জিপিএফ অগ্রিম বা ঋণ গ্রহণ: জুন মাসে টাকা তুললে বড় লোকসান, কেন জুলাই পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন?
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো সাধারণ ভবিষ্য তহবিল বা জিপিএফ (GPF)। জরুরি প্রয়োজনে এই তহবিল থেকে যেকোনো সময় অগ্রিম বা লোন নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে অর্থবছর শেষ হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে অর্থাৎ জুন মাসে বা জুনের আগে জিপিএফ থেকে টাকা উত্তোলন করলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারেন কর্মচারীরা। জিপিএফ বিধিমালা ও হিসাবরক্ষণ সংক্রান্ত প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জুন মাসে টাকা তুললে বার্ষিক ১৩% হারে অর্জিত বিশাল মুনাফা হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই অভিজ্ঞ মহল ও আর্থিক উপদেষ্টাগণ এই সময়ে টাকা না তুলে জুন মাস শেষ হওয়া পর্যন্ত ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিচ্ছেন।
জিপিএফ লোন বা অগ্রিমের বিদ্যমান নিয়মাবলী
সাধারণ ভবিষ্য তহবিল বিধিমালা অনুযায়ী, সরকারি চাকরিজীবীরা তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে জিপিএফ-এ জমাকৃত অর্থ থেকে অগ্রিম গ্রহণ করতে পারেন।
যুগপৎ লোনের সুবিধা: একজন কর্মচারী একই সাথে সর্বোচ্চ ৩টি লোন বা অগ্রিম চলমান রাখতে পারেন। অর্থাৎ, আগের লোন পুরোপুরি পরিশোধ না হলেও বিশেষ বিবেচনায় সর্বোচ্চ ৩টি অগ্রিম একসাথে সচল রাখা সম্ভব।
যেকোনো সময় আবেদনের সুযোগ: বছরের যেকোনো কার্যদিবসে আইবাস++ (iBAS++) বা নির্ধারিত ফরমের মাধ্যমে হিসাবরক্ষণ অফিসে এই অগ্রিমের জন্য আবেদন করা যায়।
জুন মাসে টাকা তুললে কেন বার্ষিক ১৩% মুনাফা হাতছাড়া হবে?
সরকারি হিসাব ব্যবস্থায় প্রতি বছর ৩০শে জুন তারিখে আর্থিক বছর শেষ হয়। এই ৩০শে জুন পর্যন্ত তহবিলে যে স্থিতি (Balance) থাকে, তার ওপর ভিত্তি করেই বছরান্তের মূল বার্ষিক মুনাফা হিসাব করা হয়। বর্তমানে জিপিএফ-এর মুনাফার হার সর্বোচ্চ ১৩%।
যদি কোনো কর্মচারী জুন মাসে বা জুনের ঠিক আগে জিপিএফ থেকে অর্থ উত্তোলন করেন, তবে হিসাবরক্ষণ অফিসের নিয়ম অনুযায়ী বছর শেষের সমাপনী স্থিতি (Closing Balance) কমে যায়। অনেক ক্ষেত্রে উত্তোলিত অর্থের ওপর নির্দিষ্ট মেয়াদের লাভ কর্তন করা হয় বা প্রারম্ভিক জমার ওপর পুঞ্জীভূত লভ্যাংশ প্রাপ্তিতে জটিলতা তৈরি হয়। ফলে, এককালীন একটি বড় অঙ্কের মুনাফা থেকে বঞ্চিত হতে হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে অবসরের সময় বড় ধরনের আর্থিক ঘাটতি তৈরি করে।
কেন জুলাই মাসই জিপিএফ অগ্রিমের জন্য সেরা সময়?
অর্থবছরের হিসাব ক্লোজিং শেষে ১ জুলাই থেকে নতুন অর্থবছর শুরু হয়। আর এই জুলাই মাসই জিপিএফ থেকে লোন নেওয়ার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। এর প্রধান কারণ দুটি:
১. মুনাফা সুরক্ষিত থাকা: জুন মাস পার হয়ে যাওয়ার কারণে বিগত বছরের পুরো ১৩% মুনাফা মূল হিসাবের সাথে যোগ হয়ে যায়। ফলে অর্জিত লাভ সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকে।
২. সর্বোচ্চ ৭৫% পর্যন্ত অগ্রিম প্রাপ্তি: নতুন অর্থবছর অর্থাৎ জুলাই মাসে কর্মচারীরা তাদের মূল জমা এবং সদ্য যোগ হওয়া মুনাফাসহ (সর্বমোট জমার) সর্বোচ্চ ৭৫% পর্যন্ত অর্থ অগ্রিম বা ঋণ হিসেবে গ্রহণ করতে পারবেন।
একটি সহজ উদাহরণ: ধরুন, ৩০ জুন পর্যন্ত আপনার জিপিএফ-এ জমা আছে ২,০০,০০০ টাকা। জুন মাসে টাকা তুললে আপনি হয়তো এই ২ লাখের ওপর পুরো বছরের লাভ পাবেন না। কিন্তু জুলাই মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করলে ওই ২ লাখ টাকার সাথে ১৩% মুনাফা (২৬,০০০ টাকা) যোগ হয়ে মোট ব্যালেন্স হবে ২,২৬,০০০ টাকা। এরপর জুলাইয়ে আপনি এই বর্ধিত ২,২৬,০০০ টাকার ৭৫% (অর্থাৎ ১,৬৯,৫০০ টাকা) পর্যন্ত লোন নিতে পারবেন। এতে আপনার লোনের সীমাও বাড়ছে, আবার লাভও নষ্ট হচ্ছে না।
কর্মচারীদের জন্য পরামর্শ
জরুরি প্রয়োজন যতই থাকুক না কেন, সামান্য কয়েকটা দিন ধৈর্য ধরে জুন মাসটি পার করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। জুন মাসের জুন ক্লোজিং ও অ্যাকাউন্টস ভেরিফিকেশনের ঝক্কি ঝামেলা শেষ করে জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে আবেদন করলে একদিকে যেমন আর্থিক ক্ষতি এড়ানো যাবে, অন্যদিকে আইবাস++ সিস্টেম থেকেও সহজেই নিজের হালনাগাদ জিপিএফ স্লিপ বা স্টেটমেন্ট দেখে শতভাগ নির্ভুলভাবে সর্বোচ্চ পরিমাণের লোন পাওয়া নিশ্চিত করা যাবে।


