ঈদের পর ছুটি নিয়ে বসের টালবাহানা : ভোগান্তি ও প্রতিকারের উপায়
পবিত্র ঈদুল ফিতর বা ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটির পর কর্মক্ষেত্রে যোগ দেওয়া নিয়ে প্রতি বছরই সাধারণ চাকরিজীবীদের একটি বড় অংশকে সমস্যায় পড়তে হয়। বিশেষ করে দূর-দূরান্তে পরিবার-পরিজন বা সন্তানদের নিয়ে যারা গ্রামে যান, তাদের জন্য ঈদের মূল ছুটির সঙ্গে অতিরিক্ত দু-একদিন মেলানো অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়ে। তবে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানের প্রধান বা ‘বস’ নানা অজুহাতে এই নৈমিত্তিক ছুটি মঞ্জুর করতে চান না।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং বিভিন্ন চাকরিজীবী ফোরামে এ নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভ ও ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা প্রকাশ পেয়েছে। কেউ কেউ আক্ষেপ করে বলছেন, অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নৈমিত্তিক ছুটি দিতে এমন আচরণ করেন যেন “ছুটি তাদের বাপ-দাদার সম্পত্তি”।
ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা ও বাস্তব চিত্র
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এক নারী কর্মী জানান, তার স্বামী ঈদের পর দুই দিনের ছুটি নিয়েছেন। সন্তানসহ পুরো পরিবারের একসঙ্গে গ্রামে যাওয়ার ও ফেরার পরিকল্পনা থাকায় স্বামীর ছুটির সঙ্গে মিলিয়ে তাকেও দুই দিনের ছুটি নিতে হচ্ছে। কিন্তু তার বর্তমান বস কোনোভাবেই ছুটি দিতে রাজি নন। অথচ পূর্ববর্তী কর্মকর্তারা এমনটি করতেন না।
চাকরিজীবীদের আলোচনায় এমন আরও কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে:
অযাচিত শোকজ: এক কর্মী জানান, একদিনের ছুটি নিয়ে বাড়ি যাওয়ার পর তিনি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। পরের দিনের ছুটি ফোনে চাওয়ায় তাকে ‘শোকজ’ করা হয় এবং বলা হয়— অসুস্থ হলেও তার মাকে কেন অফিসে পাঠিয়ে ছুটির আবেদন জমা দেওয়া হলো না!
একদিনের ছুটিতেও কড়াকড়ি: ঈদ রবিবারে শেষ হওয়ার পর সোমবারে মাত্র একদিনের ক্যাজুয়াল লিভ (নৈমিত্তিক ছুটি) চাওয়ায় অনেককে বাধ্য করা হয়েছে ‘অর্জিত ছুটি’ বা আর্নড লিভ (EL) কাটতে।
প্রতিকূল পরিস্থিতিতে চাকরিজীবীরা কী করছেন? (অভিজ্ঞদের পরামর্শ)
এই ধরনের একগুঁয়ে বা জটিল মানসিকতার বসের মুখোমুখি হলে চাকরি টিকিয়ে রেখে কীভাবে ছুটি কাটানো যায়, সে বিষয়ে অভিজ্ঞ চাকরিজীবীরা বেশ কিছু বাস্তবসম্মত কৌশলের কথা বলেছেন:
লিখিত রিসিভ কপি রাখা: মুখে মুখে ছুটির কথা না বলে সরাসরি ‘পারিবারিক জরুরি প্রয়োজন’ (Family Emergency) দেখিয়ে ছুটির আবেদন জমা দেওয়া। নিজের নিরাপত্তার জন্য অফিস সহকারীর কাছ থেকে সেই আবেদনের একটি রিসিভড কপি বা স্বাক্ষর নিজের কাছে রেখে দেওয়া উচিত।
উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা: ইমিডিয়েট বস (যিনি ছুটি দিচ্ছেন না) যদি অনড় থাকেন, তবে তারও উপরে যিনি আছেন বা প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ বিভাগকে (HR) বাস্তব পরিস্থিতি বুঝিয়ে স্টেশন লিভের (কর্মস্থল ত্যাগের) বিষয়টি নলেজে রাখা।
মেডিকেল গ্রাউন্ডের ব্যবহার: কোনো কোনো ক্ষেত্রে কর্মীরা বাধ্য হয়ে আগে কিছু না জানিয়ে বাড়ি চলে যান। পরবর্তীতে হঠাৎ অসুস্থতা বা জ্বরের কথা বলে সরকারি হাসপাতালের ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ও সার্টিফিকেট সহ ছুটির আবেদন জমা দেন। আইনগতভাবে এই পদ্ধতি বেশ শক্তিশালী, কারণ অসুস্থতার বিপরীতে ব্যবস্থা নেওয়া বসের পক্ষে কঠিন।
অতিরিক্ত তথ্য শেয়ার না করা: ছুটিতে গিয়ে কোথায় যাচ্ছেন, কী করছেন—এসব তথ্য বসের সাথে মৌখিকভাবে শেয়ার না করাই শ্রেয়। ব্যক্তিগত জীবন ও অফিসিয়াল ছুটির অধিকারের মধ্যে একটি পেশাদার দূরত্ব বজায় রাখা উচিত।
বিশেষজ্ঞদের মত: সমাধান কোথায়?
শ্রম আইন ও করপোরেট বিশেষজ্ঞদের মতে, ছুটি কোনো দয়া বা দান নয়, এটি শ্রমিকের আইনি অধিকার। তবে প্রাতিষ্ঠানিক জরুরি প্রয়োজনে বস ছুটি সাময়িকভাবে পেছাতে বা সমন্বয় করতে পারেন, কিন্তু ঢালাওভাবে মানসিক হেনস্তা বা সবসময় ছুটি না দেওয়ার প্রবণতা প্রতিষ্ঠানের কাজের পরিবেশ নষ্ট করে।
বসেরা যদি সহনশীল না হন, তবে কর্মীদের উচিত তড়িঘড়ি কোনো ভুল পদক্ষেপ না নিয়ে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে লিখিত আবেদন করা এবং প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বা এইচআর পলিসির আশ্রয় নেওয়া। কারণ শত বাধা সত্ত্বেও উৎসবের আনন্দ পরিবারের সাথে ভাগ করে নেওয়ার অধিকার সবারই রয়েছে।



