GPF Bill Form Auto : সরকারি কর্মচারীদের জিপিএফের টাকা উত্তোলনের বিল তৈরি হবে মুহূর্তেই, থাকছে অটোমেটিক হিসাবের সুবিধা
সরকারি চাকরিজীবীদের সাধারণ ভবিষ্য তহবিল (জিপিএফ) থেকে অগ্রিম গ্রহণ কিংবা জমাকৃত অর্থ উত্তোলনের বিল প্রস্তুতের কাজ আরও সহজ করতে তৈরি করা হয়েছে একটি বিশেষ অটোমেটিক জিপিএফ বিল ফরম। এই ফরমে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদান করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হবে কর্মচারীদের জিপিএফ উত্তোলন ও অগ্রিম গ্রহণের বিল। একই সঙ্গে হিসাবের মোট পরিমাণ, কর্মচারীভিত্তিক উত্তোলনের তথ্য এবং প্রিন্টযোগ্য বিলের কপিও পাওয়া যাবে।
সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের হিসাব শাখায় জিপিএফ-সংক্রান্ত বিল প্রস্তুত করতে কর্মচারীদের ব্যক্তিগত তথ্য, হিসাব নম্বর, মূল বেতন, মঞ্জুরিপত্র এবং উত্তোলনের পরিমাণসহ একাধিক বিষয় যাচাই করতে হয়। এসব তথ্য হাতে লিখে বিল তৈরি করতে গিয়ে অনেক সময় ব্যয় হয়। পাশাপাশি যোগ-বিয়োগের ভুল কিংবা প্রয়োজনীয় তথ্য বাদ পড়ার আশঙ্কাও থাকে। নতুন এই ডিজিটাল ফরমের মাধ্যমে এসব কাজ তুলনামূলক সহজে সম্পন্ন করা সম্ভব।
জিপিএফ উত্তোলনের জন্য আলাদা করে বিল লিখতে হবে না
অটোমেটিক জিপিএফ বিল ফরমটির মূল আকর্ষণ হলো, প্রয়োজনীয় তথ্য ইনপুট দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নির্ধারিত কাঠামোতে বিল তৈরি হয়ে যায়।
ফরমটি টি.আর ফরম নং ৩৭-এর আদলে তৈরি করা হয়েছে। এতে দপ্তরের নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, ই-টিআইএন, শ্রেণিবিন্যাস কোড, টোকেন নম্বর, ভাউচার নম্বর এবং সংশ্লিষ্ট তারিখ দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
এ ছাড়া আয়ন-ব্যয়ন কর্মকর্তার নাম, পদবি, কর্মস্থল এবং স্বাক্ষরের জন্য নির্ধারিত অংশও রাখা হয়েছে।
ফলে বারবার আলাদা কাগজে তথ্য লিখে বিল প্রস্তুত করার পরিবর্তে একটি নির্দিষ্ট ফরমে তথ্য প্রবেশ করিয়ে বিলের প্রিভিউ দেখা যাবে। সবকিছু যাচাই করার পর A4 সাইজে প্রিন্ট করা সম্ভব।
একাধিক কর্মচারীর জিপিএফ বিল একই ফরমে
একটি দপ্তরে একাধিক কর্মচারীর জিপিএফ অগ্রিম বা উত্তোলনের বিল প্রস্তুত করতে হলে সাধারণত প্রত্যেকের তথ্য আলাদাভাবে হিসাব করতে হয়।
এই সমস্যার সমাধানে অটোমেটিক ফরমে একাধিক কর্মচারী যুক্ত করার সুবিধা রাখা হয়েছে।
প্রতিটি কর্মচারীর জন্য নাম, পদবি, মূল বেতন, মঞ্জুরিপত্র নম্বর, মঞ্জুরির তারিখ, জিপিএফ হিসাব নম্বর এবং উত্তোলনের পরিমাণ ইনপুট দেওয়া যাবে।
প্রয়োজনে নতুন কর্মচারী যুক্ত করা কিংবা ভুল তথ্য দেওয়া কর্মচারীর তথ্য মুছে ফেলার ব্যবস্থাও রয়েছে।
সব কর্মচারীর তথ্য যুক্ত করার পর প্রত্যেকের উত্তোলনের অর্থ আলাদাভাবে প্রদর্শিত হবে। পাশাপাশি একাধিক কর্মচারীর মোট প্রদেয় অর্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে হিসাব হয়ে যাবে।
অর্থাৎ, হিসাব শাখার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে প্রত্যেক কর্মচারীর উত্তোলনের পরিমাণ আলাদাভাবে যোগ করে মোট বিল নির্ধারণ করতে হবে না।
জিপিএফ স্থিতি অনুযায়ী অগ্রিমের পরিমাণ নির্ণয়
জিপিএফ থেকে অগ্রিম গ্রহণের ক্ষেত্রে কর্মচারীর হিসাবের স্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। অটোমেটিক ক্যালকুলেটরে জিপিএফ স্থিতির ভিত্তিতে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ ফেরৎযোগ্য অগ্রিমের পরিমাণ দেখানোর ব্যবস্থা রয়েছে।
ফরমের হিসাব অনুযায়ী, জিপিএফ স্থিতির ৮০ শতাংশকে ফেরৎযোগ্য অগ্রিমের সর্বোচ্চ সীমা হিসেবে দেখানো হয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে, কোনো সরকারি কর্মচারীর জিপিএফ হিসাবে চাঁদা ও সুদসহ ৪ লাখ টাকা জমা থাকলে তার ৮০ শতাংশ হবে ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা।
অর্থাৎ, ক্যালকুলেটরের প্রদর্শিত হিসাব অনুযায়ী সম্ভাব্য সর্বোচ্চ ফেরৎযোগ্য অগ্রিম হবে ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা।
এখানে উল্লেখ্য, এটি ফরমে ব্যবহৃত হিসাবের ভিত্তিতে প্রদর্শিত একটি সীমা। প্রকৃত অগ্রিম মঞ্জুরির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিধি, শর্ত ও অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে।
মূল বেতনের ভিত্তিতে মাসিক জিপিএফ চাঁদার হিসাব
জিপিএফে প্রতি মাসে কত টাকা চাঁদা জমা দেওয়া যাবে, সেটি নির্ধারণেও ফরমটিতে আলাদা ক্যালকুলেটর রয়েছে।
কর্মচারীর মূল বেতন ইনপুট দিলে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ মাসিক চাঁদার পরিমাণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রদর্শিত হয়।
ফরমে উল্লেখিত হিসাব অনুযায়ী—
- সর্বনিম্ন মাসিক চাঁদা মূল বেতনের ৫ শতাংশ।
- সর্বোচ্চ মাসিক চাঁদা মূল বেতনের ১০০ শতাংশ।
যেমন, কোনো কর্মচারীর মূল বেতন ২৫ হাজার টাকা হলে ৫ শতাংশ হিসাবে সর্বনিম্ন মাসিক চাঁদা হবে ১ হাজার ২৫০ টাকা। অন্যদিকে ক্যালকুলেটরে সর্বোচ্চ চাঁদার পরিমাণ দেখাবে ২৫ হাজার টাকা।
এ ছাড়া চাঁদার হার পরিবর্তন, বেতন বিল থেকে চাঁদা কর্তন এবং ছুটিকালীন চাঁদা প্রদানের বিষয়েও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ফরমে সংযুক্ত রয়েছে।
বাড়ি নির্মাণের জন্য জিপিএফ অগ্রিমের হিসাব
সরকারি কর্মচারীদের জন্য বাড়ি নির্মাণ বা সংশ্লিষ্ট প্রয়োজনে জিপিএফ থেকে অগ্রিম গ্রহণের বিষয়টিও ফরমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে ক্যালকুলেটর দুটি বিষয় বিবেচনা করে—
১. কর্মচারীর ৩৬ মাসের মূল বেতন।
২. জিপিএফ স্থিতির ৮০ শতাংশ।
এই দুটি হিসাবের মধ্যে যেটি কম, সেটিকে গৃহ নির্মাণ অগ্রিমের সর্বোচ্চ সীমা হিসেবে প্রদর্শন করা হয়।
উদাহরণ হিসেবে, কোনো কর্মচারীর মূল বেতন ২৫ হাজার টাকা হলে ৩৬ মাসের মূল বেতন দাঁড়াবে ৯ লাখ টাকা। তাঁর জিপিএফ স্থিতি ৬ লাখ টাকা হলে ৮০ শতাংশ হিসাবে দাঁড়াবে ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা।
ফরমের হিসাব অনুযায়ী, এ ক্ষেত্রে গৃহ নির্মাণ অগ্রিমের সর্বোচ্চ সীমা হবে ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা।
৫২ বছর বয়স পূর্ণ হলে অফেরৎযোগ্য অগ্রিমের হিসাব
জিপিএফের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অফেরৎযোগ্য অগ্রিম।
ফরমে সাধারণ ভবিষ্য তহবিল বিধিমালা, ১৯৭৯-এর বিধি ১৩(৯) ও ১৩(১০)-এর উল্লেখ করে জানানো হয়েছে, চাঁদাদাতার বয়স ৫২ বছর পূর্ণ হলে নির্দিষ্ট শর্তে প্রকৃত প্রয়োজনে অফেরৎযোগ্য অগ্রিম গ্রহণের সুযোগ রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে ক্যালকুলেটরে বয়স ৫২ বছর বা তার বেশি হলে জিপিএফ স্থিতির ৮০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থের হিসাব প্রদর্শিত হয়।
তবে এই অর্থ গ্রহণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিধির শর্ত এবং অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুসরণ করতে হবে।
অগ্রিম গ্রহণের পর কত টাকা কিস্তি দিতে হবে?
জিপিএফ থেকে ফেরৎযোগ্য অগ্রিম গ্রহণের পর মাসিক কত টাকা কিস্তি দিতে হবে, সেটিও জানা যাবে এই ফরমে।
এতে ১২, ২৪, ৩৬, ৪৮ ও ৫০ কিস্তির হিসাব দেখানোর পাশাপাশি ব্যবহারকারী নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী কিস্তির সংখ্যা নির্বাচন করতে পারবেন।
উদাহরণ হিসেবে, কোনো কর্মচারী ২ লাখ টাকা ফেরৎযোগ্য অগ্রিম গ্রহণ করলে ২৪ কিস্তিতে মূল টাকা পরিশোধের ক্ষেত্রে প্রতি মাসে কিস্তি হবে প্রায় ৮ হাজার ৩৩৪ টাকা।
তবে এখানে কেবল মূল অগ্রিমের কিস্তি দেখানো হয়। সুদ পৃথকভাবে আদায়যোগ্য। প্রকৃত কিস্তির সংখ্যা ও সুদের হার সংশ্লিষ্ট সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।
বিলের সঙ্গে থাকবে প্রয়োজনীয় প্রত্যয়নপত্র
জিপিএফ বিল তৈরির ক্ষেত্রে শুধু কর্মচারীর তথ্য ও উত্তোলনের পরিমাণ থাকলেই হয় না। বিলের সঙ্গে প্রয়োজনীয় প্রত্যয়নপত্রও যুক্ত করতে হয়।
অটোমেটিক ফরমটিতে এ বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
এতে অর্থ প্রকৃত প্রাপকের মধ্যে বিতরণ, প্রাপ্তির রশিদ গ্রহণ এবং জিপিএফ হিসাবের স্থিতি অগ্রিম বা উত্তোলিত অর্থের চেয়ে বেশি থাকার বিষয়ে প্রত্যয়নপত্রের অংশ রয়েছে।
পাশাপাশি আয়ন-ব্যয়ন কর্মকর্তার স্বাক্ষর, নাম, পদবি ও দপ্তরের সিলের জন্য জায়গা রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া হিসাবরক্ষণ অফিসের ব্যবহারের জন্য অডিটর, সুপার এবং হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার নাম ও স্বাক্ষরের পৃথক অংশ রয়েছে।
তথ্য ভুল হলে সতর্ক করবে অটোমেটিক ফরম
ফরমটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো, কিছু নির্দিষ্ট ভুলের ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তা প্রদর্শন করা।
যেমন, কোনো কর্মচারীর ফেরৎযোগ্য অগ্রিমের পরিমাণ জিপিএফ স্থিতির ৮০ শতাংশের বেশি হলে সতর্কবার্তা দেখাবে। আবার উত্তোলনের পরিমাণ জিপিএফ স্থিতির চেয়ে বেশি হলেও সতর্ক করবে।
এর ফলে বিল প্রস্তুতের সময় সম্ভাব্য কিছু ভুল আগেই শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
তবে এটি সম্পূর্ণ সরকারি যাচাই ব্যবস্থা নয়। তাই বিল চূড়ান্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিসের মাধ্যমে প্রকৃত জিপিএফ স্থিতি ও মঞ্জুরির তথ্য যাচাই করা জরুরি।
কীভাবে তৈরি করবেন জিপিএফ উত্তোলনের বিল?
অটোমেটিক জিপিএফ বিল ফরমটি HTML-ভিত্তিক হওয়ায় কম্পিউটারে কোনো বিশেষ সফটওয়্যার ইনস্টল না করেই আধুনিক ওয়েব ব্রাউজারে চালানো সম্ভব।
ব্যবহারের পদ্ধতি হলো—
১. প্রথমে HTML ফাইলটি কম্পিউটারে সংরক্ষণ করতে হবে।
২. গুগল ক্রোম বা অন্য কোনো আধুনিক ব্রাউজারে ফাইলটি খুলতে হবে।
৩. দপ্তরের নাম, এনআইডি, শ্রেণিবিন্যাস কোড ও অন্যান্য তথ্য দিতে হবে।
৪. কর্মচারীর নাম, পদবি, মূল বেতন এবং জিপিএফ হিসাব নম্বর লিখতে হবে।
৫. মঞ্জুরিপত্র নম্বর, তারিখ এবং অগ্রিমের পরিমাণ দিতে হবে।
৬. প্রয়োজন হলে আরও কর্মচারী যুক্ত করতে হবে।
৭. তৈরি হওয়া বিলের প্রিভিউ দেখে সব তথ্য যাচাই করতে হবে।
৮. সবকিছু ঠিক থাকলে A4 প্রিন্ট অপশন ব্যবহার করতে হবে।
প্রিন্টের ক্ষেত্রে A4 পেপার, ১০০ শতাংশ স্কেল এবং মার্জিনস নান (None) নির্বাচন করার নির্দেশনা রয়েছে।
হিসাব শাখার কাজে বাড়বে ডিজিটাল সুবিধা
সরকারি দপ্তরের দৈনন্দিন আর্থিক কার্যক্রমে সঠিক হিসাব প্রস্তুত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে জিপিএফ অগ্রিম ও উত্তোলনের বিল তৈরিতে একাধিক কর্মচারীর তথ্য একসঙ্গে ব্যবস্থাপনা করতে হয়।
এ ধরনের অটোমেটিক ফরম ব্যবহার করলে একই জায়গায় তথ্য ইনপুট, হিসাব, বিলের প্রিভিউ এবং প্রিন্টের কাজ করা সম্ভব। ফলে সময় সাশ্রয়ের পাশাপাশি হাতে হিসাব করার প্রয়োজনীয়তাও কমবে।
তবে ফরমটি একটি সহায়ক ডিজিটাল টুল মাত্র। এটি জিপিএফের সরকারি হিসাবের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংযুক্ত নয় এবং নিজে থেকে কোনো অগ্রিম মঞ্জুর বা বিল পাস করতে পারে না।
শেষ কথা
জিপিএফের টাকা উত্তোলন কিংবা অগ্রিম গ্রহণের বিল প্রস্তুত করতে সরকারি কর্মচারীদের জন্য অটোমেটিক জিপিএফ বিল ফরমটি একটি ব্যবহারিক ডিজিটাল উদ্যোগ। বিশেষ করে একাধিক কর্মচারীর বিল তৈরি, মোট অর্থের হিসাব, অগ্রিমের কিস্তি নির্ধারণ এবং A4 প্রিন্টের সুবিধা থাকায় এটি সরকারি দপ্তরের হিসাব শাখার কাজে সহায়ক হতে পারে।
তবে ফরমে প্রদর্শিত চাঁদার হার, অগ্রিমের সীমা, বয়সসীমা ও কিস্তির হিসাব ব্যবহারের আগে সাধারণ ভবিষ্য তহবিল বিধিমালা, ১৯৭৯ এবং সর্বশেষ অর্থ বিভাগের পরিপত্র যাচাই করতে হবে। কারণ সফটওয়্যারে প্রদর্শিত হিসাবই চূড়ান্ত সরকারি অনুমোদন নয়।


