বেতন ও বাজারের অসম লড়াই ২০২৬ । দেয়ালে পিঠ ঠেকেছে সরকারি চাকরিজীবীদের?
“মাস শেষে বেতনটা হাতে পাওয়ার আগেই খরচের ফর্দ রেডি থাকে। ঘরভাড়া, ছেলেমেয়ের স্কুলের বেতন আর বাজারের দেনা শোধ করতেই অর্ধেকের বেশি শেষ। বাকি দিনগুলো যে কীভাবে চলে, তা কাউকে বলে বোঝাতে পারি না।” কথাগুলো বলছিলেন সচিবালয়ের একজন অফিস সহকারী। তার এই দীর্ঘশ্বাস আজ দেশের প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রত্যেকেরই।
স্থবির বেতন, ঊর্ধ্বমুখী বাজার
২০১৫ সালের সর্বশেষ পে-স্কেলের পর দীর্ঘ এক দশক কেটে গেলেও নতুন কোনো পূর্ণাঙ্গ বেতন কাঠামো ঘোষণা করা হয়নি। এর মধ্যে মুদ্রাস্ফীতি এবং দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন বৃদ্ধিতে সাধারণ কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা সর্বনিম্ন পর্যায়ে ঠেকেছে। যদিও সম্প্রতি ৯ম পে-কমিশন তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে এবং সর্বনিম্ন বেতন ২০,০০০ টাকা ও সর্বোচ্চ ১,৬০,০০০ টাকা করার প্রস্তাব করেছে, কিন্তু এর পূর্ণ বাস্তবায়ন এখনো প্রক্রিয়াধীন। ফলে বর্তমানের আকাশছোঁয়া বাজারের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন নির্দিষ্ট আয়ের এই মানুষগুলো।
পরিসংখ্যানের চোখে বাস্তব চিত্র
সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরুতে দেশে মূল্যস্ফীতির হার ৮.৫ শতাংশের উপরে অবস্থান করছে। বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে পাল্লা দিয়ে। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত সরকারি কর্মচারীদের আয়ের সিংহভাগই চলে যাচ্ছে চাল, ডাল, তেল আর অতিপ্রয়োজনীয় ওষুধ কিনতে। গত কয়েক বছরে বাড়িভাড়া ও যাতায়াত খরচ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ, কিন্তু সেই তুলনায় ভাতা বাড়েনি বললেই চলে।
সামাজিক মর্যাদা বনাম আর্থিক সংকট
সরকারি চাকরিজীবীদের বড় একটি অংশ এখন ‘নীরব দুর্ভিক্ষ’ পার করছেন। সামাজিক মর্যাদার কারণে তারা না পারছেন কারও কাছে হাত পাততে, না পারছেন অন্য কোনো বাড়তি আয়ের পথ খুঁজতে। অনেক কর্মচারী এখন সঞ্চয়পত্র ভেঙে কিংবা ব্যক্তিগত ঋণ (পার্সোনাল লোন) নিয়ে দৈনন্দিন চাহিদা মেটাচ্ছেন।
“বাইরে থেকে আমাদের জীবন যতটা চাকচিক্যময় মনে হয়, ভেতরে আমরা ততটাই নিঃস্ব। ছোট পদে চাকরি করে এই বাজারে টিকে থাকা এখন অসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।” — ক্ষোভের সাথে জানান মাঠ পর্যায়ের এক স্বাস্থ্যকর্মী।
প্রত্যাশিত সমাধান কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল বেতন বাড়ানোই সমাধান নয়, বরং বাজারের সিন্ডিকেট ভাঙা এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। তবে বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে কর্মচারীদের দাবি—প্রস্তাবিত নতুন পে-স্কেল দ্রুত বাস্তবায়ন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে পর্যাপ্ত মহার্ঘ ভাতা প্রদান করা।
সরকারি চাকরিজীবীদের এই নীরব হাহাকার কেবল তাদের ব্যক্তিগত সংকট নয়, বরং এটি প্রশাসনিক দক্ষতায়ও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সমাজ বিশ্লেষকরা। এখন দেখার বিষয়, নতুন পে-কমিশনের সুপারিশগুলো কবে নাগাদ আলোর মুখ দেখে এবং সাধারণ কর্মচারীদের জীবনে স্বস্তি ফিরে আসে।
নিম্নগ্রেডের কর্মচারীদের বেতনে কেন মাস চলছে না?
নিম্নগ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের (বিশেষ করে ১৩ থেকে ২০তম গ্রেড) মাসিক বেতন বর্তমান বাজার পরিস্থিতির তুলনায় কেন একেবারেই অপ্রতুল, তার পেছনে কয়েকটি গভীর ও কাঠামোগত কারণ রয়েছে। তথ্যাদি বিশ্লেষণ করলে নিচের প্রধান পয়েন্টগুলো সামনে আসে:
১. দ্রব্যমূল্যের সাথে বেতনের আকাশ-পাতাল ব্যবধান
২০১৫ সালের পে-স্কেলে যখন বেতন নির্ধারিত হয়েছিল, তখন চাল, ডাল বা তেলের যে দাম ছিল, ২০২৬ সালে এসে তা প্রায় দ্বিগুণ বা তিনগুণ বেড়েছে। কিন্তু নিম্নগ্রেডের কর্মচারীদের বেতন বেড়েছে কেবল সামান্য বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট (৫%) হারে। ফলে মুদ্রাস্ফীতির (Inflation) ধাক্কায় তাদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা অর্ধেক হয়ে গেছে।
২. বাড়ি ভাড়ার ‘অযৌক্তিক’ কাঠামো
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, মূল বেতনের একটি নির্দিষ্ট শতাংশ (৪০-৫০%) বাড়ি ভাড়া হিসেবে পাওয়া যায়। কিন্তু বাস্তবে ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো শহরে সেই টাকায় একটি মানসম্মত সাবলেট রুমও পাওয়া দুষ্কর। ফলে বেতনের বড় একটি অংশ মূল বেতন থেকে কেটে নিয়ে বাড়ি ভাড়ার ঘাটতি মেটাতে হয়।
৩. নির্দিষ্ট ও সীমাবদ্ধ আয়
বেসরকারি খাতে অনেক সময় পারফরম্যান্স বোনাস বা ওভারটাইমের সুযোগ থাকে, কিন্তু সরকারি নিম্নগ্রেডের কর্মচারীদের আয় একদম সুনির্দিষ্ট। বাড়তি আয়ের কোনো বৈধ পথ নেই। মাস শেষে হাতে আসা ১২,০০০ থেকে ২০,০০০ টাকা দিয়ে ৫-৬ জনের পরিবারের পুরো মাসের খরচ চালানো বর্তমান বাজারে গাণিতিকভাবেই অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৪. শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয় বৃদ্ধি
নিম্নগ্রেডের কর্মচারীদের সন্তানদের ভালো স্কুলে পড়ানো এখন বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। কোচিং ফি, বই-খাতা এবং যাতায়াত খরচ মেটাতেই বেতনের বড় অংশ চলে যায়। এর ওপর পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে ওষুধের চড়া দাম আর বেসরকারি হাসপাতালের খরচ মেটাতে গিয়ে তাদের ঋণের জালে জড়িয়ে পড়তে হচ্ছে।
৫. সামাজিক মর্যাদা ও ‘সাদা পোশাকের’ অভাব
নিম্নগ্রেডের কর্মচারীরা সমাজে নিজেদের পরিচয় লুকিয়ে রাখতে পারেন না। তাদের একটি নির্দিষ্ট মান বজায় রেখে চলতে হয়। এই “সাদা পোশাক” বজায় রাখতে গিয়ে তারা না পারেন লাইনে দাঁড়িয়ে টিসিবির পণ্য কিনতে, না পারেন কারো কাছে হাত পাততে। এই মানসিক চাপ তাদের আর্থিক কষ্টকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
একটি ছোট গাণিতিক উদাহরণ:
একজন ২০তম গ্রেডের কর্মচারীর মূল বেতন বর্তমানে প্রায় ৯,০০০ – ১০,০০০ টাকা। সব মিলিয়ে তিনি হয়তো ১৫,০০০ – ১৬,০০০ টাকা হাতে পান।
বাসা ভাড়া: ৮,০০০ টাকা (শহরের বস্তি সদৃশ এলাকাতেও)
বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস: ২,৫০০ টাকা
অবশিষ্ট থাকে: ৫,৫০০ টাকা (পুরো মাসের বাজার, ওষুধ ও যাতায়াতের জন্য)
ফলাফল: প্রতিদিনের খরচ মাত্র ১৮৩ টাকা। এই টাকায় বর্তমান বাজারে ৩ বেলা খাওয়াও প্রায় অসম্ভব।



