আইবাস++ । পে ফিক্সেশন । ই-ফাইলিং

বাংলা QR-এর মার্চেন্ট ফি ৪ টাকা করার দাবি: ব্র্যাক ব্যাংকের ছাড় কি দেখাচ্ছে কমানো সম্ভব?

বাংলাদেশে ডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে ‘বাংলা QR’ ব্যবস্থা চালু হলেও মার্চেন্টদের কাছ থেকে নেওয়া সেবা ফি বা Merchant Discount Rate (MDR) নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি ব্র্যাক ব্যাংকের একটি প্রচারপত্রে বাংলা QR-এর মাধ্যমে মার্চেন্ট লেনদেনে বিশেষ ছাড়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এতে দেখা যাচ্ছে, ৫ আগস্ট ২০২৬ থেকে বাংলা QR-এর সব লেনদেনের মার্চেন্ট সার্ভিস ফি (MSF) ০.৮০ শতাংশ করা হয়েছে এবং অফারটি পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন—প্রচারপত্রে ০.৮০ শতাংশ লেখা আছে, অর্থাৎ প্রতি ১ হাজার টাকায় ফি ৮ টাকা। এটি ৪ টাকা নয়। ৪ টাকা ফি হলে হার হতে হবে ০.৪০ শতাংশ

অন্যদিকে, বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত কাঠামোয় বাংলা QR লেনদেনের ন্যূনতম MDR ১ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে সাধারণ হারে ১ হাজার টাকার লেনদেনে মার্চেন্টের কাছ থেকে প্রায় ১০ টাকা কাটা হয়।

ব্র্যাক ব্যাংকের ০.৮০ শতাংশ ছাড়ে কী বোঝা যাচ্ছে?

ব্র্যাক ব্যাংকের এই উদ্যোগটি মূলত একটি প্রমোশনাল ক্যাম্পেইন। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনাতেও ব্যাংক ও অধিগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ডিজিটাল লেনদেন উৎসাহিত করার জন্য নিজস্ব প্রচারণার মাধ্যমে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।

অর্থাৎ নিয়মিত MDR ১ শতাংশ হলেও কোনো ব্যাংক নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নিজের ব্যবসায়িক কৌশল অনুযায়ী কম ফি নিতে পারে। ব্র্যাক ব্যাংকের ০.৮০ শতাংশের অফার তারই একটি উদাহরণ।

হিসাবটি খুব সহজ।

  • ১,০০০ টাকা লেনদেনে ১% ফি = ১০ টাকা
  • ১,০০০ টাকা লেনদেনে ০.৮০% ফি = ৮ টাকা
  • মার্চেন্টের সাশ্রয় = ২ টাকা

আর যদি MDR ০.৪০ শতাংশ করা হয়, তাহলে—

  • ১,০০০ টাকা লেনদেনে ফি = ৪ টাকা
  • বর্তমান ১ শতাংশের তুলনায় সাশ্রয় = ৬ টাকা

এ কারণেই ব্যবসায়ী ও মার্চেন্টদের মধ্যে প্রশ্ন উঠছে—একটি ব্যাংক যদি বিশেষ প্রচারণার আওতায় কম হারে সেবা দিতে পারে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে পুরো বাজারের জন্য কম MDR নির্ধারণ করা যায় কি না।

তাহলে সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক ০.৪০ শতাংশ নির্ধারণ করছে না কেন?

এখানে বিষয়টি শুধু ‘ব্যাংক কত টাকা নিচ্ছে’—এতটা সরল নয়। একটি বাংলা QR লেনদেনের পেছনে রয়েছে ব্যাংক, কার্ড নেটওয়ার্ক, MFS, PSP, NPSB এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর বিভিন্ন পর্যায়ের খরচ। MDR-এর মধ্যে এসব সেবার পরিচালন ব্যয়, প্রযুক্তি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর রাজস্বের বিষয় জড়িত।

বাংলাদেশ ব্যাংক ১ জুলাই ২০২৬ থেকে বাংলা QR-এর মার্চেন্ট পেমেন্টে ন্যূনতম ১ শতাংশ MDR নির্ধারণ করেছে। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ হার ১.১৫ শতাংশ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের যুক্তির একটি অংশ হলো—একটি নির্দিষ্ট মূল্য কাঠামো তৈরি হলে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাকে বাণিজ্যিকভাবে টেকসই রাখা সহজ হবে। ব্যাংকারদের মতে, নির্দিষ্ট ফ্লোর ও সিলিং থাকলে বাজারে মূল্য নির্ধারণ আরও পূর্বানুমানযোগ্য হয়।

কিন্তু প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে

এখানেই মূল বিতর্ক।

বাংলাদেশ ব্যাংক যদি ডিজিটাল অর্থনীতি, ক্যাশলেস লেনদেন এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করতে চায়, তাহলে MDR যত কম হবে, মার্চেন্টদের জন্য ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণের প্রণোদনা তত বাড়তে পারে—এমন যুক্তি রয়েছে।

বিশেষ করে ক্ষুদ্র দোকানদারদের ক্ষেত্রে ১ শতাংশ ফি ছোট মনে হলেও বিপুল পরিমাণ লেনদেনের ক্ষেত্রে এটি উল্লেখযোগ্য ব্যয় হয়ে দাঁড়ায়। যেমন কোনো ব্যবসায়ী মাসে ১০ লাখ টাকা বাংলা QR-এর মাধ্যমে বিক্রি করলে ১ শতাংশ হারে তার MDR দাঁড়ায় প্রায় ১০ হাজার টাকা। একই লেনদেনে ০.৮০ শতাংশ হলে খরচ হবে ৮ হাজার টাকা। আর ০.৪০ শতাংশ হলে তা নেমে আসবে মাত্র ৪ হাজার টাকায়

