৯ম পে স্কেল নিউজ ২০২৬

সরকারি চাকরিতে বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব: ১১–২০ গ্রেডে বাড়ছে ভাইভার নম্বর, কমছে লিখিতের গুরুত্ব

সরকারি চাকরিতে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডে সরাসরি নিয়োগের পরীক্ষাপদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত নতুন বিধিমালায় গ্রেডভেদে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বর পুনর্বিন্যাসের পাশাপাশি লিখিত পরীক্ষায় পাস নম্বরও কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসছে ভাইভা পরীক্ষায়—কিছু গ্রেডে বর্তমানে ১০ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষা বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ৫০ নম্বর করার প্রস্তাব রয়েছে।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা গেজেট নয়। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী ৯ সেপ্টেম্বর জানিয়েছেন, ১১–২০ গ্রেডের নিয়োগে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানোর বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তরের নিয়োগব্যবস্থায় সামঞ্জস্য আনতেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে।

কোন গ্রেডে কত নম্বর হতে পারে

প্রস্তাবিত ‘মন্ত্রণালয় বা বিভাগ ও এর আওতাধীন অধিদপ্তর, পরিদপ্তর, দপ্তর এবং সংস্থাগুলোর ১১–২০তম গ্রেডে সরাসরি নিয়োগের জন্য পরীক্ষার মান বণ্টন (বিশেষ বিধান) বিধিমালা, ২০২৬’ অনুযায়ী ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের পদগুলোকে তিনটি ভাগে ভাগ করে নম্বর বণ্টনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

গ্রেডবর্তমান লিখিতবর্তমান ভাইভাপ্রস্তাবিত লিখিতপ্রস্তাবিত ভাইভা
১১–১২৯০১০১০০৫০
১৩–১৬৯০১০৬০৪০
১৭–২০৪০১০২৫২৫

অর্থাৎ ১১–১২তম গ্রেডে ভাইভার নম্বর ১০ থেকে ৫০ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি বর্তমান ভাইভা নম্বরের তুলনায় ৪০০ শতাংশ বৃদ্ধি। ১৩–১৬তম গ্রেডে ভাইভা ১০ থেকে ৪০ এবং ১৭–২০তম গ্রেডে ১০ থেকে ২৫ করার প্রস্তাব রয়েছে।

১১–১২তম গ্রেডে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন

১১ ও ১২তম গ্রেডের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী লিখিত পরীক্ষা হবে ১০০ নম্বরের, আর মৌখিক পরীক্ষা হবে ৫০ নম্বরের। অর্থাৎ একজন প্রার্থীর মোট মূল্যায়ন হবে ১৫০ নম্বরে।

লিখিত পরীক্ষায় বাংলা, ইংরেজি, গণিত এবং সংশ্লিষ্ট পদ অনুযায়ী টেকনিক্যাল বিষয় বা সাধারণ জ্ঞানে ২৫ নম্বর করে রাখার প্রস্তাব রয়েছে। পরীক্ষার সময় ৯০ মিনিট এবং লিখিত পরীক্ষায় ন্যূনতম পাস নম্বর ৩৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। মৌখিক পরীক্ষায় পাস নম্বর রাখা হচ্ছে ৪০ শতাংশ।

বর্তমানে যেখানে লিখিত পরীক্ষার নম্বর ৯০ এবং ভাইভার নম্বর মাত্র ১০, সেখানে নতুন কাঠামোয় ভাইভার গুরুত্ব অনেকটাই বেড়ে যাবে।

১৩–১৬তম গ্রেডে লিখিত ৬০, ভাইভা ৪০

১৩ থেকে ১৬তম গ্রেডের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত কাঠামোয় লিখিত পরীক্ষার নম্বর ৯০ থেকে কমিয়ে ৬০ এবং মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ১০ থেকে বাড়িয়ে ৪০ করার কথা বলা হয়েছে।

লিখিত পরীক্ষায় বাংলা, ইংরেজি, গণিত এবং সংশ্লিষ্ট টেকনিক্যাল বিষয় বা সাধারণ জ্ঞানে ১৫ নম্বর করে রাখার প্রস্তাব রয়েছে। পরীক্ষার সময় হবে ৬০ মিনিট। লিখিত ও মৌখিক—উভয় পরীক্ষায় ন্যূনতম পাস নম্বর ৪০ শতাংশ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এখানে মোট নম্বর ১০০ থাকলেও মূল্যায়নের ভারসাম্য নাটকীয়ভাবে বদলে যাবে। বর্তমান ব্যবস্থায় লিখিত পরীক্ষার ওজন যেখানে ৯০ শতাংশ, প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় তা কমে ৬০ শতাংশে নেমে আসবে। বিপরীতে ভাইভার গুরুত্ব ১০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪০ শতাংশে দাঁড়াবে।

১৭–২০তম গ্রেডে লিখিত ও ভাইভা সমান

১৭ থেকে ২০তম গ্রেডের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত কাঠামোয় লিখিত পরীক্ষা ও মৌখিক পরীক্ষা—দুটিতেই ২৫ নম্বর করে রাখার কথা বলা হয়েছে।

বর্তমানে এ স্তরে লিখিত পরীক্ষা ৪০ এবং ভাইভা ১০ নম্বরের। ফলে নতুন নিয়ম কার্যকর হলে লিখিত পরীক্ষার নম্বর কমে ২৫ হলেও ভাইভার নম্বর আড়াই গুণ হয়ে যাবে।

অর্থাৎ এই গ্রেডে একজন প্রার্থীর মোট মূল্যায়নের অর্ধেকই নির্ভর করবে মৌখিক পরীক্ষার ওপর।

লিখিত পরীক্ষায় পাস নম্বরও কমানোর প্রস্তাব

শুধু ভাইভার নম্বর বাড়ানো নয়, লিখিত পরীক্ষায় পাসের ন্যূনতম সীমাও কমানোর প্রস্তাব রয়েছে।

১১–১২তম গ্রেডে লিখিত পরীক্ষায় বর্তমান ৫০ শতাংশের পরিবর্তে ৩৫ শতাংশ নম্বরে পাসের প্রস্তাব করা হয়েছে।

১৩–১৬তম গ্রেডে লিখিত পরীক্ষায় পাস নম্বর ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪০ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে।

১৭–২০তম গ্রেডে লিখিত ও মৌখিক—উভয় পরীক্ষায় ৪০ শতাংশ পাস নম্বর রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

কেন এই পরিবর্তনের উদ্যোগ?

সরকারের পক্ষ থেকে এর পেছনে কয়েকটি কারণ তুলে ধরা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রযুক্তির ব্যবহার, প্রক্সি পরীক্ষার্থী এবং বিভিন্ন আধুনিক অসদুপায় ব্যবহারের কারণে শুধু লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে একজন প্রার্থীর প্রকৃত যোগ্যতা যাচাই করা সবসময় সম্ভব হচ্ছে না।

তাই লিখিত পরীক্ষার পাশাপাশি প্রার্থীর যোগাযোগ দক্ষতা, আচরণ, উপস্থিত বুদ্ধি, কাজের উপযোগিতা এবং সংশ্লিষ্ট পদে দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা যাচাই করতে মৌখিক পরীক্ষার পরিধি বাড়ানোর যুক্তি দেওয়া হচ্ছে।

সরকারি নিয়োগে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের ভিন্ন ভিন্ন পরীক্ষা পদ্ধতি থাকায় সেগুলোকে একটি অভিন্ন কাঠামোর মধ্যে আনার বিষয়টিও প্রস্তাবের অন্যতম লক্ষ্য বলে জানানো হয়েছে।

তবে তৈরি হয়েছে বিতর্কও

ভাইভার নম্বর ব্যাপকভাবে বাড়ানোর প্রস্তাবকে ঘিরে চাকরিপ্রার্থী ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের মূল আশঙ্কা হলো—লিখিত পরীক্ষায় একজন প্রার্থী মেধার ভিত্তিতে এগিয়ে থাকার পরও মৌখিক পরীক্ষায় বেশি নম্বরের কারণে চূড়ান্ত মেধাক্রম পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে।

বিশেষ করে ১১–১২তম গ্রেডে ভাইভার নম্বর ৫০ এবং ১৭–২০তম গ্রেডে লিখিত ও ভাইভা সমান ২৫ নম্বর হওয়ায় মৌখিক পরীক্ষার বোর্ডের মূল্যায়নের ওপর প্রার্থীর চূড়ান্ত ফল অনেক বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। এ কারণে স্বজনপ্রীতি, প্রভাব বা অনিয়মের সুযোগ বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সমালোচকেরা।

তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানও স্বীকার করেছেন, ভাইভার নম্বর বেশি হলে পছন্দের প্রার্থীকে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ তুলনামূলকভাবে বাড়তে পারে—যদিও সরকারের উদ্দেশ্য হিসেবে তিনি দক্ষ ও যোগ্য জনবল বাছাইয়ের কথা বলেছেন।

এখনই কি নতুন নিয়মে পরীক্ষা হবে?

না। এই মুহূর্তে প্রস্তাবিত কাঠামোকে চূড়ান্ত নিয়োগবিধি হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। প্রশাসনিক উন্নয়ন-সংক্রান্ত সচিব কমিটি খসড়া বিধিমালায় অনুমোদন দিয়েছে বলে প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হলেও, ৯ সেপ্টেম্বর জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।

ফলে চাকরিপ্রার্থীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—চূড়ান্ত বিধিমালা ও সরকারি প্রজ্ঞাপন প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান নিয়োগবিধিই কার্যকর থাকবে, যদি সংশ্লিষ্ট নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে অন্য কোনো বৈধ বিধান না থাকে।

প্রস্তাব কার্যকর হলে চাকরিপ্রার্থীদের জন্য কী পরিবর্তন আসবে?

প্রস্তাবটি চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হলে ১১–২০ গ্রেডের সরকারি চাকরির প্রস্তুতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে হবে।

প্রথমত, শুধু লিখিত পরীক্ষায় ভালো করার ওপর নির্ভর করলে হবে না। বিশেষ করে ১১–১২ ও ১৩–১৬ গ্রেডে ভাইভার প্রস্তুতিকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, সংশ্লিষ্ট পদের কাজ, দায়িত্ব, সাধারণ জ্ঞান, সমসাময়িক বিষয়, বাংলা ও ইংরেজিতে যোগাযোগ দক্ষতা এবং ব্যক্তিত্বভিত্তিক প্রশ্নের প্রস্তুতি বাড়াতে হবে।

তৃতীয়ত, লিখিত পরীক্ষার পাস নম্বর কমে গেলে তুলনামূলক বেশি সংখ্যক প্রার্থী ভাইভায় যাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। ফলে লিখিত পরীক্ষায় শুধু পাস করাই নয়, পরবর্তী ধাপে ভালো করার জন্য ভাইভায় শক্ত অবস্থান তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা

প্রস্তাবিত পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় দিক হলো লিখিত পরীক্ষার তুলনায় মৌখিক পরীক্ষার গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যাওয়া। ১১–১২তম গ্রেডে ভাইভার ওজন ১০ শতাংশ থেকে প্রায় এক-তৃতীয়াংশে, ১৩–১৬তম গ্রেডে ১০ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশে এবং ১৭–২০তম গ্রেডে ২০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশে উঠে যাওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

তবে এটিকে এখনই ‘চূড়ান্ত নতুন নিয়ম’ বলা ঠিক হবে না। কারণ সরকারের পক্ষ থেকেই জানানো হয়েছে, বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেনি।

সুতরাং চাকরিপ্রার্থীদের জন্য আপাতত সবচেয়ে নিরাপদ অবস্থান হলো—চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী প্রস্তুতি চালিয়ে যাওয়া এবং নতুন বিধিমালা গেজেট হলে গ্রেডভিত্তিক নম্বর বণ্টন নিশ্চিত করে প্রস্তুতির কৌশল পরিবর্তন করা।

সংক্ষেপে: ১১–২০ গ্রেডের সরকারি চাকরিতে নিয়োগ পরীক্ষা পদ্ধতিতে বড় সংস্কারের প্রস্তাব এসেছে। ১১–১২ গ্রেডে ১০০ লিখিত + ৫০ ভাইভা, ১৩–১৬ গ্রেডে ৬০ লিখিত + ৪০ ভাইভা এবং ১৭–২০ গ্রেডে ২৫ লিখিত + ২৫ ভাইভা করার প্রস্তাব রয়েছে। কিন্তু চূড়ান্ত গেজেট এখনো হয়নি—এটাই এই মুহূর্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।

সোর্স

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *