৯ম পে স্কেলে ব্লক পদে ৮+৬+৮ বছরে তিন উচ্চতর গ্রেড—কতটা বাস্তব, কী পরিবর্তন হতে পারে?
সরকারি চাকরিতে দীর্ঘদিন একই পদে কাজ করেও পদোন্নতির সুযোগ না পাওয়া কর্মচারীদের জন্য উচ্চতর গ্রেডের সময়সীমা ও সংখ্যা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ব্লক পদে কর্মরতদের জন্য ৮+৬+৮ বছর—অর্থাৎ চাকরির ৮, ১৪ ও ২২ বছর পূর্তিতে তিনটি উচ্চতর গ্রেড দেওয়ার একটি কাঠামো নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।
তবে শুরুতেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—৮+৬+৮ কাঠামোকে এই মুহূর্তে ৯ম জাতীয় পে-স্কেল ২০২৬-এর চূড়ান্ত সরকারি বিধান হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। ৩১ আগস্ট ২০২৬ মন্ত্রিসভা নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন করেছে; কিন্তু উচ্চতর গ্রেডের সময়সীমা নিয়ে প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ২০১৫ সালের ১০+৬ বছরের ব্যবস্থা বহাল রাখার উদ্যোগের কথাও এসেছে।
ব্লক পদে সমস্যাটা কোথায়?
সরকারি চাকরিতে কিছু পদ এমন, যেখান থেকে নিয়মিতভাবে পরবর্তী পদে পদোন্নতির সুযোগ সীমিত বা নেই। এ ধরনের পদকে সাধারণভাবে ব্লক পদ বলা হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিটিজেন চার্টারেও চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ-২০১৫ অনুযায়ী ব্লক পদ ঘোষণার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।
ফলে একজন কর্মচারী একই পদে ১৫, ২০ কিংবা ২৫ বছর চাকরি করলেও তাঁর দায়িত্ব ও অভিজ্ঞতা বাড়লেও পদোন্নতির মাধ্যমে বেতন-গ্রেডে অগ্রগতির সুযোগ নাও থাকতে পারে।
এই বাস্তবতার কারণেই উচ্চতর গ্রেডকে ব্লক পদধারীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক অগ্রগতির ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হয়।
২০১৫ সালের নিয়মে কী ছিল?
জাতীয় বেতন স্কেল-২০১৫-এর বিধান অনুযায়ী, কোনো স্থায়ী কর্মচারী পদোন্নতি ছাড়া একই পদে ১০ বছর সন্তোষজনকভাবে চাকরি করলে ১১তম বছরে প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার বিধান রয়েছে।
এরপর প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার পর আরও ৬ বছর একই পদে থেকে পদোন্নতি না হলে সপ্তম বছরে দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে এই ব্যবস্থায় তৃতীয় উচ্চতর গ্রেডের সুযোগ নেই। সরকারি গেজেটেও ১০ বছর পূর্তিতে ১ম উচ্চতর গ্রেড দেওয়ার উদাহরণ পাওয়া যায়।
অর্থাৎ প্রচলিত কাঠামোটি মূলত—
১০ বছর → ১ম উচ্চতর গ্রেড
আরও ৬ বছর → ২য় উচ্চতর গ্রেড
ফলে চাকরির ১৬ বছর পূর্তির পর দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়া সম্ভব হলেও এরপর একই পদে থাকলে আর তৃতীয় উচ্চতর গ্রেডের সুযোগ থাকে না।
প্রস্তাবিত ৮+৬+৮ কাঠামো কী?
আলোচনায় থাকা ৮+৬+৮ কাঠামোকে সহজভাবে দেখলে দাঁড়ায়—
| চাকরির মেয়াদ | সম্ভাব্য সুবিধা |
|---|---|
| ৮ বছর পূর্তি | ১ম উচ্চতর গ্রেড |
| ১৪ বছর পূর্তি | ২য় উচ্চতর গ্রেড |
| ২২ বছর পূর্তি | ৩য় উচ্চতর গ্রেড |
অর্থাৎ প্রথম ধাপে ৮ বছর, দ্বিতীয় ধাপে আরও ৬ বছর এবং তৃতীয় ধাপে আরও ৮ বছর।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—৮ বছর পূর্তির পর ৯ম বছরে প্রথম উচ্চতর গ্রেড কার্যকর করার কথা বলা হচ্ছে। একইভাবে ১৪ বছর পূর্তির পর ১৫তম বছরে দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড এবং ২২ বছর পূর্তির পর ২৩তম বছরে তৃতীয় উচ্চতর গ্রেড কার্যকর হওয়ার ধারণাটি প্রযোজ্য হতে পারে—যদি চূড়ান্ত বিধানে এভাবেই লেখা থাকে।
তাহলে ১০ ও ১৬ বছরের পরিবর্তে ৮ ও ১৪ বছর কেন গুরুত্বপূর্ণ?
এখানেই ব্লক পদধারী কর্মচারীদের জন্য সবচেয়ে বড় পার্থক্য।
বর্তমান ২০১৫ কাঠামোতে প্রথম উচ্চতর গ্রেড পেতে ১০ বছর অপেক্ষা করতে হয়। অর্থাৎ ৮ বছরের চাকরির পরও কর্মচারীকে আরও দুই বছর অপেক্ষা করতে হয়।
প্রস্তাবিত ৮ বছরের কাঠামো হলে সেই অপেক্ষা কমে যাবে।
বর্তমান ব্যবস্থা:
১০ বছর → ১ম উচ্চতর গ্রেড
১৬ বছর → ২য় উচ্চতর গ্রেড
আলোচিত ৮+৬+৮ ব্যবস্থা:
৮ বছর → ১ম উচ্চতর গ্রেড
১৪ বছর → ২য় উচ্চতর গ্রেড
২২ বছর → ৩য় উচ্চতর গ্রেড
অর্থাৎ প্রথম উচ্চতর গ্রেড ২ বছর আগে এবং দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেডও ২ বছর আগে পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো—দীর্ঘ কর্মজীবনে তৃতীয় উচ্চতর গ্রেডের একটি নতুন ধাপ যুক্ত হবে।
৯ম পে-স্কেলের আলোচনায় এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫-এর প্রতিবেদনে পদোন্নতির সুযোগ না থাকা কর্মচারীদের উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সময়সীমা কমানোর সুপারিশ করা হয়েছিল বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকাশিত তথ্যে কমিশনের সুপারিশ হিসেবে ৫ বছর ও পরবর্তী ৫ বছর অন্তর দুটি উচ্চতর গ্রেডের কথা এসেছে।
অন্যদিকে, সরকারি কর্মচারীদের বিভিন্ন সংগঠন আরও বেশি সুবিধা চেয়ে ব্লক পোস্টসহ সব পদে পদোন্নতি অথবা নির্দিষ্ট সময় পর উচ্চতর গ্রেড দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে। ২০২৬ সালের মে মাসে একটি কর্মচারী সংগঠন ব্লক পোস্টে কর্মরতদের জন্য পদোন্নতি অথবা প্রতি পাঁচ বছর পর উচ্চতর গ্রেড দেওয়ার দাবি জানিয়েছিল।
অর্থাৎ উচ্চতর গ্রেডের সময়সীমা কমানো নিয়ে দাবিটি নতুন নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের একটি কর্মচারী-আন্দোলনের অংশ।
কিন্তু ৮+৬+৮ কি চূড়ান্ত হয়েছে?
এখানেই সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকা দরকার।
৩১ আগস্ট ২০২৬ সরকার নবম জাতীয় বেতন স্কেল অনুমোদন করেছে। বিদ্যমান ২০টি গ্রেড রেখে নতুন কাঠামোয় সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার এবং সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণের কথা জানানো হয়েছে। নতুন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর করার সিদ্ধান্তও প্রকাশিত হয়েছে।
কিন্তু উচ্চতর গ্রেডের বিষয়ে ৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতীয় বেতন কমিশন সময়সীমা কমানোর সুপারিশ করলেও ১০ ও ৬ বছরের প্রচলিত কাঠামো বহাল রাখার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এ কারণে ৮+৬+৮-কে বর্তমানে চূড়ান্ত গেজেটের বিধান হিসেবে নয়, বরং আলোচ্য/প্রস্তাবিত কাঠামো হিসেবে উপস্থাপন করাই নিরাপদ।
৮+৬+৮ কার্যকর হলে কী সুবিধা হতে পারে?
১. দ্রুত আর্থিক অগ্রগতি
৮ বছর পূর্তির পর প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়া গেলে কর্মচারীকে ১০ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না।
২. পদোন্নতি না পাওয়ার ক্ষতি কিছুটা কমবে
ব্লক পদে কর্মরত ব্যক্তির মূল সমস্যা যেহেতু পদোন্নতির সুযোগ না থাকা, তাই উচ্চতর গ্রেড তার বিকল্প আর্থিক অগ্রগতির পথ হিসেবে কাজ করতে পারে।
৩. দীর্ঘ কর্মজীবনে তৃতীয় ধাপের সুবিধা
বর্তমান ২০১৫ কাঠামোর বড় সীমাবদ্ধতা হলো দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেডের পর আর তৃতীয় উচ্চতর গ্রেড নেই। ৮+৬+৮ ব্যবস্থা হলে ২২ বছর পূর্তিতে তৃতীয় ধাপের সুযোগ তৈরি হবে।
৪. অভিজ্ঞতার আর্থিক স্বীকৃতি
একই পদে ২০-২৫ বছর কাজ করা কর্মচারীর অভিজ্ঞতা ও দীর্ঘ চাকরিকালকে আর্থিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার সুযোগ বাড়বে।
একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার
ধরা যাক, একজন কর্মচারী ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে একটি ব্লক পদে চাকরিতে যোগ দিলেন এবং পুরো চাকরিজীবনে কোনো পদোন্নতি পেলেন না।
৮+৬+৮ কাঠামো কার্যকর হলে সম্ভাব্য হিসাব হবে—
১ জুলাই ২০৩৪ → ৮ বছর পূর্তি → ১ম উচ্চতর গ্রেড
এরপর—
১ জুলাই ২০৪০ → ১৪ বছর পূর্তি → ২য় উচ্চতর গ্রেড
এরপর—
১ জুলাই ২০৪৮ → ২২ বছর পূর্তি → ৩য় উচ্চতর গ্রেড
অর্থাৎ একই পদে থেকেও দীর্ঘ কর্মজীবনে তিন ধাপে আর্থিক উন্নতির সুযোগ তৈরি হবে।
তবে বাস্তবে কোন তারিখ থেকে চাকরিকাল গণনা হবে, পদোন্নতি/পদ উন্নীতকরণ/পূর্ববর্তী উচ্চতর স্কেল কীভাবে সমন্বয় হবে—এসব বিষয় চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপনের নির্দিষ্ট বিধানের ওপর নির্ভর করবে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: ৩টি উচ্চতর গ্রেড কি সবার জন্য?
এখানেও ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ রয়েছে।
ব্লক পদে তিনটি উচ্চতর গ্রেড এবং সব সরকারি কর্মচারীর জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে তিনটি উচ্চতর গ্রেড—দুটি এক বিষয় নয়।
কোন পদকে ব্লক পদ হিসেবে গণ্য করা হবে, সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর পদোন্নতির সুযোগ আছে কি না, আগের কোনো টাইমস্কেল/সিলেকশন গ্রেড/উচ্চতর স্কেল রয়েছে কি না, চাকরি সন্তোষজনক কি না এবং নতুন বেতন বিধিতে কী শর্ত দেওয়া হবে—এসবের ওপর প্রাপ্যতা নির্ভর করবে।
২০১৫ সালের বিধানেও উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার ক্ষেত্রে আগের উচ্চতর স্কেল এবং পদোন্নতির বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
পুরোনো ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা
একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়—জাতীয় বেতন স্কেল-২০০৯-এ নিম্ন বেতনভুক্ত সরকারি কর্মচারীদের জন্য ৮, ১০, ১২ ও ১৫ বছর পূর্তিতে চারটি উচ্চতর গ্রেডের সুযোগ ছিল বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১৫ সালে সেই ব্যবস্থা পরিবর্তন করে ১০ ও ৬ বছরের দুই ধাপ করা হয়।
সুতরাং ৮+৬+৮ ব্যবস্থা কার্যকর হলে এটি ২০১৫ সালের দুই ধাপের কাঠামো থেকে আবার বহুধাপীয় আর্থিক অগ্রগতির দিকে যাওয়ার একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হবে—যদিও এটি ২০০৯ সালের কাঠামোর হুবহু পুনর্বহাল নয়।
শেষ কথা
ব্লক পদে কর্মরতদের মূল সমস্যা শুধু বেতন কম হওয়া নয়; পদোন্নতির পথ বন্ধ থাকা। একজন কর্মচারী ২০-২৫ বছর চাকরি করেও যদি একই পদে থেকে অবসর নেন, তাহলে শুধু বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট দিয়ে তার দীর্ঘ কর্মজীবনের আর্থিক অগ্রগতি নিশ্চিত করা কঠিন।
এই বাস্তবতায় ৮+৬+৮—অর্থাৎ ৮, ১৪ ও ২২ বছর পূর্তিতে তিনটি উচ্চতর গ্রেডের ধারণা বাস্তবায়িত হলে ব্লক পদধারীদের জন্য তা বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। প্রথম ও দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেডের অপেক্ষার সময় কমবে এবং দীর্ঘ চাকরিজীবনে তৃতীয় একটি আর্থিক উন্নতির ধাপ যুক্ত হবে।
তবে বর্তমান তথ্য অনুযায়ী এটিকে ৯ম পে-স্কেলের চূড়ান্ত ও নিশ্চিত বিধান বলা যাবে না। কারণ জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ এবং মন্ত্রিসভার অনুমোদিত কাঠামোর পরও উচ্চতর গ্রেডের সময়সীমা নিয়ে ভিন্ন তথ্য সামনে এসেছে; সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদনে ১০+৬ বছর বহাল রাখার উদ্যোগের কথাও বলা হয়েছে।
অতএব, ব্লক পদে ৮+৬+৮ সুবিধা নিয়ে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অপেক্ষা হলো চূড়ান্ত সরকারি গেজেট/প্রজ্ঞাপন। সেখানে যদি ৮, ১৪ ও ২২ বছরের বিধান স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়, তখনই বলা যাবে—১০ ও ১৬ বছরের পুরোনো কাঠামোর পরিবর্তে সত্যিই ব্লক পদধারীদের জন্য নতুন ৮+৬+৮ যুগের সূচনা হয়েছে।


