আয়কর । ভ্যাট । আবগারি শুল্ক

রিটার্ন না দেওয়ায় ই-রিটার্নে ৫ হাজার টাকা জরিমানা দেখাচ্ছে? আতঙ্কিত না হয়ে যা করবেন

টিন সার্টিফিকেট নেওয়ার পর এক বা একাধিক বছর রিটার্ন জমা দেননি, এমন অনেক করদাতা এবার অনলাইনে রিটার্ন দাখিল করতে গিয়ে চমকে উঠছেন। সিস্টেমে প্রতিটি বকেয়া বছরের জন্য ৫,০০০ টাকা করে জরিমানা দেখাচ্ছে। যাঁদের করযোগ্য আয় নেই এবং যাঁরা কেবল শূন্য করের রিটার্ন (প্রচলিত ভাষায় “জিরো রিটার্ন”) দিতে চান, তাঁদের দুশ্চিন্তা আরও বেশি।

তবে আইন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রিটার্ন না দিলেই সবার ওপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে ৫,০০০ টাকা জরিমানা আরোপ হয় না। যৌক্তিক কারণ দেখিয়ে আবেদন করলে জরিমানা মওকুফের সুযোগও রয়েছে।

এক করদাতার অভিজ্ঞতা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে “সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ” শিরোনামে এক করদাতা তাঁর অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন। তিনি ২০২৪ সালে টিন সার্টিফিকেট খোলেন, কিন্তু ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ কর বছরের রিটার্ন জমা দেননি। চলতি ২০২৬-২৭ কর বছরের রিটার্ন জমা দিতে গিয়ে তিনি দেখেন, দুই বছরের জন্য ৫,০০০ টাকা করে মোট ১০,০০০ টাকা জরিমানা দেখাচ্ছে।

তাঁর পরামর্শ: টিন সার্টিফিকেটে উল্লিখিত কর অফিসে গিয়ে নির্ধারিত ফরম পূরণ করুন। সঙ্গে রিটার্ন না দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে জরিমানা মওকুফ চেয়ে একটি আবেদনপত্র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে জমা দিন। পরবর্তী করণীয় কর অফিসই জানিয়ে দেবে। তাঁর মতে, করযোগ্য আয় না থাকলে অযথা টেনশনের কারণ নেই।

আইন কী বলছে: ধারা ২৬৬

আয়কর আইন, ২০২৩-এর ২৬৬ ধারায় রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থতার জন্য জরিমানার বিধান রয়েছে। আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থ হলে উপকর কমিশনার জরিমানা আরোপ করতে পারেন। লক্ষণীয় বিষয় হলো আইনের ভাষা: কর্মকর্তা জরিমানা আরোপ “করতে পারবেন”। অর্থাৎ এটি কর কর্মকর্তার বিবেচনামূলক ক্ষমতা, স্বয়ংক্রিয় বা বাধ্যতামূলক শাস্তি নয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ই-রিটার্ন সিস্টেমে যে অঙ্ক দেখাচ্ছে তা আইনে নির্ধারিত সম্ভাব্য সর্বোচ্চ জরিমানার হিসাব হতে পারে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন সংশ্লিষ্ট কর কর্মকর্তা। bdservicerules

জরিমানার পরিমাণ নির্ভর করে করদাতার অবস্থার ওপর:

করদাতার ধরনসম্ভাব্য জরিমানা
আগে কখনো আয় নিরূপণ হয়নি (নতুন করদাতা)সর্বোচ্চ ৫,০০০ টাকা
আগে আয় নিরূপণ হয়েছেসর্বশেষ নিরূপিত করের ৫০% অথবা ১,০০০ টাকা, যেটি বেশি
ব্যর্থতা অব্যাহত থাকলেপ্রতিদিন অতিরিক্ত ৫০ টাকা পর্যন্ত

নতুন করদাতা, যাঁদের কর আগে নিরূপণ হয়নি, তাঁদের ক্ষেত্রে জরিমানা ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। অর্থাৎ ৫,০০০ টাকা হলো সর্বোচ্চ সীমা, সবার জন্য নির্ধারিত অঙ্ক নয়।

মওকুফের নজির

রিটার্ন দেরিতে দেওয়ার জরিমানা নিয়ে এর আগেও এনবিআর নমনীয়তা দেখিয়েছে। এক সময় এনবিআর চেয়ারম্যান স্পষ্ট করেছিলেন, জরিমানা দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়; করদাতা যৌক্তিক কারণ দেখাতে পারলে তা মওকুফ করা হবে, তবে কারণ কমিশনারের কাছে যুক্তিসঙ্গত মনে না হলে জরিমানা দিতে হবে।

২০২২ সালের বাজেটে বকেয়া রিটার্নধারীদের জন্য সাধারণ ক্ষমাও দেওয়া হয়েছিল। এনবিআর কর্মকর্তারা তখন জানিয়েছিলেন, টিনধারীদের রিটার্ন জমায় উৎসাহিত করতেই এই সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যেখানে আগে এমন করদাতাদের বিগত বছরের জন্য ন্যূনতম ৫,০০০ টাকা জরিমানা গুনতে হতো।

কেন এত মানুষ এই সমস্যায়?

ব্যাংক হিসাব, সঞ্চয়পত্র, ট্রেড লাইসেন্সসহ নানা সেবা পেতে অনেকে টিন নিয়েছেন, কিন্তু পরে রিটার্ন জমার বিষয়টি গুরুত্ব দেননি। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ কর বছরে ১ কোটি ৩১ লাখ টিনধারীর বিপরীতে রিটার্ন জমা দিয়েছেন মাত্র ৪৯ লাখ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান, যা প্রায় ৩৮ শতাংশ। ফলে বকেয়া রিটার্নের জরিমানার মুখে পড়া মানুষের সংখ্যাও বিপুল।

ধাপে ধাপে করণীয়

১. সঠিক কর অফিস চিহ্নিত করুন। আপনার টিন সার্টিফিকেটের নিচে ডান পাশে কর সার্কেল ও কর অঞ্চলের ঠিকানা দেওয়া থাকে। সেই অফিসেই যোগাযোগ করুন।

২. লিখিত আবেদন প্রস্তুত করুন। উপকর কমিশনার (সার্কেল) বরাবর জরিমানা মওকুফ চেয়ে আবেদন লিখুন। আবেদনে উল্লেখ করুন:

  • নাম, টিন নম্বর ও ঠিকানা
  • কোন কোন কর বছরের রিটার্ন দেননি
  • না দেওয়ার কারণ (যেমন: করযোগ্য আয় ছিল না, আইনি বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে অবগত ছিলেন না, অসুস্থতা ইত্যাদি)
  • সংশ্লিষ্ট বছরগুলোতে আপনার আয়ের উৎস ও পরিমাণ
  • বকেয়া রিটার্ন জমা দিতে আগ্রহী এবং জরিমানা মওকুফের অনুরোধ

৩. প্রয়োজনীয় কাগজ সঙ্গে নিন। টিন সার্টিফিকেট, জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি, আয়ের প্রমাণ (থাকলে) এবং চলতি বছরের রিটার্ন জমার প্রমাণ।

৪. কর অফিসের নির্দেশনা মেনে চলুন। অফিস প্রয়োজনে নির্ধারিত ফরম দেবে বা বকেয়া বছরের রিটার্ন কীভাবে জমা দিতে হবে তা জানাবে। আবেদন জমার রিসিভ কপি অবশ্যই সংরক্ষণ করুন।

৫. ভবিষ্যতে সময়মতো রিটার্ন দিন। করযোগ্য আয় না থাকলেও প্রতি বছর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে এ ধরনের জটিলতা এড়ানো যায়।

মনে রাখবেন
  • “জিরো রিটার্ন” আইনের কোনো আলাদা শ্রেণি নয়। করযোগ্য আয় না থাকলে সাধারণ রিটার্নেই প্রদেয় কর শূন্য দেখানো হয়।
  • জরিমানা মওকুফ হবে কি না, তা পুরোপুরি সংশ্লিষ্ট কর কর্মকর্তার বিবেচনার ওপর নির্ভর করে। যৌক্তিক কারণ ও প্রমাণ যত স্পষ্ট হবে, মওকুফের সম্ভাবনা তত বেশি।
  • কোনো দালাল বা অননুমোদিত ব্যক্তির মাধ্যমে “নিশ্চিত মওকুফ” করিয়ে দেওয়ার প্রস্তাবে সাড়া দেবেন না।
  • জটিল ক্ষেত্রে নিবন্ধিত আয়কর আইনজীবী বা কর পরামর্শকের সাহায্য নিন।
প্রশ্নোত্তর

প্রশ্ন: ই-রিটার্নে ৫,০০০ টাকা জরিমানা দেখালেই কি তা দিতে হবে?
উত্তর: না, স্বয়ংক্রিয়ভাবে নয়। ধারা ২৬৬ অনুযায়ী জরিমানা আরোপ কর কর্মকর্তার বিবেচনার বিষয়। যৌক্তিক কারণ দেখিয়ে মওকুফের আবেদন করা যায়।

প্রশ্ন: করযোগ্য আয় না থাকলে কি জরিমানা মাফ পাওয়া যাবে?
উত্তর: করযোগ্য আয় না থাকা মওকুফের পক্ষে একটি শক্ত যুক্তি। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কর কর্মকর্তার।

প্রশ্ন: আবেদন কার কাছে করব?
উত্তর: টিন সার্টিফিকেটে উল্লিখিত কর সার্কেলের উপকর কমিশনারের কাছে। প্রয়োজনে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে পাঠাবেন।

প্রশ্ন: সর্বোচ্চ কত টাকা জরিমানা হতে পারে?
উত্তর: যাঁদের আয় আগে কখনো নিরূপণ হয়নি, তাঁদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫,০০০ টাকা। আগে নিরূপিত হলে সর্বশেষ নিরূপিত করের ৫০% বা ১,০০০ টাকা, যেটি বেশি। ব্যর্থতা চলতে থাকলে দৈনিক ৫০ টাকা অতিরিক্ত হতে পারে।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *