণ করা হয়েছে।

গ্রুপ-১ভুক্ত দেশে সফরের ক্ষেত্রে স্পিকার ও প্রধান বিচারপতি দৈনিক সর্বোচ্চ ৫৬০ মার্কিন ডলার হোটেল ভাড়া এবং ১২৭ ডলার নগদ ভাতা পাবেন। অন্যদিকে মন্ত্রিসভার সদস্যরা পাবেন দৈনিক ৪২০ ডলার হোটেল ভাড়া ও ১২৭ ডলার নগদ ভাতা।

এছাড়া বিশেষ পর্যায়ভুক্ত ব্যক্তিরা চাইলে হোটেলভিত্তিক সুবিধার পরিবর্তে দৈনিক সর্বসাকুল্যে ২৫২ মার্কিন ডলার পর্যন্ত ভাতা গ্রহণ করতে পারবেন।

সাধারণ কর্মকর্তাদের জন্য নতুন ভাতা কাঠামো

সাধারণ পর্যায়ভুক্ত কর্মকর্তাদের জন্যও গ্রুপভেদে হোটেল ভাড়া ও নগদ ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছে।

গ্রুপ-১ দেশের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পর্যায়ের সাধারণ কর্মকর্তারা দৈনিক ২৮০ ডলার পর্যন্ত হোটেল ভাড়া এবং ১০১ ডলার নগদ ভাতা পাবেন। অন্য পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্যও পৃথক হার নির্ধারণ করা হয়েছে।

তারা চাইলে হোটেলভিত্তিক ভাতার পরিবর্তে সর্বসাকুল্যে দৈনিক ২০২ ডলার পর্যন্ত ভাতা গ্রহণ করতে পারবেন। বিদেশে অবস্থানের সময় আহার, বাসস্থান ও আনুষঙ্গিক খরচ এই ভাতার মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানে ভাতা কমবে

কোন কর্মকর্তা বা কর্মচারী বিদেশে ২০ রাতের বেশি অবস্থান করলে ২০ রাতের পরবর্তী সময়ের জন্য দৈনিক ভাতার ওপর ১০ শতাংশ কর্তন হবে। অবস্থানকাল ৪০ রাত অতিক্রম করলে ৪০ রাতের পরবর্তী সময়ের জন্য ভাতা ১৫ শতাংশ হারে কমে যাবে।

রাষ্ট্রীয় অতিথিদের জন্য বিশেষ সুবিধা

যেসব কর্মকর্তা বা প্রতিনিধি বিদেশে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে সফর করবেন এবং যাদের আহার ও বাসস্থানের ব্যয় সংশ্লিষ্ট বিদেশি সরকার বা সংস্থা বহন করবে, তারা নির্ধারিত হারে ‘পকেট ভাতা’ পাবেন।

স্পিকার, প্রধান বিচারপতি ও মন্ত্রিসভার সদস্যরা প্রতি রাত্রিযাপনের জন্য ৮৭ মার্কিন ডলার পকেট ভাতা পাবেন। অন্যদিকে সাধারণ পর্যায়ভুক্ত কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট দেশের জন্য নির্ধারিত সর্বসাকুল্য ভাতার ৩০ শতাংশ হারে পকেট ভাতা পাবেন।

ট্রানজিট ভাতা ও টার্মিনাল চার্জ

বিদেশ সফরের পথে ট্রানজিটে অবস্থানের জন্য কর্মকর্তারা পৃথক ট্রানজিট ভাতা পাবেন। সাধারণ পর্যায়ের কর্মকর্তারা নির্ধারিত সর্বসাকুল্য ভাতার ২৫ শতাংশ হারে ট্রানজিট ভাতা গ্রহণ করতে পারবেন। এছাড়া বিমানবন্দর, রেলস্টেশন বা যাতায়াতসংক্রান্ত আনুষঙ্গিক খরচের জন্য নির্ধারিত সর্বসাকুল্য ভাতার ১০ শতাংশ পর্যন্ত টার্মিনাল চার্জ পাওয়ার সুযোগ থাকবে।

বিমান ভ্রমণের শ্রেণি নির্ধারণ

নির্দেশনায় বিদেশ সফরে সরকারি ব্যয়ে বিমান ভ্রমণের ক্ষেত্রেও শ্রেণি নির্ধারণ করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, প্রধান বিচারপতি, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং বাহিনী প্রধানদের মতো উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা প্রথম শ্রেণিতে ভ্রমণ করতে পারবেন। অন্যদিকে সচিব, সংসদ সদস্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ নির্ধারিত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বিজনেস বা এক্সিকিউটিভ শ্রেণিতে ভ্রমণের সুযোগ পাবেন।

হিসাব-নিকাশ ও জবাবদিহিতার ওপর জোর

নতুন নির্দেশনায় বিদেশ সফরের জন্য প্রাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবহার ও হিসাব-নিকাশের ক্ষেত্রে কঠোর জবাবদিহিতার বিধান রাখা হয়েছে। সফর শেষে উদ্বৃত্ত অর্থ ফেরত দিতে হবে এবং নির্ধারিত সময়ে হিসাব সমন্বয় না করলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সারসংক্ষেপ

অর্থ বিভাগের এই নির্দেশনার মাধ্যমে সরকারি বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে ভাতা, হোটেল সুবিধা, ট্রানজিট ব্যয় ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা আধুনিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে কঠোর হিসাব ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিতার বিধানও জোরদার করা হয়েছে।

সোর্স

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *