সার্ভিস রুলস । নীতি । পদ্ধতি । বিধি

প্রশিক্ষণ ভাতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা: প্রশিক্ষণার্থীর ভাতা থেকে আয়কর কাটার নিয়ম কী?

সরকারি কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ ভাতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই মাঠপর্যায়ে নানা ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে ১১ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারীরা প্রশিক্ষণে অংশ নিলে তাঁদের প্রাপ্য প্রশিক্ষণ ভাতা থেকে আয়কর বা উৎসে কর কাটা হবে কি না—এ নিয়ে অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে। একই সঙ্গে প্রশিক্ষক বা রিসোর্স পার্সন হিসেবে যাঁরা ক্লাস নেন, তাঁদের সম্মানী থেকে কর কর্তনের বিষয়টিও আলাদা করে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।

সাম্প্রতিক সরকারি নথি ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে পাওয়া দৈনিক প্রশিক্ষণ ভাতা এবং প্রশিক্ষক হিসেবে পাওয়া সম্মানী—দুটি একই ধরনের অর্থপ্রাপ্তি নয়। এ কারণে একটির ক্ষেত্রে উৎসে কর প্রযোজ্য না হলেও অন্যটির ক্ষেত্রে কর কর্তনের বিধান থাকতে পারে।

প্রশিক্ষণার্থীর ভাতা থেকে উৎসে কর না কাটার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের একটি স্পষ্টীকরণে বলা হয়েছিল, কোনো প্রশিক্ষণার্থীকে প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের জন্য দৈনিক ভাতা, প্রশিক্ষণ ভাতা বা অনুরূপ কোনো অর্থ প্রদান করা হলে তার ওপর উৎসে কর কর্তন করা হবে না।

অন্যদিকে, প্রশিক্ষক বা রিসোর্স পার্সন হিসেবে দায়িত্ব পালন, প্রশিক্ষণ সেবা প্রদান, ক্লাস নেওয়া বা এ ধরনের কাজের বিপরীতে ফি, সম্মানী বা অন্য নামে অর্থ প্রদান করা হলে উৎসে কর কর্তনের বিধান প্রযোজ্য হতে পারে।

অর্থাৎ, প্রশিক্ষণার্থীকে প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের কারণে দেওয়া ভাতা এবং প্রশিক্ষককে ক্লাস নেওয়ার জন্য দেওয়া সম্মানীকে এক করে দেখার সুযোগ নেই।

১১ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্যেও ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম এবং প্রশিক্ষণ ভাতা প্রদানের কথা উল্লেখ রয়েছে।

এ ছাড়া অর্থ বিভাগের ২০২৫ সালের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সরকারি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী প্রশিক্ষণার্থীদের দৈনিক প্রশিক্ষণ ভাতার হার পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে ১০ম গ্রেড থেকে তদনিম্ন পর্যায়ের কর্মচারীদের জন্য কেন্দ্রে অবস্থানকালীন দৈনিক ৬০০ টাকা এবং মাঠ সংযুক্তকালীন ৭০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়।

তাই ১১ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ ভাতা নিয়ে যখন হিসাব করা হবে, তখন প্রথমেই দেখতে হবে অর্থটি প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে ভাতা, নাকি প্রশিক্ষক/রিসোর্স পার্সন হিসেবে সম্মানী

২০২৫ সালের নতুন হারে প্রশিক্ষণ ভাতা

এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে অর্থ বিভাগ সরকারি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষণার্থীদের দৈনিক ভাতা পুনর্নির্ধারণ করে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষক ও প্রশিক্ষণার্থীদের ভাতা-সম্মানীর হারও পরিবর্তিত হয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণে ৯ম গ্রেড ও তদূর্ধ্ব প্রশিক্ষণার্থীদের দৈনিক ভাতা ৬০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,২০০ টাকা এবং ১০ম গ্রেড থেকে তদনিম্ন কর্মচারীদের ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,০০০ টাকা করা হয়েছে।

তবে কোন প্রশিক্ষণ কোন প্রজ্ঞাপন/নীতিমালার আওতাভুক্ত, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত প্রশিক্ষণ কিংবা নির্দিষ্ট ধরনের মাঠপর্যায়ের প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে আলাদা বিধান থাকতে পারে।

তাহলে প্রশিক্ষক বা ক্লাস নেওয়া ব্যক্তির টাকা কেন কাটা হয়?

এখানেই মূল পার্থক্য।

প্রশিক্ষক, বক্তা বা রিসোর্স পার্সনকে যে অর্থ দেওয়া হয়, সেটি সাধারণত প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের ভাতা নয়; বরং সেবা/ক্লাস/সম্মানীর বিনিময়ে প্রাপ্ত অর্থ হিসেবে বিবেচিত হয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ব্যাখ্যায় প্রশিক্ষক বা রিসোর্স পার্সন হিসেবে প্রশিক্ষণ সেবা দেওয়ার বিপরীতে প্রাপ্ত ফি, সম্মানী বা অনুরূপ অর্থের ওপর উৎসে কর কর্তনের বিধান উল্লেখ করা হয়েছে।

এ কারণে একই প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে—

  • প্রশিক্ষণার্থী: প্রশিক্ষণ ভাতা গ্রহণ করেন;
  • প্রশিক্ষক/রিসোর্স পার্সন: ক্লাস বা প্রশিক্ষণ সেবার জন্য সম্মানী গ্রহণ করেন;
  • দুটির কর-চরিত্র এক নয়

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বর্তমান FAQ-তেও ট্রেনিং ফি ও সম্মানী থেকে উৎসে কর কাটা হলে সেটিকে রিটার্নে সংশ্লিষ্ট আয়ের ধরন হিসেবে দেখানোর নির্দেশনা রয়েছে।

১০ টাকা রেভিনিউ স্ট্যাম্পের বিষয়টি কী?

প্রশিক্ষণার্থীকে ভাতা দেওয়ার সময় ১০ টাকা মূল্যের রেভিনিউ স্ট্যাম্প নেওয়ার প্রচলন অনেক সরকারি দপ্তরের প্রশিক্ষণসংক্রান্ত বিল/রসিদ প্রক্রিয়ায় দেখা যায়। বিভিন্ন সরকারি প্রশিক্ষণসংক্রান্ত নোটিশেও প্রশিক্ষণার্থীদের ১০ টাকা মূল্যের রাজস্ব স্ট্যাম্প সঙ্গে আনার নির্দেশনা পাওয়া যায়।

তবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রেভিনিউ স্ট্যাম্প নেওয়া এবং আয়কর কর্তন করা এক বিষয় নয়।

রেভিনিউ স্ট্যাম্প মূলত অর্থপ্রাপ্তির রসিদ/স্বীকৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়; আর আয়কর কর্তন হলো কর আইনের অধীনে নির্ধারিত উৎসে কর সংগ্রহের বিষয়। তাই ১০ টাকা রেভিনিউ স্ট্যাম্প নেওয়া হচ্ছে বলে প্রশিক্ষণ ভাতা থেকে আয়কর কাটা হচ্ছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক হবে না।

সরকারি কর্মচারীদের ভাতার ক্ষেত্রে আয়কর আইনের অবস্থান

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আয়কর নির্দেশিকায় সরকারি বেতন আদেশভুক্ত কর্মচারীদের ক্ষেত্রে সরকারি বেতন আদেশে উল্লিখিত নির্দিষ্ট ভাতা ও সুবিধাকে করমুক্ত রাখার বিধান ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন সরকারি ভাতা ও সুবিধার তালিকাও দেওয়া হয়েছে।

তবে প্রশিক্ষণ ভাতা থেকে উৎসে কর না কাটার বিষয়টি শুধু সাধারণ ‘সরকারি ভাতা করমুক্ত’ ধারণার ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। প্রশিক্ষণ ভাতার প্রকৃতি, সংশ্লিষ্ট অর্থ বিভাগের প্রজ্ঞাপন এবং আয়কর আইনের উৎসে কর সংক্রান্ত নির্দিষ্ট বিধান—সবগুলো মিলিয়ে বিষয়টি নির্ধারণ করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা

প্রাপ্ত সরকারি ও এনবিআর তথ্যের ভিত্তিতে প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে দৈনিক প্রশিক্ষণ ভাতা পাওয়া এবং প্রশিক্ষক হিসেবে ক্লাস নেওয়ার সম্মানী পাওয়া—এই দুটি আলাদা বিষয়। এনবিআরের প্রকাশিত স্পষ্টীকরণে প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারী প্রশিক্ষার্থীর দৈনিক ভাতা/প্রশিক্ষণ ভাতার ওপর উৎসে কর কর্তন না করার কথা বলা হয়েছে; বিপরীতে প্রশিক্ষক বা রিসোর্স পার্সনের প্রশিক্ষণ সেবার বিনিময়ে পাওয়া অর্থের ক্ষেত্রে উৎসে করের বিধান রয়েছে।

অতএব, ১১ থেকে ২০ গ্রেডের কোনো কর্মচারী প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে প্রশিক্ষণ ভাতা পাওয়ার সময় তাঁর ভাতা থেকে আয়কর কেটে নেওয়া হচ্ছে কি না—এটি যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অর্থপ্রদানের প্রকৃতি ও প্রযোজ্য এনবিআর নির্দেশনাই মূল বিষয়।

আর একটি বিষয়ও পরিষ্কার করা জরুরি—“প্রশিক্ষণ ভাতা থেকে কারও টাকা কখনোই কাটা যাবে না”—এমন সর্বজনীন দাবি করার আগে সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ কর্মসূচির প্রজ্ঞাপন, অর্থ বিভাগের আদেশ এবং প্রযোজ্য আয়কর বিধান মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ প্রশিক্ষণের ধরন ও অর্থপ্রদানের খাত ভেদে নিয়ম আলাদা হতে পারে।

বর্তমানে এনবিআরের ওয়েবসাইটে ২০২৬-২০২৭ আয়কর পরিপত্র ও আয়কর নির্দেশিকা প্রকাশিত রয়েছে এবং ২০২৬ সালে উৎসে কর সংক্রান্ত নতুন বিধি/আদেশও প্রকাশিত হয়েছে। ফলে পুরোনো কোনো জারিপত্রকে বর্তমান নিয়ম হিসেবে ব্যবহার করার আগে সেটি এখনও কার্যকর কি না যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি।

সারকথা: প্রশিক্ষণার্থীকে দেওয়া প্রশিক্ষণ ভাতা থেকে উৎসে আয়কর না কাটার বিষয়ে এনবিআরের স্পষ্টীকরণের ভিত্তি রয়েছে; কিন্তু প্রশিক্ষক/রিসোর্স পার্সনের ক্লাস নেওয়ার সম্মানী আলাদা এবং সেখানে উৎসে কর প্রযোজ্য হতে পারে। আর ১০ টাকা রেভিনিউ স্ট্যাম্পের বিষয়টি কর কর্তনের বিকল্প বা সমার্থক নয়।

নোট: আপনি যে নির্দিষ্ট “জারিপত্র/স্পষ্টীকরণ” খুঁজছেন, সেটি সম্ভবত এনবিআরের মিটিং ফি ও প্রশিক্ষণ ফি/প্রশিক্ষণ ভাতা থেকে উৎসে কর কর্তনসংক্রান্ত পুরোনো স্পষ্টীকরণ। উপরের বিশ্লেষণের সবচেয়ে সরাসরি ভিত্তি সেটিই। এনবিআরের বর্তমান সাইটে ২০২৬-২০২৭ সালের আয়কর পরিপত্র ও সংশ্লিষ্ট বিধিও প্রকাশিত আছে।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *