১১ বছরের অপেক্ষার পর পে-স্কেলের দ্বারপ্রান্তে সরকারি কর্মচারীরা, ‘খুশিটা মন খুলে শেয়ার করতেও ভয়’
দীর্ঘ ১১ বছরের প্রত্যাশা, অপেক্ষা আর আন্দোলন-সংগ্রামের পর বহুল আলোচিত নবম জাতীয় পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া এখন শেষ পর্যায়ে। সরকারি চাকরিজীবীদের একটি বড় অংশের মধ্যে তাই তৈরি হয়েছে ঈদের আগের রাতের মতো অপেক্ষা ও উত্তেজনা। কেউ আনন্দের খবরের অপেক্ষায়, কেউ আবার দীর্ঘ অপেক্ষায় হতাশ হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।
সম্প্রতি পে-স্কেল নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে এমনই আবেগঘন প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। একজন কর্মচারীর ভাষায়, “১১ বছরের চাওয়া, ১১ বছরের অপেক্ষা”— তাই বহু প্রতীক্ষিত সিদ্ধান্তের কাছাকাছি এসে আনন্দটা স্বাভাবিকভাবেই অন্যরকম। কিন্তু গেজেট প্রকাশের নির্দিষ্ট সময় নিশ্চিত না হওয়ায় সেই আনন্দও অনেকে প্রকাশ্যে প্রকাশ করতে পারছেন না।
কারও বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলায় আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেটিকে গেজেট রাতেই প্রকাশ হবে—এমন নিশ্চয়তা হিসেবে নেওয়া ঠিক হয়নি। বরং পরিস্থিতি দেখে চাঁদ রাতের মতো একটা অনুভূতি তৈরি হয়েছিল—হয়তো শনিবার, না হলে রবিবার—কিছু একটা হতে পারে। ফলে শত শত সরকারি কর্মচারী এখনো অপেক্ষায়।
গেজেটের প্রক্রিয়া কোথায়?
সাম্প্রতিক সংবাদ প্রতিবেদনগুলো বলছে, নবম জাতীয় পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের আনুষ্ঠানিকতা শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদনের পর প্রজ্ঞাপন তৈরির কাজ এগিয়েছে। পরবর্তী সময়ে আইনগত যাচাই, চূড়ান্ত খসড়া এবং মুদ্রণসংক্রান্ত বিভিন্ন ধাপ সম্পন্ন করার কাজ চলছে।
১৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, প্রজ্ঞাপনের খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কাজ দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে।
আরও সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া এখন শেষ ধাপে; গেজেটের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট এসআরও এবং বেতন-ভাতা বাস্তবায়নের জন্য আইবাস++-এ প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের কাজও এগিয়ে চলছে।
অর্থাৎ গেজেটের নির্দিষ্ট দিন বা ঘণ্টা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা দাবি থাকলেও, সরকারি প্রজ্ঞাপন প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট সময়কে চূড়ান্ত ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
১১ বছরের অপেক্ষার আবেগ কেন এত গভীর?
সরকারি চাকরিজীবীদের কাছে পে-স্কেল কেবল বেতন বাড়ানোর একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দীর্ঘদিনের আর্থিক প্রত্যাশা, জীবনযাত্রার ব্যয়, পরিবার পরিচালনা, ভবিষ্যৎ সঞ্চয়, অবসরকালীন সুবিধা এবং চাকরিজীবনের মর্যাদার প্রশ্ন।
২০১৫ সালের জাতীয় বেতন স্কেলের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ায় নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। জাতীয় বেতন কমিশন-সংক্রান্ত প্রক্রিয়া, বিভিন্ন দাবি-দাওয়া, আন্দোলন এবং পরবর্তী সরকারি সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় ছিল।
এ কারণেই যারা দীর্ঘদিন ধরে দাবি আদায়ের আন্দোলন-সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাদের কাছে বর্তমান সময়টি নিছক একটি গেজেট প্রকাশের অপেক্ষা নয়; বরং দীর্ঘ একটি পথচলার সম্ভাব্য পরিণতির অপেক্ষা।
‘যারা আন্দোলনে ছিলেন না, তারা হয়তো সেই আনন্দটা বুঝবেন না’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কর্মচারীদের প্রতিক্রিয়ায় এই আবেগটি স্পষ্ট। দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামের সঙ্গে থাকা কর্মচারীরা মনে করছেন, অপেক্ষার প্রতিটি দিন, কর্মসূচি, দাবি এবং অনিশ্চয়তার অভিজ্ঞতা যারা কাছ থেকে দেখেছেন, গেজেটের অপেক্ষার বর্তমান উত্তেজনাও তারা অন্যভাবে অনুভব করছেন।
এখানে একটি তুলনা উঠে এসেছে—যেমন রোজা রাখার পর ঈদের আনন্দের অনুভূতি আলাদা, তেমনি দীর্ঘ অপেক্ষা ও সংগ্রামের পর কাঙ্ক্ষিত সিদ্ধান্তের কাছাকাছি পৌঁছানোর আনন্দও আলাদা।
তবে এই অনুভূতি ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হওয়াটাই স্বাভাবিক। যারা আন্দোলনে সরাসরি ছিলেন না, তারাও নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধাভোগী হিসেবে সমানভাবে আগ্রহী হতে পারেন। ফলে বিষয়টি মূলত প্রত্যাশা ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার পার্থক্য।
আনন্দের পাশাপাশি কেন গালাগালিও?
