একই পঞ্জিকা বছরে সরাসরি বনাম পদোন্নতিপ্রাপ্তদের জ্যেষ্ঠতা দ্বন্দ্ব: বিপাকে কর্তৃপক্ষ, পদোন্নতি বাতিলের শঙ্কা!
একই পঞ্জিকা বছরে সরকারি চাকুরিতে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত এবং পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পারস্পরিক জ্যেষ্ঠতা ও পরবর্তী পদে পদোন্নতি প্রদান নিয়ে এক জটিল আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়েছে। বিধিমালা অনুযায়ী জ্যেষ্ঠ পদে থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি বঞ্চিত হয়েছেন পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা। অন্যদিকে, ৫ বছরের চাকরিকাল আগে পূর্ণ হওয়ায় শূন্য পদের বিপরীতে আগেই পদোন্নতি পেয়ে গেছেন সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্তরা। শূন্যপদ না থাকায় এখন পুরো বিষয়টি নিয়ে চরম প্রশাসনিক অচলাবস্থা এবং আইনি জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে, যার কারণে স্বয়ং নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষই বড় ধরনের বিপাকে পড়তে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও মূল জটিলতা
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২১ সালের ৫ এপ্রিল একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে ৭ জন কর্মকর্তা ‘সহকারী ব্যবস্থাপক’ পদে যোগদান করেন। একই বছরের ১০ অক্টোবর আরও ২ জন কর্মকর্তা একই পদে পদোন্নতি পেয়ে যোগদান করেন।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের গেজেট (৪ মে, ২০১১) এর জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণী বিধিমালার স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে:
“কোন একটি নির্দিষ্ট পঞ্জিকা বৎসরে নিয়মিত ভিত্তিতে ধারাবাহিক ব্যবস্থায় উচ্চতর পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা কর্মচারীগণ ঐ পঞ্জিকা বৎসরে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের উপর জ্যেষ্ঠতা পাইবেন।”
এই বিধি অনুযায়ী, ২০২১ পঞ্জিকা বছরে পরে যোগদান করলেও ২ জন পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত ৭ জনের চেয়ে জ্যেষ্ঠ (Senior)।
৫ বছরের শর্ত ও পদোন্নতির সময়কাল
প্রতিষ্ঠানটির বিধিমালা অনুযায়ী, পরবর্তী ‘উপব্যবস্থাপক’ পদে পদোন্নতি পাওয়ার জন্য ন্যূনতম চাকুরিকাল হতে হবে ৫ বছর।
সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্তদের (৭ জন) ৫ বছর পূর্ণ হয় ৫ এপ্রিল, ২০২৬ তারিখে।
পদোন্নতিপ্রাপ্তদের (২ জন) ৫ বছর পূর্ণ হবে ১০ অক্টোবর, ২০২৬ তারিখে।
প্রতিষ্ঠানে উপব্যবস্থাপকের ৪টি শূন্য পদ থাকায়, গত এপ্রিল মাসে ৫ বছর পূর্ণ হওয়া মাত্রই সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্য থেকে ৪ জনকে পদোন্নতি দেয় কর্তৃপক্ষ। কিন্তু বিপত্তি বাঁধে এখানেই—আইনত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের জন্য কোনো পদ সংরক্ষণ না করেই সকল শূন্যপদ পূরণ করে ফেলা হয়েছে।
বঞ্চিত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের দাবি ও আইনি অবস্থান
পদোন্নতি বঞ্চিত ২ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ইতোমধ্যে কর্তৃপক্ষের কাছে এই পদোন্নতি পুনর্বিবেচনা ও যোগ্যতা মূল্যায়নের জন্য লিখিত আবেদন জানিয়েছেন। তাদের দাবি অত্যন্ত স্পষ্ট: ১. তাদের কোনো বিভাগীয় মামলা নেই, কোনো শাস্তি হয়নি এবং বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (ACR) সন্তোষজনক। ২. আইন অনুযায়ী তারা জ্যেষ্ঠ হওয়ায়, তাদের জন্য ২টি পদ সংরক্ষণ করে বাকি ২টি পদে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্য থেকে পদোন্নতি দেওয়া উচিত ছিল। ৩. আগামী অক্টোবরে তাদের ৫ বছর পূর্ণ হলে, সংরক্ষিত ওই ২টি পদে তাদের পদোন্নতি নিশ্চিত করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত: “কর্তৃপক্ষের বিরাট প্রশাসনিক ভুল”
চাকরি বিধিমালা ও প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের মতে, এখানে কর্তৃপক্ষ চরম তাড়াহুড়ো এবং আইনি অসচেতনতার পরিচয় দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ নিম্নরূপ:
পদ সংরক্ষণ না করা বিধিবহির্ভূত: যেহেতু একই পঞ্জিকা বছরের বিধিতে পদোন্নতিপ্রাপ্তরা জ্যেষ্ঠ, তাই তারা যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও তাদের জন্য পদ না রেখে সবকটি শূন্যপদ পূরণ করে ফেলা সম্পূর্ণ নীতিবহির্ভূত। কর্তৃপক্ষের উচিত ছিল অক্টোবর পর্যন্ত অপেক্ষা করে সবার যোগ্যতা একসাথে মূল্যায়ন করা, অথবা আইনি পরামর্শ নিয়ে পদ সংরক্ষণ করা।
আদেশ বাতিলের শঙ্কা ও অমানবিকতা: যেহেতু ৪ জন কর্মকর্তা ইতোমধ্যে পদোন্নতি পেয়ে যোগদান (Join) করে ফেলেছেন, সেহেতু এখন এই আদেশ বাতিল করা তাদের জন্য চরম অমানবিক হবে। কারণ এতে কর্মকর্তাদের কোনো দোষ নেই, ভুল করেছে কর্তৃপক্ষ।
সমাধানের পথ: যদি নতুন পদ সৃষ্টির (Supernumerary Post বা সংখ্যাতিরিক্ত পদ) সুযোগ না থাকে, তবে পূর্বের আদেশ সংশোধন বা বাতিল করার মতো কঠিন ও অপ্রীতিকর সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে কর্তৃপক্ষকে। অন্যথায় বঞ্চিত কর্মকর্তারা আদালতের শরণাপন্ন হলে এই পদোন্নতি আদেশ আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে টিকবে না।
এখন কী হতে পারে?
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কর্তৃপক্ষ যদি এই ভুল সংশোধন না করে, তবে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়াবে। সে ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতার সুস্পষ্ট বিধি লঙ্ঘিত হওয়ায় আদালতের নির্দেশে বর্তমান পদোন্নতি আদেশ স্থগিত বা বাতিলও হয়ে যেতে পারে। তবে মানবিক দিক বিবেচনা করে, পদোন্নতিপ্রাপ্তদের বর্তমান পদোন্নতি বহাল রেখে, বঞ্চিত ২ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে অক্টোবরে পদোন্নতি দেওয়ার পর “সমন্বিত জ্যেষ্ঠতা তালিকা” (Gradation List) হালনাগাদ করে তাদের আগের মতোই জ্যেষ্ঠ অবস্থানে ফিরিয়ে দেওয়ার একটি প্রশাসনিক পথ খোঁজা হতে পারে—যদি কর্তৃপক্ষ বিশেষ ব্যবস্থায় পদ তৈরি বা সমন্বয় করতে পারে।
আপাতত, এই “আইনি ফাঁক-ফোকর” ও প্রশাসনিক ভুলের খেসারত কাকে দিতে হয়, এবং কর্তৃপক্ষ কীভাবে এই জটিল আবেদন নিষ্পত্তি করে—সেদিকেই তাকিয়ে আছেন ভুক্তভোগী কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।


