বরাদ্দ দ্বিগুণ না হলেও নবম পে-স্কেলে বেতন দ্বিগুণের বেশি কেন? আসল হিসাব বুঝলে পরিষ্কার হবে
সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেল অনুমোদনের পর সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি ঘুরছে, তা হলো—সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা খাতে যেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ৬১ হাজার ১৪১ কোটি টাকা, সেখানে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। তাহলে কি বেতন প্রায় ৬৫ শতাংশ বাড়বে? নাকি কোনো কোনো গ্রেডে বেতন দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে?
এই প্রশ্নের উত্তর বুঝতে হলে ‘সরকারের অতিরিক্ত ব্যয়’ এবং ‘একজন কর্মচারীর বেতন বৃদ্ধির হার’—এই দুই বিষয়কে আলাদা করে দেখতে হবে।
সরকারি হিসাবে, জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬ বাস্তবায়নে বছরে অতিরিক্ত আর্থিক প্রয়োজন হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। এই সুবিধার আওতায় প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও বেসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী আসবেন। নতুন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হলেও পুরো সুবিধা একসঙ্গে দেওয়া হচ্ছে না।
প্রথমেই যে ভুল ধারণাটি পরিষ্কার করা দরকার
২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা খাতে ১ লাখ ৬১ হাজার ১৪১ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল—এই সংখ্যাকে নতুন পে-স্কেলের অতিরিক্ত ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকার সঙ্গে সরাসরি তুলনা করে ‘বেতন ৬৫ শতাংশ বাড়বে’ বলা ঠিক হবে না।
কারণ ১ লাখ ৬১ হাজার ১৪১ কোটি টাকা হলো একটি সামগ্রিক বাজেট বরাদ্দ, আর ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা হলো নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ফলে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক আর্থিক সংশ্লেষ। এর মধ্যে বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি পেনশনসহ বিভিন্ন আর্থিক সুবিধার প্রভাবও রয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী নতুন স্কেলের সঙ্গে পেনশন ও অন্যান্য সুবিধার পরিবর্তনও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
এ কারণে ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি ÷ ১ লাখ ৬১ হাজার ১৪১ কোটি = প্রায় ৬৫ শতাংশ—এই হিসাব করে কর্মচারীদের বেতন ৬৫ শতাংশ বাড়বে বলা অর্থনৈতিকভাবে সঠিক নয়।
তাহলে কোনো কোনো গ্রেডে বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ বাড়ছে কেন?
এখানেই রয়েছে পুরো বিষয়টির মূল রহস্য।
নতুন জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬-এ গ্রেডভিত্তিক মূল বেতন পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০টি গ্রেডই বহাল থাকছে। নতুন কাঠামোয় ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা হয়েছে। অর্থাৎ বৃদ্ধি প্রায় ১৪২ শতাংশ।
অন্যদিকে প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা, অর্থাৎ ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি।
অর্থাৎ এখানে দেখা যাচ্ছে—
| বিষয় | পুরোনো | নতুন | বৃদ্ধি |
|---|---|---|---|
| ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন | ৮,২৫০ | ২০,০০০ | প্রায় ১৪২% |
| ১ম গ্রেডের নির্ধারিত মূল বেতন | ৭৮,০০০ | ১,৫৬,০০০ | ১০০% |
এ কারণে সরকারের মোট অতিরিক্ত ব্যয় ৬৫ শতাংশের মতো হলেও কোনো নির্দিষ্ট গ্রেডের মূল বেতন ১০০-১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
এ দুটির মধ্যে কোনো বিরোধ নেই।
একজন কর্মচারীর বেতন আর সরকারের মোট ব্যয়—দুটি আলাদা হিসাব
বিষয়টি একটি সহজ উদাহরণে বোঝা যায়।
ধরা যাক, একটি প্রতিষ্ঠানে ১০ জন কর্মচারী আছেন। তাঁদের কারও বেতন ১০ হাজার, কারও ২০ হাজার, আবার কারও ১ লাখ টাকা। এখন যদি নিম্নবেতনভোগীদের বেতন তুলনামূলক বেশি হারে বাড়ানো হয়, তাহলে কিছু কর্মচারীর বেতন দ্বিগুণ হলেও পুরো প্রতিষ্ঠানের মোট বেতন ব্যয় দ্বিগুণ নাও হতে পারে।
নবম পে-স্কেলেও একই ধরনের বিষয় রয়েছে।
নতুন কাঠামোয় নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের তুলনামূলক বেশি সুবিধা দেওয়া হয়েছে। সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের অনুপাতও ১:১.৯৪৫ থেকে কমিয়ে ১:১.৭৮ করা হয়েছে। অর্থাৎ নতুন কাঠামোর অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে বেতন বৈষম্য কিছুটা কমানো।
ফলে একজন ২০তম গ্রেডের কর্মচারীর মূল বেতন ১৪২ শতাংশ বাড়লেও পুরো সরকারি বেতন-ভাতা বিল ১৪২ শতাংশ বাড়বে—এমন কোনো অর্থ নেই।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—বেতন একদিনে দ্বিগুণ হচ্ছে না
নতুন পে-স্কেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন।
সরকার পুরো বেতন কাঠামো একযোগে কার্যকর না করে ২০২৬-২৭ এবং ২০২৭-২৮ অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মূল বেতন ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ১ জুলাই ২০২৭-এর মধ্যে কয়েকটি ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। বিভিন্ন ভাতা পরবর্তী পর্যায়ে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
অর্থাৎ কাগজে কোনো গ্রেডের নতুন মূল বেতন ১০০ বা ১৪২ শতাংশ বেশি হলেও প্রথম দিন থেকেই পুরো বৃদ্ধির টাকা হাতে পাওয়া যাবে না।
এটি সরকারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একসঙ্গে পুরো সুবিধা কার্যকর করলে রাষ্ট্রের কোষাগারের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
নবম গ্রেডের উদাহরণে বিষয়টি আরও পরিষ্কার
ধরা যাক, ২০১৫ সালের পে-স্কেল অনুযায়ী নবম গ্রেডের একজন কর্মকর্তার প্রারম্ভিক মূল বেতন ছিল ২২ হাজার টাকা।
নতুন কাঠামোয় সেটি ৪৪ হাজার টাকা হলে মূল বেতন বৃদ্ধির হার দাঁড়ায় ১০০ শতাংশ।
কিন্তু এই অতিরিক্ত ২২ হাজার টাকা একবারে যোগ হবে না। প্রকাশিত বাস্তবায়ন কাঠামো অনুযায়ী ধাপে ধাপে বর্ধিত অংশ যুক্ত হবে। ফলে প্রথম পর্যায়ে কর্মচারীর হাতে নতুন নির্ধারিত পূর্ণ মূল বেতন কার্যকর হবে না; পরবর্তী ধাপগুলোতে ধীরে ধীরে তা পূর্ণ হবে।
এখানেই ‘পে-স্কেলে ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি’ এবং ‘এখনই বেতন ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি’—এই দুই বক্তব্যের পার্থক্য।
তাহলে ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা কোথায় যাবে?
নতুন পে-স্কেলের অতিরিক্ত ব্যয়কে শুধু কর্মরত সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন বৃদ্ধির টাকা হিসেবে দেখা যাবে না।
নতুন কাঠামোর আওতায় প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও বেসামরিক কর্মচারীর পাশাপাশি সোয়া ৯ লাখের বেশি অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী রয়েছেন। পেনশন কাঠামোতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। ফলে অতিরিক্ত আর্থিক সংশ্লেষের একটি বড় অংশ পেনশন ও সংশ্লিষ্ট সুবিধার ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলবে।
এ ছাড়া নতুন কাঠামোয় বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা এবং সব গ্রেডের কর্মচারীর জন্য মোবাইল ভাতার আওতা সম্প্রসারণের মতো নতুন সুবিধাও যুক্ত হয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: তাহলে সরকারের বাজেট কি সামলানো সম্ভব?
এখানেই ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের অর্থনৈতিক যুক্তি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেতন-ভাতা খাতে ১ লাখ ৬১ হাজার ১৪১ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা উল্লেখ করা হলেও পরবর্তী অর্থবছরের কাঠামোতে বেতন-ভাতা এবং পেনশন-গ্র্যাচুইটির বরাদ্দ আলাদাভাবে নির্ধারিত হয়েছে। অর্থ বিভাগ সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা এবং পেনশন-গ্র্যাচুইটিসহ মোট ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
এ থেকে বোঝা যায়, একটি বাজেটের একটি খাতের মোট বরাদ্দ এবং নতুন পে-স্কেলের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক প্রভাব একই জিনিস নয়।
নতুন পে-স্কেলের আর্থিক চাপ আগামী কয়েকটি অর্থবছরের বাজেটেও ছড়িয়ে পড়বে। সরকারও জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোর আওতায় সংশ্লিষ্ট অর্থবছরগুলোর বাজেটে রাখা হবে।
তাহলে চূড়ান্ত উত্তর কী?
না, বরাদ্দ দ্বিগুণ হয়নি বলে বেতন দ্বিগুণ হতে পারবে না—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া যাবে না।
কারণ—
সরকারের মোট অতিরিক্ত ব্যয় ≠ প্রত্যেক কর্মচারীর বেতন বৃদ্ধির হার।
নতুন পে-স্কেলে কোনো কোনো গ্রেডে মূল বেতন ১০০ শতাংশ, আবার নিম্ন গ্রেডে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ছে। কিন্তু সরকারের মোট অতিরিক্ত ব্যয় হিসাব করা হচ্ছে লাখ লাখ কর্মচারী, পেনশনভোগী এবং সংশ্লিষ্ট সুবিধার সামগ্রিক আর্থিক প্রভাব ধরে।
তাই ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয়কে ১ লাখ ৬১ হাজার ১৪১ কোটি টাকার সঙ্গে ভাগ করে ‘বেতন ৬৫ শতাংশ বাড়বে’ বলা যেমন ভুল, তেমনি ‘বেতন দ্বিগুণ হওয়ায় সরকারের ব্যয়ও দ্বিগুণ হতে হবে’—এটিও ভুল।
মূল কথা এক লাইনে
নবম পে-স্কেলে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা হলেও, এর অর্থ সরকারি চাকরিজীবীদের সবার বেতন ৬৫ শতাংশ বাড়বে—এমন নয়; বরং গ্রেডভেদে মূল বেতন ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে এবং সেই সুবিধা ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।
অর্থাৎ ‘বাজেট দ্বিগুণ হয়নি, তাই বেতন দ্বিগুণ হতে পারে না’—এই যুক্তি অসম্পূর্ণ। পে-স্কেলের আসল হিসাব বুঝতে হলে গ্রেডভিত্তিক নতুন মূল বেতন, কর্মচারীর সংখ্যা, পেনশনভোগী, ভাতা এবং বাস্তবায়নের সময়সূচি—সবগুলো একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।