অর্থাৎ MDR কমানোর প্রভাব শুধু একটি লেনদেনের ওপর নয়; পুরো ব্যবসার মাসিক ব্যয়ের ওপর পড়ে।

বাধ্যতামূলক বাংলা QR ব্যবহারের সঙ্গে কম ফি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের মার্চেন্ট পয়েন্টগুলোতে নিজস্ব বা প্রোপ্রাইটারি QR-এর পরিবর্তে বাংলা QR ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে। এর লক্ষ্য হলো একটি আন্তঃসংযুক্ত ও সহজ ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা তৈরি করা।

জুলাই ২০২৬ থেকে বাংলা QR ব্যবহারে ১ শতাংশ MDR নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে অসন্তোষের কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বিশেষ করে ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য এই ব্যয় ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণে নিরুৎসাহ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

তাই একদিকে যখন সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক নগদবিহীন অর্থনীতি গড়ে তুলতে চাইছে, অন্যদিকে মার্চেন্টদের ওপর অতিরিক্ত লেনদেন ব্যয় চাপিয়ে দিলে সেই লক্ষ্য অর্জনে কিছুটা বাধা তৈরি হতে পারে।

সরকার চাইলে কি ০.৪০ শতাংশ করতে পারে?

নীতিগতভাবে MDR কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব। তবে সরাসরি ১ শতাংশ থেকে ০.৪০ শতাংশে নামিয়ে দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক, MFS, PSP ও পেমেন্ট অবকাঠামোর প্রকৃত খরচ বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলে কয়েকটি বিকল্প বিবেচনা করতে পারে—

১. ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য আলাদা MDR:
নির্দিষ্ট মাসিক লেনদেন সীমার নিচে থাকা ক্ষুদ্র মার্চেন্টদের জন্য ০.৪০ বা ০.৫০ শতাংশের মতো কম হার নির্ধারণ করা যেতে পারে।

২. বড় ব্যবসার জন্য আলাদা হার:
বড় ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি MDR রেখে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য কম হার নির্ধারণ করা সম্ভব হতে পারে।

৩. সরকারি প্রণোদনা:
ডিজিটাল লেনদেন বৃদ্ধির স্বার্থে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সরকার বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ভর্তুকি দিলে মার্চেন্টের ওপর ফি কম রাখা সম্ভব হতে পারে।

৪. লেনদেনের পরিমাণ বাড়িয়ে খরচ কমানো:
ডিজিটাল লেনদেন ব্যাপকভাবে বাড়লে একই অবকাঠামোগত খরচের বিপরীতে বেশি লেনদেন পরিচালনা করা সম্ভব হবে। এতে দীর্ঘমেয়াদে প্রতি লেনদেনের খরচ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ব্র্যাক ব্যাংকের অফার থেকে যে বার্তা পাওয়া যায়

ব্র্যাক ব্যাংকের ০.৮০ শতাংশের ক্যাম্পেইনকে সরাসরি প্রমাণ হিসেবে দেখানো যাবে না যে ০.৪০ শতাংশ MDR-ই সবার জন্য অর্থনৈতিকভাবে টেকসই। কারণ এটি একটি ব্যাংকের নির্দিষ্ট সময়ের প্রচারণা এবং তাদের নিজস্ব ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত।

তবে এই অফারটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—যদি প্রতিযোগিতামূলক বাজারে একটি ব্যাংক সাময়িকভাবে ১ শতাংশের নিচে গিয়ে মার্চেন্টদের সুবিধা দিতে পারে, তাহলে জাতীয় ডিজিটাল পেমেন্ট নীতিতে আরও কম MDR নির্ধারণের সম্ভাবনা কতটা?

বিশেষ করে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র দোকানদার, উদ্যোক্তা ও অনলাইন ব্যবসায়ীদের জন্য এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ।

শেষ কথা

বাংলা QR-এর উদ্দেশ্য শুধু QR কোড চালু করা নয়; এর মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত কম খরচে, নিরাপদ ও সহজ ডিজিটাল লেনদেন নিশ্চিত করা। তাই মার্চেন্টদের জন্য MDR কমানোর দাবি একেবারে অযৌক্তিক নয়। তবে ১ শতাংশ থেকে সরাসরি ০.৪০ শতাংশে নামানোর আগে পুরো পেমেন্ট ইকোসিস্টেমের ব্যয় কাঠামো, ব্যাংক ও পেমেন্ট প্রতিষ্ঠানের টেকসই আয় এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের স্বার্থ—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

আর ব্র্যাক ব্যাংকের বর্তমান প্রচারণার ক্ষেত্রে সঠিক তথ্য হলো ০.৮০ শতাংশ বা প্রতি ১ হাজারে ৮ টাকা—৪ টাকা নয়। তবে এই ৮ টাকার হারও প্রচলিত ১০ টাকার তুলনায় কম হওয়ায় প্রশ্নটি আরও জোরালো হচ্ছে: বাংলা QR-এর মার্চেন্ট ফি কি ভবিষ্যতে সবার জন্য আরও কমিয়ে আনা সম্ভব?

সোর্স

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *