আজ থেকে ধাপে ধাপে পে ফিক্সেশন ২০২৬: কোন বিভাগে কখন শুরু হবে, জেনে নিন
নতুন জাতীয় বেতনকাঠামো-২০২৬ অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন নির্ধারণ বা পে ফিক্সেশন কার্যক্রম আজ ৫ অক্টোবর থেকে গুরুত্বপূর্ণ ধাপে প্রবেশ করছে। সরকারি হিসাব ব্যবস্থাপনার সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম iBAS++-এর Pay Fixation Module ব্যবহার করে এ কার্যক্রম অনলাইনে সম্পন্ন করা হবে। অর্থ বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী ২০ অক্টোবরের মধ্যে পে ফিক্সেশন প্রক্রিয়া শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে নতুন বেতনকাঠামো কার্যকর হওয়ার পরও যেসব সরকারি চাকরিজীবী নতুন মূল বেতন হাতে পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন, তাদের জন্য এবার বাস্তব বেতন নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু হলো। তবে দেশের সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর পে ফিক্সেশন একই দিনে চালু হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট হিসাব কার্যালয় ও বিভাগ অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে এই সুবিধা চালু করা হচ্ছে।
৫ অক্টোবর থেকে শুরু হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ
প্রকাশিত সময়সূচি অনুযায়ী, ১ অক্টোবর থেকে কিছু নির্দিষ্ট হিসাব কার্যালয়ে কার্যক্রমের প্রথম ধাপ শুরু হয়েছে। এরপর আজ ৫ অক্টোবর থেকে ঢাকার সংশ্লিষ্ট সিএএফও কার্যালয়গুলোতে কার্যক্রম সম্প্রসারিত হচ্ছে। ৮ অক্টোবর থেকে ঢাকা ও রাজশাহীর সংশ্লিষ্ট মাঠপর্যায়ের হিসাব কার্যালয়গুলোও এর আওতায় আসবে।
অর্থাৎ, কোনো কর্মচারীর অফিস ঢাকায় হলেও তার পে ফিক্সেশন কোন তারিখে চালু হবে, তা শুধু কর্মস্থলের নাম দিয়ে নির্ধারণ করা যাবে না; কোন হিসাব কার্যালয়ের আওতায় অফিসটি রয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
বিভাগভিত্তিক পে ফিক্সেশনের সম্ভাব্য সময়সূচি
প্রকাশিত সময়সূচি অনুযায়ী ধাপে ধাপে কার্যক্রমটি হবে—
| বিভাগ/হিসাব কার্যালয় | পে ফিক্সেশন শুরুর তারিখ |
|---|---|
| ঢাকা বিভাগ—নির্ধারিত সিএএফও, অর্থ বিভাগ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এবং ডিএএফও, গাজীপুর | ১ অক্টোবর ২০২৬ |
| ঢাকার সকল সিএএফও কার্যালয় | ৫ অক্টোবর ২০২৬ |
| ঢাকা বিভাগের সংশ্লিষ্ট ডিসিএ এবং সকল ডিএএফও ও ইউএও | ৮ অক্টোবর ২০২৬ |
| রাজশাহী বিভাগের ডিসিএ, ডিএএফও ও ইউএও | ৮ অক্টোবর ২০২৬ |
| চট্টগ্রাম বিভাগের ডিসিএ, ডিএএফও ও ইউএও | ১২ অক্টোবর ২০২৬ |
| সিলেট বিভাগের ডিসিএ, ডিএএফও ও ইউএও | ১২ অক্টোবর ২০২৬ |
| ময়মনসিংহ বিভাগের ডিসিএ, ডিএএফও ও ইউএও | ১৫ অক্টোবর ২০২৬ |
| রংপুর বিভাগের ডিসিএ, ডিএএফও ও ইউএও | ১৫ অক্টোবর ২০২৬ |
| খুলনা বিভাগের ডিসিএ, ডিএএফও ও ইউএও | ১৮ অক্টোবর ২০২৬ |
| বরিশাল বিভাগের ডিসিএ, ডিএএফও ও ইউএও | ১৮ অক্টোবর ২০২৬ |
এই সূচি অনুযায়ী ১ অক্টোবর শুরু হওয়া কার্যক্রম ১৮ অক্টোবরের মধ্যে দেশের বিভিন্ন বিভাগ ও হিসাব কার্যালয়ে পর্যায়ক্রমে বিস্তৃত হওয়ার কথা।
তবে কোনো কর্মচারীর ক্ষেত্রে বাস্তবে পে ফিক্সেশন কখন করা যাবে, সেটি তার সংশ্লিষ্ট হিসাব কার্যালয়ের কার্যক্রম, অফিসের তথ্য প্রস্তুতি এবং iBAS++-এ তথ্যের প্রাপ্যতার ওপর নির্ভর করতে পারে।
কীভাবে হবে পে ফিক্সেশন?
নতুন বেতন নির্ধারণের প্রক্রিয়াটি অনলাইনে iBAS++-এর নির্ধারিত মডিউলের মাধ্যমে সম্পন্ন হবে। গেজেটেড কর্মকর্তা ও নন-গেজেটেড কর্মচারীদের লগইন পদ্ধতিতে পার্থক্য রাখা হয়েছে।
গেজেটেড কর্মকর্তারা তাদের নির্ধারিত User ID ও Password ব্যবহার করে সিস্টেমে প্রবেশ করবেন। অন্যদিকে নন-গেজেটেড কর্মচারীদের ক্ষেত্রে NID নম্বর ও জন্মতারিখ ব্যবহার করে প্রবেশের ব্যবস্থা রয়েছে। লগইনের সময় নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরে OTP পাঠানোর ব্যবস্থাও রয়েছে।
এরপর প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করে নতুন বেতন নির্ধারণের আবেদন/প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
কোন কোন তথ্য প্রস্তুত রাখতে হবে?
পে ফিক্সেশনের সময় তথ্যের সামান্য ভুলও পরবর্তী বেতন নির্ধারণে জটিলতা তৈরি করতে পারে। তাই কর্মচারীদের আগে থেকেই প্রয়োজনীয় তথ্য ও কাগজপত্র প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষ করে—
- জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য
- জন্মতারিখ
- বর্তমান পদবি
- বর্তমান গ্রেড
- চাকরিতে যোগদানের তারিখ
- ৩০ জুন ২০২৬ তারিখের মূল বেতন
- সর্বশেষ ইনক্রিমেন্টের তথ্য
- পূর্ববর্তী পে ফিক্সেশনের তথ্য
- পদোন্নতির তথ্য
- বদলির তথ্য
- উচ্চতর গ্রেডের তথ্য
- টাইম স্কেল/সিলেকশন গ্রেড সংক্রান্ত তথ্য
- সংশ্লিষ্ট অফিস আদেশ ও প্রমাণপত্র
প্রয়োজনে এসব তথ্য সার্ভিস বুক ও সংশ্লিষ্ট অফিস নথির সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হবে।
পুরোনো বেতনের তথ্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
নতুন পে স্কেলে পে ফিক্সেশন করার আগে পূর্ববর্তী বেতনকাঠামোর বেতন-ভাতা সংক্রান্ত তথ্য সঠিকভাবে সম্পন্ন ও সাবমিট করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। প্রকাশিত নির্দেশনায় জুন ২০২৬ এবং পরবর্তী মাসগুলোর পুরোনো স্কেল অনুযায়ী বেতন-ভাতা সংক্রান্ত তথ্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ, কর্মচারীর পুরোনো বেতন হিসাব, ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতি বা উচ্চতর গ্রেডের তথ্য যদি iBAS++ বা সংশ্লিষ্ট অফিসের রেকর্ডে সঠিকভাবে না থাকে, তাহলে নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারণের সময় সমস্যা দেখা দিতে পারে।
ভুল তথ্য দিলে কী সমস্যা হতে পারে?
পে ফিক্সেশনের সময় নাম, NID নম্বর, জন্মতারিখ, পদবি, গ্রেড কিংবা মূল বেতনের তথ্য ভুল দেওয়া হলে নতুন বেতন নির্ধারণে অসঙ্গতি তৈরি হতে পারে। একইভাবে অতীতে পাওয়া পদোন্নতি, উচ্চতর গ্রেড বা ইনক্রিমেন্টের তথ্য বাদ পড়লেও নতুন মূল বেতন ভুলভাবে নির্ধারিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তাই শুধু নতুন বেতন কত হচ্ছে সেটি দেখলেই হবে না; ৩০ জুন ২০২৬-এর মূল বেতন থেকে শুরু করে চাকরিজীবনের প্রাসঙ্গিক বেতন নির্ধারণের ইতিহাসও যাচাই করা জরুরি।
অক্টোবরের বেতনের সঙ্গে কি বকেয়া টাকা পাওয়া যাবে?
নতুন বেতনকাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হওয়ায় জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসের বেতন পার্থক্যের হিসাব তৈরি হবে। পে ফিক্সেশন সম্পন্ন হওয়ার পর নতুন বেতন অনুযায়ী বকেয়া বা এরিয়ার হিসাব করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (BSS) জানিয়েছে, নতুন বেতন কাঠামোর আওতায় সরকারি চাকরিজীবীরা অক্টোবরের বেতনের সঙ্গে প্রায় তিন মাসের বকেয়া পেতে পারেন। তবে কে কত টাকা পাবেন, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর গ্রেড, পুরোনো মূল বেতন, নতুন নির্ধারিত মূল বেতন এবং কার্যকর তারিখের ওপর।
তাই সবার বকেয়া একই অঙ্কের হবে না।
কেন ধাপে ধাপে করা হচ্ছে?
একসঙ্গে দেশের সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর পে ফিক্সেশন চালু না করে হিসাব কার্যালয়ভিত্তিক পর্যায়ে পর্যায়ে কার্যক্রম চালুর মূল উদ্দেশ্য হলো বিপুলসংখ্যক কর্মচারীর তথ্য, বেতন রেকর্ড ও সংশ্লিষ্ট অফিসের তথ্যব্যবস্থাপনা সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করা।
স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের ক্ষেত্রেও ৪ অক্টোবরের একটি অফিস আদেশে অধীন বিভিন্ন অধিদপ্তর, পরিদপ্তর ও মাঠপর্যায়ের কার্যালয়ে কর্মরত জনবলের পূর্ণাঙ্গ তথ্য iBAS++-এর Organogram Sub-Module-এ অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। এটি দেখায় যে পে ফিক্সেশনের আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জনবল ও সাংগঠনিক তথ্য সঠিকভাবে সিস্টেমে থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
কর্মচারীদের এখন কী করা উচিত?
আজ থেকে যাদের সংশ্লিষ্ট হিসাব কার্যালয়ে পে ফিক্সেশন চালু হয়েছে, তাদের অযথা তাড়াহুড়া না করে প্রথমে তথ্য যাচাই করা উচিত।
প্রথম কাজ: ৩০ জুন ২০২৬ তারিখের মূল বেতন সঠিক আছে কি না যাচাই করা।
দ্বিতীয় কাজ: সর্বশেষ ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতি, উচ্চতর গ্রেড বা অন্য কোনো বেতন-নির্ধারণের ঘটনা থাকলে সেটি রেকর্ডে আছে কি না দেখা।
তৃতীয় কাজ: NID, জন্মতারিখ, পদবি ও গ্রেডের তথ্য মিলিয়ে দেখা।
চতুর্থ কাজ: iBAS++-এ নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর সচল রাখা, যাতে OTP গ্রহণে সমস্যা না হয়।
পঞ্চম কাজ: পে ফিক্সেশন সম্পন্ন হওয়ার পর নতুন মূল বেতন, গ্রেড এবং সংশ্লিষ্ট হিসাব ভালোভাবে যাচাই করা।
শেষ কথা
নতুন জাতীয় বেতনকাঠামো-২০২৬ কার্যকর হওয়ার পর এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো সঠিকভাবে পে ফিক্সেশন সম্পন্ন করা। ৫ অক্টোবর থেকে কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হচ্ছে এবং প্রকাশিত সূচি অনুযায়ী ৮, ১২, ১৫ ও ১৮ অক্টোবর বিভিন্ন বিভাগ পর্যায়ক্রমে এর আওতায় আসবে।
অর্থ বিভাগের লক্ষ্য অনুযায়ী ২০ অক্টোবরের মধ্যে পে ফিক্সেশন শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর নতুন বেতন অনুযায়ী নিয়মিত বেতন ও জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের বকেয়া হিসাবের বিষয়টি সামনে আসবে।
তবে বিভাগভিত্তিক তারিখ জানা থাকলেও প্রত্যেক কর্মচারীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিজের অফিস কোন হিসাব কার্যালয়ের আওতায় এবং সেখানে iBAS++ পে ফিক্সেশন কার্যক্রম চালু হয়েছে কি না—তা নিশ্চিত হওয়া। কারণ একই বিভাগের সব অফিস একই দিনে কার্যক্রমের আওতায় নাও আসতে পারে।
সুতরাং সরকারি চাকরিজীবীদের এখন থেকেই নিজেদের বেতন-সংক্রান্ত পুরোনো তথ্য, সার্ভিস রেকর্ড ও প্রয়োজনীয় অফিস আদেশ প্রস্তুত রাখা এবং পে ফিক্সেশনের পর নির্ধারিত নতুন মূল বেতনটি পুরোনো রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।




