ঢাকায় ব্যাটারিচালিত ই-রিকশা চলাচলে নতুন বিধিমালা, নিবন্ধন ও চালকদের জন্য মানতে হবে যেসব নিয়ম
ঢাকার সিটি করপোরেশন এলাকায় ব্যাটারিচালিত তিন চাকার রিকশা চলাচল, নিবন্ধন, চালকদের যোগ্যতা, যানবাহনের নিরাপত্তা, যাত্রী পরিবহন এবং ব্যাটারি চার্জিং অবকাঠামো ব্যবস্থাপনায় নতুন বিধিমালা জারি করেছে সরকার। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) প্রকাশিত বাংলাদেশ গেজেটে ‘ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকার তিন চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা (ই-রিকশা) চালনা বিধিমালা, ২০২৬’-এর বিস্তারিত বিধান তুলে ধরা হয়েছে।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে প্রকাশিত এই বিধিমালায় ই-রিকশার সংখ্যা নির্ধারণ, নিবন্ধন, প্রযুক্তিগত মান, সড়ক ব্যবহারের নিয়ম, যাত্রী পরিবহন, চার্জিং স্টেশন স্থাপন এবং পরিবেশ সুরক্ষাসহ বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
নতুন বিধিমালার মূল লক্ষ্য হলো ই-রিকশা চলাচলকে নিয়মের আওতায় আনা, সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অনিয়ন্ত্রিত যান চলাচল ও ব্যাটারি ব্যবস্থাপনার ঝুঁকি কমানো। তবে বিধিমালার নির্দিষ্ট ধারাগুলো অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়ন কার্যক্রমের ওপর এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে।
ই-রিকশার সংখ্যা নির্ধারণ করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ
বিধিমালায় ই-রিকশার সংখ্যা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকারের পূর্বানুমোদনক্রমে ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে পরামর্শ করে সংশ্লিষ্ট এলাকায় সামগ্রিকভাবে বা অঞ্চলভিত্তিক ই-রিকশার সংখ্যা নির্ধারণ করা যাবে।
এ বিধানের ফলে ই-রিকশার সংখ্যা নির্ধারণে শুধু চালক বা মালিকের আবেদনের ওপর নির্ভর না করে সংশ্লিষ্ট এলাকার যান চলাচল, সড়কের ধারণক্ষমতা এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
কোন এলাকায় কতটি ই-রিকশা চলবে, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। ফলে ই-রিকশার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও চলাচল ব্যবস্থাপনায় সিটি করপোরেশন এবং ট্রাফিক বিভাগের ভূমিকা বাড়বে।
নিবন্ধন ছাড়া ই-রিকশা চালানো যাবে না
নতুন বিধিমালায় ই-রিকশার নিবন্ধনকে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। নিবন্ধনের জন্য আবেদনকারীকে নির্ধারিত ফরমে আবেদন করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হবে।
বিধিমালায় নিবন্ধনপ্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে যেসব নথির উল্লেখ রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- জাতীয় পরিচয়পত্রের সত্যায়িত অনুলিপি;
- সদ্য তোলা দুই কপি পাসপোর্ট সাইজের সত্যায়িত ছবি;
- নিবন্ধন ফি জমাদানের রসিদ;
- নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী ফিটনেস সার্টিফিকেট।
আবেদন জমা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই করবে। ই-রিকশাটি নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মান ও নিরাপত্তাবিধি পূরণ করছে কি না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হবে।
বিধিমালায় নিবন্ধনের ক্ষেত্রে বুয়েট কর্তৃক নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মানদণ্ড ও নিরাপত্তাবৈশিষ্ট্যসম্পন্ন যানবাহনের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এসব শর্ত পূরণ না হলে নিবন্ধন পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি হতে পারে।
নিবন্ধিত ই-রিকশায় থাকবে কিউআর কোডযুক্ত নম্বর
নতুন বিধিমালার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিবন্ধিত ই-রিকশার জন্য কিউআর কোডযুক্ত ইউনিক নিবন্ধন নম্বর নির্ধারণ।
বিধান অনুযায়ী, কর্তৃপক্ষ নিবন্ধিত প্রতিটি ই-রিকশার জন্য কিউআর কোডযুক্ত ইউনিক নিবন্ধন নম্বর ও নির্ধারিত নম্বরপ্লেট প্রদান করবে। সেই নম্বর ই-রিকশার দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শন করতে হবে।
এ ব্যবস্থার মাধ্যমে নিবন্ধিত যানবাহন শনাক্ত করা, নিবন্ধনের তথ্য যাচাই করা এবং অনিবন্ধিত ই-রিকশা চিহ্নিত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
নিবন্ধন নম্বর ও কিউআর কোড দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শনের বিধান কার্যকর হলে মাঠপর্যায়ে যানবাহন শনাক্তকরণ ও তদারকি সহজ হবে বলে আশা করা যায়।
নিবন্ধনের মেয়াদ পাঁচ বছর
বিধিমালায় নিবন্ধনের মেয়াদ পাঁচ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ নিবন্ধনের তারিখ থেকে নির্ধারিত পাঁচ বছর পর্যন্ত নিবন্ধনের মেয়াদ কার্যকর থাকবে।
মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নিবন্ধন নবায়নের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেবে। ফলে ই-রিকশার মালিকদের নিবন্ধনের মেয়াদ সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে এবং কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে।
এ ছাড়া ই-রিকশার নিবন্ধনসংক্রান্ত আবেদন, নথিপত্র ও রেকর্ড সংরক্ষণের বিষয়েও বিধিমালায় নির্দেশনা রয়েছে। নিবন্ধন প্রদানকারী ও প্রতিস্থাপনকারী প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্টভাবে নিবন্ধনের রেকর্ড সংরক্ষণ করতে হবে।
চালকদের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে যোগ্যতা
ই-রিকশা চালানোর ক্ষেত্রে চালকের যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিধিমালা অনুযায়ী, ই-রিকশার নিবন্ধনের জন্য আবেদনকারীকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে, তাঁর বয়স কমপক্ষে ১৮ বছর হতে হবে এবং কোনো উপযুক্ত আদালত কর্তৃক অপ্রকৃতিস্থ বলিয়া ঘোষিত হওয়া চলবে না।
এ ছাড়া নিবন্ধনের জন্য নির্ধারিত আবেদনপ্রক্রিয়া ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র অনুসরণ করতে হবে।
চালকদের প্রশিক্ষণের বিষয়টিও বিধিমালায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কর্তৃপক্ষ কর্তৃক স্বীকৃত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চালকদের ট্রাফিক আইন, সড়ক নিরাপত্তা, ব্যাটারি ও ই-রিকশা রক্ষণাবেক্ষণ এবং আনুষঙ্গিক বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যাবে।
এর মাধ্যমে চালকদের শুধু যান চালানোর দক্ষতা নয়, সড়কে দায়িত্বশীল আচরণ এবং নিরাপত্তাবিধি অনুসরণের বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে।
ই-রিকশার প্রযুক্তিগত মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে
নতুন বিধিমালায় ই-রিকশার প্রযুক্তিগত মান ও নিরাপত্তাবৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিটি ই-রিকশাকে বুয়েট কর্তৃক নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মানদণ্ড ও নিরাপত্তাবৈশিষ্ট্যসম্পন্ন হতে হবে।
ই-রিকশার ইকোনমিক লাইফটাইম নির্ধারণের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিধিমালায় নিবন্ধনের তারিখ থেকে ১২ বছরকে ইকোনমিক লাইফটাইম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ সময়সীমা শেষ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট যানবাহনের নিবন্ধনসংক্রান্ত বিধান অনুসরণ করতে হবে।
এ ছাড়া প্রতিটি ই-রিকশায় স্পিডোমিটার বা ওডোমিটার স্থাপনের নির্দেশনা রয়েছে। এর মাধ্যমে যানবাহনের গতি অথবা অতিক্রান্ত দূরত্ব সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
প্রযুক্তিগত মান বজায় রাখার পাশাপাশি যানবাহনের নিরাপত্তা ও কার্যক্ষমতা নিশ্চিত করা ই-রিকশা পরিচালনার অন্যতম শর্ত হিসেবে বিবেচিত হবে।
ত্রুটিপূর্ণ ও অনিবন্ধিত ই-রিকশা চলাচলে নিষেধাজ্ঞা
বিধিমালায় ত্রুটিযুক্ত ও অনিবন্ধিত ই-রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কোনো যান্ত্রিক বা নিরাপত্তাগত ত্রুটিযুক্ত এবং নিবন্ধনবিহীন ই-রিকশা সড়কে চালানো যাবে না।
কোনো ই-রিকশায় এমন ত্রুটি দেখা দিলে, যার কারণে যানটির সামনের অংশের দৃষ্টিসহায়তা বা নিরাপদে চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়, সে ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান রয়েছে।
বিধিমালায় বলা হয়েছে, এ ধরনের ত্রুটির কারণে যান চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়লে সংশ্লিষ্ট সাইনবোর্ড প্রদর্শন করে মেরামতের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
এ ছাড়া মেট্রোপলিটন এলাকার ট্রাফিক বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট অবৈধ ই-রিকশা চলাচল বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবেন।
কোন কোন সড়কে চলবে না ই-রিকশা
ই-রিকশা চলাচলের ক্ষেত্রে সড়ক ব্যবহারের নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে। বিধিমালা অনুযায়ী, ই-রিকশা জাতীয় মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, প্রধান বাস চলাচলের সড়ক বা বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) করিডরে চলাচল করতে পারবে না।
এ ছাড়া প্রশাসন কর্তৃক সময় সময় নিষেধাজ্ঞা আরোপিত সড়কেও ই-রিকশা চলাচল করতে পারবে না।
এসব বিধানের উদ্দেশ্য হলো দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে ধীরগতির ই-রিকশার সংঘাত কমানো এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা।
তবে কোন কোন সড়কে ই-রিকশা চলাচল করতে পারবে, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত ও সড়কভিত্তিক নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
নির্ধারিত লেন অনুসরণ করতে হবে
ই-রিকশা চলাচলের ক্ষেত্রে চালকদের সড়কের বাম লেন অনুসরণ করতে হবে। বিধিমালায় ই-রিকশা ফুটপাতে চালানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ই-রিকশা চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার এবং নিয়মবহির্ভূতভাবে ওভারটেকিং ও লেন পরিবর্তনের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
এসব নিয়মের উদ্দেশ্য হলো সড়কে ই-রিকশার চলাচলকে শৃঙ্খলিত করা এবং অন্যান্য যানবাহন ও পথচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
ই-রিকশা চালকদের এসব নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে। অন্যথায় বিধিমালার আওতায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ থাকবে।
যাত্রী পরিবহনে মানতে হবে নির্ধারিত নিয়ম
বিধিমালায় ই-রিকশায় যাত্রী পরিবহনের ক্ষেত্রেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যানবাহনের নির্ধারিত ধারণক্ষমতার বাইরে যাত্রী বহন করা যাবে না।
এ ছাড়া যাত্রীদের হাতব্যাগ বা মালামাল বহনের বাইরে অন্য কোনো বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে।
নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে স্কুল, হাসপাতাল, ধর্মীয় উপাসনালয় বা জনবহুল স্থানে ই-রিকশার সর্বোচ্চ গতিসীমা ঘণ্টায় ১৫ কিলোমিটার নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ধরনের বিধান বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনবহুল ও সংবেদনশীল এলাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
ই-রিকশার জন্য নির্ধারিত হবে জোনভিত্তিক চলাচল
ই-রিকশা চলাচলের ক্ষেত্রে জোনভিত্তিক ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও বিধিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একটি সিটি করপোরেশন এলাকায় নিবন্ধিত ই-রিকশা অন্য জোনে চালানোর ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ থাকবে।
এ ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্দিষ্ট এলাকার যানবাহনকে সংশ্লিষ্ট এলাকার মধ্যেই চলাচলে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ তৈরি হবে।
কোন জোনে কতটি ই-রিকশা চলবে এবং কোন পথে চলাচল করতে পারবে, তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক বিভাগের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
ব্যাটারি চার্জিং স্টেশন স্থাপনে থাকবে অনুমোদনের শর্ত
ই-রিকশার সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাটারি চার্জিং অবকাঠামোর প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বিধিমালায় চার্জিং স্টেশন স্থাপন ও পরিচালনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে পরামর্শক্রমে প্রয়োজনীয়সংখ্যক চার্জিং এলাকা নির্ধারণের ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
অনুমোদিত চার্জিং পয়েন্ট বা নির্দিষ্ট গ্যারেজে ই-রিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে। চার্জিং স্টেশন বা গ্যারেজ স্থাপনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমোদন গ্রহণ করতে হবে।
বিধিমালায় সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে অথবা বেসরকারি উদ্যোগে চার্জিং স্টেশন ও গ্যারেজ স্থাপনের সুযোগ রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া ব্যাটারি চার্জিংয়ের ক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। সৌরবিদ্যুতের মতো উৎস ব্যবহার করে ব্যাটারি চার্জের ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
চার্জিং স্টেশন স্থাপনের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ব্যবহার, নিরাপত্তা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের শর্ত অনুসরণ করতে হবে।
ব্যাটারি ব্যবস্থাপনায় পরিবেশ সুরক্ষার নির্দেশনা
ই-রিকশার ব্যাটারি ব্যবহারের সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টিও জড়িত। পুরোনো বা অকার্যকর ব্যাটারি যত্রতত্র ফেলে দেওয়া হলে পরিবেশের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এ কারণে বিধিমালায় ব্যাটারি পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ ও ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পুরোনো বা অকার্যকর ব্যাটারি উন্মুক্ত স্থান, মাটি, জলাশয় বা সাধারণ বর্জ্যের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলতে পারবে না।
ব্যাটারি বিক্রেতাদের নতুন ব্যাটারি বিক্রির সময় ক্রেতার কাছ থেকে পুরোনো ব্যাটারি সংগ্রহ করে অনুমোদিত পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থায় পাঠানোর বিধানও রয়েছে।
এ ছাড়া ব্যাটারি ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র এবং অনুমোদিত এজেন্ট, ডিলার বা সংগ্রহকারীর মাধ্যমে ব্যাটারি ব্যবস্থাপনার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
পরিবেশ সুরক্ষার বিধান বাস্তবায়িত হলে পুরোনো ব্যাটারি ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনার সুযোগ তৈরি হবে।
ই-রিকশার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান অনুমোদনে কমিটি
বিধিমালায় ই-রিকশা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের সুপারিশ প্রদানের জন্য একটি কমিটির বিধান রাখা হয়েছে।
কমিটিতে স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রতিনিধি, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ট্রাফিক বিভাগের প্রতিনিধি, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ এবং জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
কমিটির দায়িত্ব হবে নির্ধারিত মানদণ্ড ও নিরাপত্তাবৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ই-রিকশা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের সুপারিশ প্রদান করা।
প্রয়োজনে কমিটিতে সদস্য কো-অপ্ট করার সুযোগও রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স প্রদানের বিষয়টি বিধিমালায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এ ব্যবস্থার মাধ্যমে ই-রিকশা উৎপাদনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত মান ও নিরাপত্তা শর্ত অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
দুর্ঘটনার দায়বদ্ধতা ও অপরাধের বিষয়েও বিধান
বিধিমালার একটি অধ্যায়ে দুর্ঘটনার দায়বদ্ধতা, অপরাধ ও দণ্ডের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ই-রিকশা চালানোর সময় সড়ক নিরাপত্তা ও ট্রাফিক আইন মেনে চলার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। চালকের অসতর্কতা, নিয়মবহির্ভূত যান চলাচল এবং নিরাপত্তাবিধি লঙ্ঘনের মতো বিষয়গুলো দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
এ ছাড়া অননুমোদিতভাবে ই-রিকশা চালানো, নির্ধারিত চলাচলবিধি অমান্য করা এবং অন্যান্য নিষিদ্ধ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান রয়েছে।
তবে গেজেটের পাঠযোগ্য অংশ থেকে প্রতিটি অপরাধের জন্য নির্দিষ্ট জরিমানার অঙ্ক বা দণ্ডের মেয়াদ নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যাচ্ছে না। তাই এসব বিষয়ে নির্দিষ্ট অঙ্ক উল্লেখ করার পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট ধারার পূর্ণ পাঠ অনুসরণ করাই যুক্তিযুক্ত।
ই-রিকশা মালিক ও চালকদের করণীয়
নতুন বিধিমালা অনুযায়ী ই-রিকশার মালিক ও চালকদের কয়েকটি বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে।
প্রথমত, নিবন্ধন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়া ই-রিকশা চালানো থেকে বিরত থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, যানবাহনের প্রযুক্তিগত মান ও নিরাপত্তাবৈশিষ্ট্য বজায় রাখতে হবে। তৃতীয়ত, নির্ধারিত সড়ক, লেন ও জোনের নিয়ম অনুসরণ করতে হবে।
এ ছাড়া অতিরিক্ত যাত্রী বহন, নিষিদ্ধ সড়কে চলাচল, ফুটপাত ব্যবহার, মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে গাড়ি চালানো এবং নিয়মবহির্ভূতভাবে লেন পরিবর্তন করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
ব্যাটারি চার্জিং ও পুরোনো ব্যাটারি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও অনুমোদিত পদ্ধতি অনুসরণ করা প্রয়োজন।
বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করবে নতুন বিধিমালার কার্যকারিতা
ঢাকার যানজট ও সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে ব্যাটারিচালিত ই-রিকশার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে এসব যানবাহন স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতের সুবিধা দেয়, অন্যদিকে অনিয়ন্ত্রিত চলাচল, ভুল পথে প্রবেশ, অতিরিক্ত যাত্রী বহন এবং নিরাপত্তাবিধি অমান্যের কারণে সড়কে সমস্যা তৈরি হতে পারে।
নতুন বিধিমালায় নিবন্ধন, প্রযুক্তিগত মান, চালকের যোগ্যতা, জোনভিত্তিক চলাচল, চার্জিং অবকাঠামো ও পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় ই-রিকশা ব্যবস্থাপনায় একটি নিয়মতান্ত্রিক কাঠামো তৈরির উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে।
তবে বিধিমালার সুফল পেতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিবন্ধনপ্রক্রিয়া সহজ ও স্বচ্ছ রাখা, অনুমোদিত যানবাহন শনাক্ত করা, চালকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং সড়কে নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে ই-রিকশার মালিক, চালক ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে বিধিমালার শর্ত সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দিতে হবে। প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও বাস্তবায়নব্যবস্থা কার্যকর হলে সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং যাত্রী ও পথচারীদের নিরাপত্তা বাড়ানোর ক্ষেত্রে নতুন বিধিমালা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।



