আয়কর । ভ্যাট । আবগারি শুল্ক

ই-টিন থাকলেও আয়কর রিটার্ন জমা না দিলে জরিমানা? ৫ হাজার টাকা নিয়ে যা জানা জরুরি

বাংলাদেশে যেসব করদাতার ই-টিন (e-TIN) রয়েছে, তাঁদের আয়কর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি। নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন জমা না দিলে কর আইন অনুযায়ী জরিমানা ও অন্যান্য আর্থিক জটিলতার মুখে পড়তে হতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে ই-টিন নিবন্ধন করেও আয়কর রিটার্ন জমা দেননি, তাঁদের নিজেদের কর-সংক্রান্ত অবস্থা যাচাই করা প্রয়োজন।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ই-টিন থাকা সত্ত্বেও রিটার্ন জমা না দেওয়ার কারণে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করার বিষয়ে একটি তথ্যচিত্র ছড়িয়ে পড়েছে। তবে বিষয়টি বুঝতে হলে আয়কর আইন, রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা এবং জরিমানা নির্ধারণের নিয়ম আলাদাভাবে জানা প্রয়োজন। ই-টিন থাকলেই সবার ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ৫ হাজার টাকা জরিমানা হবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। করদাতার পরিস্থিতি, প্রযোজ্য আইন এবং সংশ্লিষ্ট কর কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ই-টিন থাকলে কি আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক?

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৬৬-সহ সংশ্লিষ্ট বিধানগুলোতে নির্দিষ্ট শ্রেণির করদাতার জন্য আয়কর রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। শুধু আয় করমুক্ত সীমার নিচে থাকার কারণে সবাই রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত—এমন নয়।

সাধারণভাবে নিম্নলিখিত ব্যক্তিদের রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে:

  • যাঁদের বার্ষিক আয় প্রযোজ্য করমুক্ত সীমা অতিক্রম করে।

  • যাঁদের পূর্ববর্তী নির্ধারিত বছরগুলোতে কর নির্ধারণ করা হয়েছে বা যাঁদের ক্ষেত্রে আইনের নির্ধারিত শর্ত প্রযোজ্য।

  • সরকারি কর্মচারীসহ আইন দ্বারা নির্দিষ্ট শ্রেণির ব্যক্তি।

  • কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার পরিচালক বা শেয়ারহোল্ডার কর্মচারী এবং ফার্মের অংশীদার।

  • যাঁদের নির্দিষ্ট সেবা গ্রহণ বা আইনগত প্রয়োজনে আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ দিতে হয়।

তবে প্রত্যেক করদাতার ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রযোজ্য ধরে নেওয়া যাবে না। নিজের পেশা, আয়, নিবন্ধন এবং প্রযোজ্য আইনি বিধান যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

রিটার্ন জমা না দিলে ৫ হাজার টাকা জরিমানা কি সত্য?

এ প্রশ্নের উত্তর জানতে আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ২৬৬ গুরুত্বপূর্ণ। এ ধারায় যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া নির্ধারিত রিটার্ন দাখিল করতে ব্যর্থ হলে জরিমানা আরোপের বিধান রয়েছে। তবে ৫ হাজার টাকা সব করদাতার জন্য নির্দিষ্ট বা স্বয়ংক্রিয় জরিমানা নয়।

আইনের বিধান অনুযায়ী বিষয়টি সংক্ষেপে নিচে তুলে ধরা হলো।

বিষয়আইনে উল্লেখিত বিধান
জরিমানার প্রাথমিক হিসাবসর্বশেষ নিরূপিত আয়ের ওপর ধার্য করের ১০ শতাংশ
ন্যূনতম জরিমানা১,০০০ টাকা
অব্যাহত ব্যর্থতার অতিরিক্ত জরিমানাপ্রতিদিন ৫০ টাকা
আগে আয় নিরূপণ হয়নি—এমন ব্যক্তির সর্বোচ্চ জরিমানা৫,০০০ টাকা
আগে আয় নিরূপণ হয়েছে—এমন ব্যক্তির সর্বোচ্চ জরিমানাসর্বশেষ নিরূপিত আয়ের ওপর প্রদেয় করের ৫০ শতাংশ অথবা ১,০০০ টাকা—যেটি বেশি

সূত্র: আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ২৬৬(১)। জরিমানার প্রয়োগ সংশ্লিষ্ট আইনি শর্ত, করদাতার অবস্থা এবং কর কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।

অর্থাৎ, যাঁর আগে কোনো আয় নিরূপণ করা হয়নি, তাঁর ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। অন্যদিকে, আগে আয় নিরূপণ হয়ে থাকলে জরিমানার সীমা ভিন্ন হতে পারে।

এ কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ‘ই-টিন থাকলেই ৫ হাজার টাকা জরিমানা’—এ ধরনের বক্তব্যকে সবার জন্য প্রযোজ্য সাধারণ নিয়ম হিসেবে উপস্থাপন করা যথাযথ নয়।

আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার শেষ তারিখ কখন?

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রকাশিত সাধারণ নির্দেশনা অনুযায়ী, স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতার জন্য সাধারণ করদিবস ৩০ নভেম্বর। তবে এনবিআর কোনো নির্দিষ্ট করবর্ষের জন্য সময়সীমা বাড়ালে সংশ্লিষ্ট বর্ধিত সময়সীমা প্রযোজ্য হবে।

রিটার্ন জমার সময়সীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে:

1. সংশ্লিষ্ট করবর্ষের নির্ধারিত করদিবস।

2. এনবিআরের পক্ষ থেকে সময় বাড়ানোর কোনো প্রজ্ঞাপন বা নির্দেশনা রয়েছে কি না।

3. করদাতার ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো সময়সীমা প্রযোজ্য কি না।

নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন জমা দিতে না পারলে বিষয়টি উপেক্ষা না করে যত দ্রুত সম্ভব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তবে দেরিতে রিটার্ন জমা দেওয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর, সুদ বা জরিমানার হিসাব ব্যক্তিভেদে আলাদা হতে পারে।

ই-টিনধারীদের এখন কী করণীয়?

যাঁরা ই-টিন নিয়েছেন কিন্তু রিটার্ন জমা দিয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত নন, তাঁদের প্রথমেই নিজেদের কর-সংক্রান্ত রেকর্ড যাচাই করা উচিত।

১. ই-রিটার্ন পোর্টালে প্রবেশ করুন

এনবিআরের অফিসিয়াল ই-রিটার্ন পোর্টাল etaxnbr.gov.bd-এ প্রবেশ করে নিজের অ্যাকাউন্টে লগইন করুন।

২. রিটার্ন জমার রেকর্ড যাচাই করুন

কোন করবর্ষের রিটার্ন জমা হয়েছে, রিটার্নের প্রাপ্তিস্বীকার বা সংশ্লিষ্ট কর-রেকর্ড আছে কি না, তা পরীক্ষা করুন। শুধু ই-টিন সনদ থাকলেই রিটার্ন জমা হয়েছে বলে ধরে নেবেন না।

৩. বকেয়া রিটার্ন থাকলে ব্যবস্থা নিন

যে করবর্ষের রিটার্ন দাখিল করা হয়নি, সেটি শনাক্ত করে প্রযোজ্য নিয়মে রিটার্ন জমা দিন। দেরির কারণে কোনো কর, সুদ বা জরিমানা প্রযোজ্য হলে তার হিসাবও যাচাই করুন।

৪. জরিমানার নোটিশ থাকলে কর অফিসে যোগাযোগ করুন

অ্যাকাউন্টে জরিমানার তথ্য বা নোটিশ দেখা গেলে সংশ্লিষ্ট কর সার্কেলের সঙ্গে যোগাযোগ করে জরিমানার ভিত্তি, করবর্ষ এবং পরিশোধের নিয়ম নিশ্চিত করুন।

ই-টিন আছে, কিন্তু আয় করযোগ্য নয়—তাহলে কী করবেন?

অনেক ব্যক্তি ব্যাংকিং, সম্পত্তি নিবন্ধন, ঋণ গ্রহণ কিংবা অন্য কোনো প্রয়োজনের জন্য ই-টিন নিবন্ধন করেছেন। পরবর্তী সময়ে তাঁদের আয় কমে যেতে পারে অথবা তাঁরা আর সংশ্লিষ্ট সেবা গ্রহণ নাও করতে পারেন। এ অবস্থায় রিটার্নের বাধ্যবাধকতা আছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।

এনবিআরের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, আয় করযোগ্য সীমার নিচে নেমে গেলে এবং ভবিষ্যতেও করযোগ্য আয়ের আওতায় আসার সম্ভাবনা না থাকলে সংশ্লিষ্ট কর সার্কেলের উপকর কমিশনারের কাছে কারণ ব্যাখ্যা করে টিআইএন বাতিলের আবেদন করা যেতে পারে। কর্তৃপক্ষ যাচাই বা শুনানির পর প্রযোজ্য সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

তবে শুধু আয় কমে যাওয়া বা বর্তমানে কর দিতে না হওয়ার কারণে নিজে থেকে ই-টিন নিষ্ক্রিয় ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা এবং টিআইএন বাতিলের বিষয় দুটি আলাদা করে বিবেচনা করতে হবে।

অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়ার আগে যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকবেন

  • সঠিক করবর্ষ নির্বাচন করুন।

  • আয়, বিনিয়োগ, সম্পদ ও দায়ের তথ্য যথাযথভাবে পূরণ করুন।

  • প্রযোজ্য কর, অগ্রিম কর এবং উৎসে কর্তিত করের তথ্য যাচাই করুন।

  • রিটার্ন জমা দেওয়ার পর প্রাপ্তিস্বীকার বা সংশ্লিষ্ট রেকর্ড সংরক্ষণ করুন।

  • অপরিচিত ব্যক্তি বা অননুমোদিত ওয়েবসাইটে এনআইডি, টিআইএন, পাসওয়ার্ড কিংবা আর্থিক তথ্য দেবেন না।

২০২৬–২৭ করবর্ষে অনলাইন রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা সম্পর্কেও এনবিআরের নির্দেশনা রয়েছে; তবে নির্দিষ্ট শ্রেণির করদাতাদের জন্য ব্যতিক্রম এবং অনুমোদিত বিকল্প পদ্ধতি থাকতে পারে।

শেষ কথা

ই-টিন থাকা সত্ত্বেও আয়কর রিটার্ন জমা না দিয়ে থাকলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। তবে ৫ হাজার টাকা জরিমানার প্রচারিত তথ্য দেখে আতঙ্কিত না হয়ে নিজের রিটার্নের অবস্থা যাচাই করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ২৬৬ অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থতার জন্য জরিমানার বিধান রয়েছে। কিন্তু জরিমানার পরিমাণ নির্ধারণে করদাতার পূর্ববর্তী আয় নিরূপণ, ব্যর্থতার ধরন এবং আইনের প্রযোজ্য শর্ত বিবেচনা করতে হয়। তাই সবার ক্ষেত্রে একই অঙ্কের জরিমানা হবে—এমন দাবি সঠিক নয়।

নিজের ই-রিটার্নের অবস্থা যাচাই করতে এনবিআরের অফিসিয়াল পোর্টাল ব্যবহার করুন: https://etaxnbr.gov.bd/

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *