ই-রিটার্নে সংশোধিত আয়কর রিটার্নের নতুন অপশন, ১৮০ দিনের মধ্যে একবার সংশোধনের সুযোগ
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ই-রিটার্ন সিস্টেমে করদাতাদের জন্য ‘Revised Return U/S-180(2)’ অপশন রয়েছে। এর মাধ্যমে অনলাইনে আগে দাখিল করা আয়কর রিটার্নে ভুল, আয়ের তথ্যের অসংগতি কিংবা কর হিসাবের ত্রুটি সংশোধনের সুযোগ পাওয়া যায়। তবে সংশোধিত রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়সীমা, সংশোধনের সংখ্যা এবং আইনি শর্ত মানতে হয়।
২০২৬-২০২৭ করবর্ষের ই-রিটার্ন পোর্টালের একটি স্ক্রিনশটে Assessment Year 2026–2027 নির্বাচন করা অবস্থায় Submission মেনুর অধীনে ‘Regular e-Return’ ও ‘Revised Return U/S-180(2)’ অপশন দেখা গেছে। ফলে সংশোধিত রিটার্নের অপশনটি কীভাবে কাজ করে, কারা এটি ব্যবহার করতে পারবেন এবং রিটার্ন সংশোধনের আগে কী কী বিষয় জানা প্রয়োজন—তা নিয়ে করদাতাদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
এনবিআরের সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত আয়কর আইন ও ই-রিটার্নসংক্রান্ত নির্দেশনা অনুযায়ী, সংশোধিত রিটার্নের বিষয়টি আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৮০-এর উপধারা (২) এবং সংশ্লিষ্ট বিধানের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে পোর্টালে অপশনটি দৃশ্যমান হওয়া মানেই প্রত্যেক করদাতা যেকোনো পরিস্থিতিতে সংশোধনের সুযোগ পাবেন, এমন নয়।
Revised Return U/S-180(2) কী?
Revised Return-এর বাংলা অর্থ সংশোধিত আয়কর রিটার্ন। কোনো করদাতা মূল আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার পর বুঝতে পারেন যে তাঁর রিটার্নে আয়, কর অব্যাহতি, কর রেয়াত বা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ভুলভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। ফলে প্রদেয় কর সঠিকভাবে হিসাব করা হয়নি অথবা রিটার্নে প্রয়োজনীয় তথ্য সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়নি। নির্ধারিত শর্ত পূরণ হলে তিনি সংশোধিত রিটার্ন দাখিল করতে পারেন।
এখানে U/S-এর অর্থ Under Section, অর্থাৎ কোনো আইনের নির্দিষ্ট ধারার অধীনে। আর ১৮০(২) বলতে আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৮০-এর উপধারা (২)-কে বোঝানো হয়েছে।
আইনটির এই বিধান অনুযায়ী, মূল রিটার্ন দাখিলের পর করদাতা যদি দেখেন যে আয় বা কর-সংশ্লিষ্ট তথ্যের কারণে প্রদেয় কর সঠিকভাবে হিসাব করা হয়নি কিংবা রিটার্নে কোনো তথ্য সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়নি, তাহলে কারণ উল্লেখ করে সংশোধিত রিটার্ন দাখিলের সুযোগ রয়েছে।
মূল রিটার্ন জমা দেওয়ার কত দিনের মধ্যে সংশোধন করা যাবে?
সংশোধিত রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সময়সীমা। আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৮০-এর উপধারা (৩) অনুযায়ী, সাধারণ নিয়মে মূল রিটার্ন দাখিলের তারিখ থেকে ১৮০ দিন অতিক্রম করার পর সংশোধিত রিটার্ন দাখিল করা যায় না।
একই সঙ্গে আইনে আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রথমবার সংশোধিত রিটার্ন দাখিল করার পর একই বিধানের অধীনে দ্বিতীয়বার সংশোধিত রিটার্ন দাখিল করা যায় না। আবার মূল রিটার্নটি ধারা ১৮২ অনুযায়ী অডিটের জন্য নির্বাচিত হলেও এই বিধানের অধীনে সংশোধিত রিটার্ন দাখিলের সুযোগ থাকে না।
অর্থাৎ, সাধারণভাবে তিনটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে—
১. মূল রিটার্ন দাখিলের তারিখ থেকে ১৮০ দিনের সময়সীমা অতিক্রম করা যাবে না।
২. সংশোধিত রিটার্ন দাখিলের সুযোগ একবার।
৩. মূল রিটার্ন অডিটের জন্য নির্বাচিত হয়ে থাকলে এই বিধানের অধীনে সংশোধিত রিটার্ন দাখিল করা যাবে না।
তাই রিটার্ন জমা দেওয়ার পর ভুল ধরা পড়লে দ্রুত তা যাচাই করা উচিত। তবে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কোন বিধান প্রযোজ্য হবে, তা সংশ্লিষ্ট আইন ও এনবিআরের নির্দেশনা অনুসারে নির্ধারণ করতে হবে।
কোন কোন ভুল সংশোধন করা যেতে পারে?
আয়কর রিটার্নে বিভিন্ন ধরনের ভুল থাকতে পারে। যেমন, কোনো চাকরিজীবী বেতন, বোনাস বা অন্যান্য আয় হিসাব করার সময় ভুল করেছেন। কোনো করদাতা ব্যাংক আমানতের সুদ বা বাড়িভাড়ার আয় দেখাতে ভুলে গেছেন। আবার কেউ উৎসে কর্তিত কর, কর রেয়াত বা সম্পদ-দায়ের তথ্য সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে পারেননি।
এসব ক্ষেত্রে সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে। তবে সংশোধনযোগ্যতার বিষয়টি ভুলের ধরন, প্রযোজ্য আইন এবং সংশ্লিষ্ট রিটার্নের অবস্থার ওপর নির্ভর করবে।
যেসব তথ্য পুনরায় যাচাই করা প্রয়োজন:
- চাকরি বা পেশা থেকে অর্জিত মোট আয়;
- বাড়িভাড়া, ব্যাংক সুদ ও অন্যান্য উৎসের আয়;
- প্রযোজ্য কর অব্যাহতি ও কর রেয়াতের তথ্য;
- উৎসে কর্তিত বা অগ্রিম পরিশোধিত কর;
- সম্পদ, দায় ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের তথ্য;
- মোট করযোগ্য আয় এবং চূড়ান্ত প্রদেয় করের হিসাব।
সংশোধিত রিটার্ন দাখিলের আগে সংশ্লিষ্ট আয়, ব্যয়, বিনিয়োগ ও কর পরিশোধের কাগজপত্র মিলিয়ে দেখা জরুরি। শুধু কর কমানোর উদ্দেশ্যে তথ্য পরিবর্তন করা আইনসম্মত সংশোধনের বিকল্প নয়।
ই-রিটার্ন পোর্টালে কীভাবে সংশোধিত রিটার্ন দাখিল করবেন?
এনবিআরের ই-রিটার্ন পোর্টালে সংশোধিত রিটার্নের জন্য আলাদা অপশন রয়েছে। সাধারণভাবে করদাতাকে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করতে হবে—
প্রথম ধাপ: এনবিআরের সরকারি ই-রিটার্ন পোর্টাল https://etaxnbr.gov.bd/ -এ প্রবেশ করে নিজের অ্যাকাউন্টে লগইন করতে হবে।
দ্বিতীয় ধাপ: সংশ্লিষ্ট Assessment Year নির্বাচন করতে হবে। মূল রিটার্ন যে করবর্ষের জন্য দাখিল করা হয়েছিল, সেই রিটার্নের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে সঠিক করবর্ষ নির্বাচন করা জরুরি।
তৃতীয় ধাপ: বাম পাশের Submission মেনুতে প্রবেশ করতে হবে।
চতুর্থ ধাপ: সেখানে থাকা ‘Revised Return U/S-180(2)’ অপশনটি নির্বাচন করতে হবে।
পঞ্চম ধাপ: সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা যাচাই করে রিটার্নের প্রাসঙ্গিক তথ্যগুলো পর্যালোচনা করতে হবে। ভুল আয়, কর রেয়াত, উৎসে কর কিংবা অন্য কোনো তথ্য থাকলে তা সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী সংশোধন করতে হবে।
ষষ্ঠ ধাপ: সংশোধিত হিসাবের ভিত্তিতে মোট আয়, করযোগ্য আয়, কর রেয়াত, উৎসে কর এবং চূড়ান্ত প্রদেয় কর পুনরায় যাচাই করতে হবে।
সপ্তম ধাপ: পোর্টালে প্রদর্শিত নির্দেশনা অনুসরণ করে সংশোধিত রিটার্ন দাখিল সম্পন্ন করতে হবে এবং জমা দেওয়ার প্রমাণ সংরক্ষণ করতে হবে।
উল্লেখ্য, পোর্টালের পর্দায় প্রদর্শিত অপশন ও ধাপ সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই চূড়ান্তভাবে জমা দেওয়ার আগে পোর্টালের বর্তমান নির্দেশনা অনুসরণ করা উচিত।
সংশোধিত রিটার্ন দিলে কি অতিরিক্ত কর দিতে হবে?
সংশোধিত রিটার্ন দাখিলের পর করের পরিমাণ বাড়তেও পারে, কমতেও পারে। এটি নির্ভর করবে মূল রিটার্নে কী ধরনের ভুল ছিল এবং সংশোধনের পর সঠিক আয় ও করের হিসাব কত দাঁড়ায় তার ওপর।
উদাহরণ হিসেবে, একজন চাকরিজীবী তাঁর মূল রিটার্নে ৫০ হাজার টাকা বোনাসের আয় দেখাতে ভুলে গেলেন। সংশোধনের মাধ্যমে ওই আয় অন্তর্ভুক্ত করার পর তাঁর মোট করযোগ্য আয় বেড়ে যেতে পারে। ফলে প্রযোজ্য করহারের ভিত্তিতে অতিরিক্ত কর পরিশোধের প্রয়োজন হতে পারে।
অন্যদিকে, কোনো করদাতা প্রযোজ্য কর রেয়াত বা উৎসে কর্তিত করের তথ্য ভুলভাবে উপস্থাপন করলে সংশোধনের পর করের হিসাব পরিবর্তিত হতে পারে। তবে সংশোধিত রিটার্ন দাখিল করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে কর ফেরত পাওয়া যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
এ কারণে সংশোধনের আগে এবং পরে করের হিসাব ভালোভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। অতিরিক্ত কর বা অন্য কোনো অর্থ পরিশোধের প্রয়োজন হলে প্রযোজ্য আইন ও পোর্টালের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
২০২৬-২০২৭ করবর্ষে করদাতাদের কী সতর্কতা প্রয়োজন?
২০২৬-২০২৭ করবর্ষের ই-রিটার্ন পোর্টালে Assessment Year 2026–2027 নির্বাচন করা দেখা গেলেও শুধু স্ক্রিনশটের ভিত্তিতে সব করদাতার জন্য সংশোধিত রিটার্নের সব শর্ত নিশ্চিত করা যায় না। করদাতাকে নিজের মূল রিটার্ন দাখিলের তারিখ, সংশোধনের ইতিহাস এবং অডিট-সংক্রান্ত অবস্থা যাচাই করতে হবে।
বিশেষ করে যাঁরা ইতোমধ্যে রিটার্ন জমা দিয়েছেন, তাঁদের প্রথমে নির্ধারণ করতে হবে—রিটার্নে আদৌ কোনো ভুল রয়েছে কি না। ভুল থাকলে তা আয়, কর রেয়াত, উৎসে কর, সম্পদ-দায় কিংবা অন্য কোনো তথ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, সেটিও চিহ্নিত করা জরুরি।
যাঁদের মূল রিটার্ন অডিটের জন্য নির্বাচিত হয়েছে অথবা ১৮০ দিনের সময়সীমা পেরিয়ে গেছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এই অপশন ব্যবহার করার আগে সংশ্লিষ্ট কর সার্কেলের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সংশোধিত রিটার্ন ও নতুন রিটার্ন কি একই?
না। Regular e-Return সাধারণত নির্দিষ্ট করবর্ষের জন্য মূল রিটার্ন দাখিলের প্রক্রিয়া। অন্যদিকে, Revised Return U/S-180(2) হলো আগে দাখিল করা রিটার্নে নির্দিষ্ট ভুল বা অসংগতি সংশোধনের জন্য প্রযোজ্য পৃথক প্রক্রিয়া।
তাই মূল রিটার্ন এখনো দাখিল না করে থাকলে সংশোধিত রিটার্নের পরিবর্তে প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী মূল রিটার্ন দাখিল করতে হবে। আর মূল রিটার্ন ইতোমধ্যে জমা দেওয়া থাকলে সংশোধনের প্রয়োজন, সময়সীমা ও আইনি যোগ্যতা যাচাই করে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে হবে।
করদাতাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা
আয়কর রিটার্ন দাখিলের পর ভুল ধরা পড়লে সেটি উপেক্ষা না করে আইনসম্মতভাবে সংশোধনের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, সংশোধিত রিটার্ন দাখিলের সুযোগ সীমাহীন নয়। ১৮০ দিনের সময়সীমা, একবার সংশোধনের সীমা এবং অডিটের জন্য নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
এনবিআরের ই-রিটার্ন পোর্টালে ‘Revised Return U/S-180(2)’ অপশনটি করদাতাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলেও এটি ব্যবহারের আগে রিটার্নের তথ্য ও করের হিসাব ভালোভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর সার্কেল বা কর পেশাজীবীর পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।



