নবম পে-স্কেল ২০২৬: গেজেট কবে, এখন কোন পর্যায়ে? সামনে ১০ সেপ্টেম্বরের সম্ভাবনা
সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেল ২০২৬-এর গেজেট প্রকাশ নিয়ে আবারও তৈরি হয়েছে নতুন করে প্রত্যাশা। ৬ সেপ্টেম্বর গেজেট প্রকাশের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। এখন সংশ্লিষ্ট মহলে ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬-কে সম্ভাব্য নতুন তারিখ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এটি এখনো কোনো চূড়ান্ত সরকারি ঘোষণা নয়।
৬ সেপ্টেম্বর কেন গেজেট হলো না?
নবম পে-স্কেল অনুমোদনের পর প্রথমে চলতি সপ্তাহেই প্রজ্ঞাপন জারির কথা জানানো হয়েছিল। ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় পে-স্কেল অনুমোদনের পর মন্ত্রিপরিষদ সচিবও জানিয়েছিলেন, দ্রুত গেজেট প্রকাশ করা হবে। পরবর্তী সময়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও ৬ সেপ্টেম্বরের সম্ভাব্য তারিখ সামনে আসে।
কিন্তু নির্ধারিত দিনে গেজেট প্রকাশ না হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—তাহলে গেজেট আসলে কবে?
সর্বশেষ বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে থাকলেও কিছু প্রশাসনিক ও আইনগত আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে সময় লাগছে। ফলে ৬ সেপ্টেম্বরের পরিবর্তে এখন ১০ সেপ্টেম্বর সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে সামনে এসেছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আপডেট: খসড়া বিজি প্রেসে গেছে
গেজেট প্রকাশের বর্তমান অগ্রগতি বুঝতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—পে-স্কেলের খসড়া বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয় (বিজি প্রেসে) পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে ৩ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল। এরপর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে খসড়া অর্থ মন্ত্রণালয়ে আসবে এবং সংশ্লিষ্ট আইনগত ভেটিংসহ পরবর্তী আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে গেজেট প্রকাশের দিকে যাবে।
অর্থাৎ বিষয়টি এখন আর শুধু ‘পে-স্কেল অনুমোদন হবে কি না’—এই পর্যায়ে নেই। বরং অনুমোদিত কাঠামোকে আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপনে রূপ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
এ কারণেই ১০ সেপ্টেম্বরের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
তাহলে কি ১০ সেপ্টেম্বরই গেজেট হবে?
এখানেই সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, ১০ সেপ্টেম্বরকে সম্ভাব্য তারিখ বলা হচ্ছে, নিশ্চিত তারিখ নয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যের সারকথা হলো—প্রক্রিয়াগত কাজ দ্রুত শেষ হলে চলতি সপ্তাহেই গেজেট প্রকাশ সম্ভব। একটি প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে ১০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রজ্ঞাপন প্রকাশের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।
তাই বর্তমান পরিস্থিতির বিশ্লেষণ দাঁড়ায়—
৬ সেপ্টেম্বর → হয়নি
৭ সেপ্টেম্বর → গেজেট প্রকাশের অপেক্ষা
৮–৯ সেপ্টেম্বর → প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সময়
১০ সেপ্টেম্বর → বর্তমানে আলোচিত সম্ভাব্য তারিখ
তবে সরকারি প্রজ্ঞাপন প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট দিনকে চূড়ান্ত বলা নিরাপদ নয়।
৩১ আগস্টের অনুমোদনে কী রয়েছে?
৩১ আগস্ট ২০২৬ মন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ অনুমোদন করা হয়। বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে।
অনুমোদিত কাঠামো অনুযায়ী—
- ২০তম গ্রেডের সর্বনিম্ন প্রারম্ভিক মূল বেতন: ২০,০০০ টাকা
- ১ম গ্রেডের সর্বোচ্চ নির্ধারিত মূল বেতন: ১,৫৬,০০০ টাকা
- বিদ্যমান ২০টি গ্রেডই বহাল থাকবে।
- সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতন অনুপাত আগের ১:১.৯৪৫ থেকে কমিয়ে ১:১.৭৮ করা হয়েছে।
- ২০তম গ্রেডের মূল বেতন বৃদ্ধির হার প্রায় ১৪২ শতাংশ।
- ১ম গ্রেডের নির্ধারিত বেতন বৃদ্ধির হার ১০০ শতাংশ।
১ জুলাই থেকেই কার্যকর—কিন্তু টাকা কবে?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।
সরকার নতুন পে-স্কেলকে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু কার্যকর হওয়ার অর্থ এই নয় যে গেজেট প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে পুরো বর্ধিত বেতন একবারে হাতে চলে আসবে। বাস্তবায়নের জন্য বেতন নির্ধারণ, পে-ফিক্সেশন, ভাতা, পেনশন এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধার পৃথক নির্দেশনা প্রয়োজন হবে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নতুন মূল বেতন ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী মূল বেতনের একটি অংশ প্রথম ধাপে, পরবর্তী অংশ পরবর্তী সময়ে এবং অবশিষ্ট অংশ পরের অর্থবছরে কার্যকর করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
অর্থাৎ গেজেট প্রকাশের পরও সরকারি কর্মচারীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে—কার বেতন কত হবে, কোন ধাপে কত টাকা যুক্ত হবে এবং বকেয়া কীভাবে সমন্বয় করা হবে।
শুধু বেতন নয়, পেনশন ও ভাতাতেও বড় পরিবর্তন
নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের পেনশনেও বড় ধরনের পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত রয়েছে।
প্রকাশিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, নিট পেনশনের স্তরভেদে বৃদ্ধির হার নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে তুলনামূলক কম পেনশন পাওয়া অবসরপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার বেশি রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য প্রতি সন্তান মাসে ৩ হাজার টাকা প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা চালুর সিদ্ধান্তের কথাও জানানো হয়েছে।
মোবাইল ভাতার ক্ষেত্রেও আওতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত রয়েছে। আগে নির্দিষ্ট উচ্চতর গ্রেডের কর্মচারীরা মোবাইল ভাতা পেলেও নতুন ব্যবস্থায় সব গ্রেডের কর্মচারীকে এর আওতায় আনার সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে।
কত মানুষ উপকৃত হবেন?
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, নতুন বেতনস্কেলের ফলে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক সরকারি কর্মচারী এবং প্রায় সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন।
এ জন্য সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক আর্থিক ব্যয় আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা হতে পারে। সরকারের মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোতে এই ব্যয়ের সংস্থান বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
গেজেটের পর আসল কাজ শুরু
অনেকের কাছে গেজেট প্রকাশই যেন পে-স্কেলের শেষ ধাপ। বাস্তবে এটি বরং বাস্তবায়নের বড় একটি সূচনা।
গেজেট প্রকাশের পর পর্যায়ক্রমে প্রয়োজন হবে—
১. পে-ফিক্সেশন পদ্ধতি নির্ধারণ
২. নতুন মূল বেতন হিসাব
৩. পুরোনো ও নতুন বেতনের সমন্বয়
৪. বকেয়া বা এরিয়ার হিসাব
৫. বিভিন্ন ভাতা বাস্তবায়ন
৬. পেনশন পুনর্নির্ধারণ
৭. অর্থ ছাড় ও বেতন বিল প্রস্তুত
৮. মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও দপ্তরভিত্তিক বাস্তবায়ন নির্দেশনা
অর্থাৎ গেজেট প্রকাশের পরও মাঠপর্যায়ে নতুন বেতন কাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়নে আরও প্রশাসনিক সময় প্রয়োজন হতে পারে।
১০ সেপ্টেম্বর নিয়ে বাস্তব বিশ্লেষণ
বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১০ সেপ্টেম্বর এখন পর্যন্ত সবচেয়ে আলোচিত সম্ভাব্য তারিখ। কারণ ৬ সেপ্টেম্বরের সম্ভাব্য প্রকাশের সময় পেরিয়ে গেছে এবং সংশ্লিষ্ট মহল চলতি সপ্তাহের মধ্যেই কাজ শেষ করার প্রস্তুতির কথা বলছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ১০ সেপ্টেম্বর শতভাগ নিশ্চিত।
কারণ গেজেট প্রকাশের আগে যদি কোনো ভেটিং, প্রশাসনিক অনুমোদন, সংশোধন, এসআরও নম্বর বা মুদ্রণসংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা বাকি থাকে, তাহলে তারিখ আবারও পরিবর্তিত হতে পারে।
তাই সবচেয়ে নিরাপদ বক্তব্য হলো—১০ সেপ্টেম্বর সম্ভাব্য; চূড়ান্ত নয়।
সরকারি কর্মচারীদের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি প্রশ্ন
নবম পে-স্কেল নিয়ে এখন মূলত তিনটি প্রশ্ন সামনে—
প্রথমত: গেজেট ঠিক কবে প্রকাশ হবে?
দ্বিতীয়ত: গেজেটে অনুমোদিত কাঠামোর কোনো পরিবর্তন থাকবে কি না?
তৃতীয়ত: গেজেটের পর পে-ফিক্সেশন ও বর্ধিত বেতন বাস্তবে কবে থেকে পাওয়া যাবে?
প্রথম প্রশ্নের উত্তর খুব শিগগিরই পাওয়া যেতে পারে। দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর মিলবে প্রজ্ঞাপনের পূর্ণাঙ্গ কপি প্রকাশের পর। আর তৃতীয় প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করবে অর্থ বিভাগের বাস্তবায়ন নির্দেশনার ওপর।
শেষ কথা
সব তথ্য একত্রে বিশ্লেষণ করলে বলা যায়, নবম জাতীয় পে-স্কেল এখন অনুমোদনের পর্যায় পেরিয়ে বাস্তবায়নের প্রাক-প্রজ্ঞাপন পর্যায়ে রয়েছে। ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় অনুমোদন, এরপর গেজেট প্রস্তুতির কার্যক্রম এবং বিজি প্রেসে খসড়া পাঠানোর খবর—সব মিলিয়ে প্রক্রিয়াটি যথেষ্ট এগিয়েছে।
৬ সেপ্টেম্বরের সম্ভাব্য তারিখ পার হয়ে যাওয়ায় এখন ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে সরকারি প্রজ্ঞাপন হাতে না পাওয়া পর্যন্ত এটিকে চূড়ান্ত তারিখ হিসেবে প্রচার করা উচিত নয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এখন প্রশ্ন আর “পে-স্কেল হবে কি না” নয়; প্রশ্ন হচ্ছে “অনুমোদিত পে-স্কেলের আনুষ্ঠানিক গেজেট ঠিক কখন প্রকাশ হবে এবং এরপর বাস্তবায়ন কত দ্রুত হবে।”
সরকারি প্রজ্ঞাপন প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই নতুন বেতন কাঠামোর বাস্তব চিত্র আরও পরিষ্কার হবে।