পে-স্কেলের গেজেট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গত কয়েকদিনে নানা ধরনের পোস্ট, সম্ভাব্য তারিখ এবং ‘আজই হবে’ ধরনের দাবি ছড়িয়েছে। এর ফলে কর্মচারীদের প্রত্যাশা যেমন বেড়েছে, তেমনি নির্দিষ্ট সময়ে গেজেট না হলে হতাশাও তৈরি হয়েছে।
কেউ আনন্দ প্রকাশ করছেন, কেউ অপেক্ষা করছেন, আবার কেউ কোনো পোস্ট বা মন্তব্যের সঙ্গে একমত না হয়ে গালাগালি করছেন। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই যিনি কোনো সম্ভাব্য সময়ের কথা বলেছেন, তিনি সেটিকে নিশ্চিত ঘোষণা হিসেবে দেননি।
এখানেই মূল বিষয়টি হলো—সম্ভাবনার কথা আর সরকারি ঘোষণা এক জিনিস নয়।
গেজেটের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের প্রমাণ একমাত্র সরকারি প্রজ্ঞাপন। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য বা সূত্রভিত্তিক তথ্য পরিস্থিতি বোঝাতে পারে, কিন্তু গেজেট প্রকাশের আগে সেটিকে চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
নতুন পে-স্কেলে কী থাকছে?
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে অনুমোদিত কাঠামোর বিভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে। এর মধ্যে ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। নবম গ্রেডের মূল বেতন ২২ হাজার টাকা থেকে ৪৪ হাজার টাকা করার তথ্যও প্রতিবেদনে এসেছে।
তবে নতুন বেতন কাঠামোর বর্ধিত মূল বেতন একবারে পুরোপুরি কার্যকর না করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের ক্ষেত্রে বর্ধিত অংশ বিভিন্ন ধাপে যুক্ত হওয়ার তথ্য এবং প্রথম থেকে নবম গ্রেডের ক্ষেত্রেও পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
নতুন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে—এমন তথ্যও প্রতিবেদনে এসেছে। তবে গেজেট প্রকাশ, বেতন পুনর্নির্ধারণ এবং আইবাস++-এ বাস্তবায়নের কারিগরি কাজ আলাদা প্রশাসনিক ধাপ।
এখন সবচেয়ে বড় অপেক্ষা—সরকারি প্রজ্ঞাপন
সব আলোচনা, প্রত্যাশা, গুজব, সম্ভাব্য তারিখ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের পর শেষ পর্যন্ত কর্মচারীদের অপেক্ষা একটি কাগজের জন্য—সরকারি গেজেট।
যেদিন সেই প্রজ্ঞাপন প্রকাশ হবে, সেদিনই দীর্ঘদিনের অপেক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটবে। তার আগে ‘আজ হবে’, ‘রাতে হবে’, ‘শনিবার হবে’ কিংবা ‘রবিবার হবে’—এসবকে সম্ভাবনা হিসেবে দেখা যেতে পারে, নিশ্চিত তথ্য হিসেবে নয়।
১১ বছরের অপেক্ষার আবেগ তাই অনেকের কাছে এখন চাঁদ রাতের অনুভূতির মতো—সবাই জানে ঈদ আসছে, কিন্তু ঠিক কখন চাঁদ দেখা যাবে, সেই মুহূর্তটির জন্যই অপেক্ষা।
আর এই অপেক্ষার মধ্যেই কেউ আনন্দ করছেন, কেউ উদ্বিগ্ন, কেউ হতাশ, কেউ আবার নীরবে প্রার্থনা করছেন—এবার যেন দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হয়।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নবম পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় আইনি, প্রশাসনিক ও কারিগরি ধাপ সম্পন্ন করছে।
তাই এখন সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বার্তা একটাই: অপেক্ষা করুন সরকারি প্রজ্ঞাপনের জন্য—গুজব বা অনুমানের জন্য নয়।


